অথর্ব্ববেদীয়

প্রশ্নোপনিষৎ।

____________________

শ্রীমৎ-পরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য- শঙ্করভগবৎকৃত-ভাষ্যসমেত

মূল, অন্বয়মুখী-ব্যাখ্যা-মূলানুবাদ-ভাষ্য-ভাষ্যানুবাদ সহ। সম্পাদক ও অনুবাদক শ্রীযুক্ত পণ্ডিত দুর্গাচরণ সাংখ্য বেদান্ততীর্থ

শ্রীঅনিল চন্দ্র দত্ত সহকারী সম্পাদক, স্বত্বাধিকারী ও প্রকাশক লোটাস্ লাইব্রেরী। ২৮।১ নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট্ কলিকাতা। ১৩১৮ সাল। All rights reserved,

প্রিন্টার:-শ্রীআশুতোষ বন্দোপাধ্যায়, মেটকাফ্ প্রেস, ৭৬নং বলরাম দে স্ট্রীট,-কলিকাতা।

আভাস।

প্রশ্ন ও মুণ্ডকোপনিষৎ, উভয়ই এক অথর্ব্ববেদীয় উপনিষৎ; উভয়ের মধ্যে প্রতিপাদ্য বিষয়েরও যথেষ্টপরিমাণে ঐক্য পরিলক্ষিত হয়। মুণ্ডকে যাহা সংক্ষিপ্তভাবে আছে, প্রশ্নে আবার তাহাই বিস্তৃতভাবে আলোচিত হই- য়াছে। আবার প্রশ্নে যাহা সংক্ষিপ্ত, মুণ্ডকে তাহারই বিস্তৃতি রহিয়াছে। এই সংক্ষেপ ও বিস্তার লইয়াই উভয়ের পার্থক্য ঘটিয়াছে; ‘বিশেষতঃ মুণ্ডকে যেমন পরাপর ব্রহ্ম-বিদ্যার সবিশেষ উপদেশ রহিয়াছে, প্রশ্নোপনিষদে আবার তেমনি প্রাণোপাসনার বিষয় বিশেষ করিয়া বর্ণিত হইয়াছে। প্রাণই যে, স্থূল- সূক্ষ্ম ও সমষ্টি-ব্যষ্টি এবং অধ্যাত্মাদিভাবে সমস্ত জগতের কর্তা ও ভোক্তা, এবং সোমরূপ অন্নই যে, নানারূপে ভোগ্য; তাহা বিভিন্নপ্রকারে ইহাতে বর্ণিত হইয়াছে। পুরুষগত শ্রদ্ধাদি ষোড়শপ্রকার কলার উৎপত্তি এবং সেই ষোড়শ কলা-সমন্বিত পুরুষের সৃষ্টিকর্তৃত্ব প্রভৃতি বিষয়সমূহও অতি বিশদভাবে সন্নি- বেশিত হইয়াছে।

শ্রীদুর্গাচরণ শর্ম্মা।

প্রশ্নোপনিষদের বিষয়সূচী।

আরম্ভ ও সমাপ্তির শ্লোক সংখ্যা। প্রথম প্রশ্নে— (১) পরাপর-ব্রহ্ম জিজ্ঞাসার উদ্দেশে ভারদ্বাজ প্রভৃতি ঋষিগণের পিপ্পলাদ-সমীপে গমন, এবং পিপ্পলাদ কর্তৃক জিজ্ঞাসায় সম্মতি জ্ঞাপন, অনন্তর করন্ধী কর্তৃক প্রজাসৃষ্টি বিষয়ে প্রশ্ন ১-৩ (২) তদুত্তরে পিপ্পলাদকর্তৃক ভোক্তভোগ্যাদিভাবে অগ্নি-সোমাদি মিথুন সৃষ্টি বর্ণন ৪-১৪ (৩) প্রজাপতি ব্রত ও তৎফলকথন...... ১৫-১৬ দ্বিতীয় প্রশ্নে— (১) দেহধারক প্রাণ-দেবতার সংখ্যা ও শ্রেষ্ঠতা বিষয়ে ভার্গব কর্তৃক প্রশ্ন ১-০ (২) তদুত্তরে দেহধারক প্রাণ বা ইন্দ্রিয়গণের সংখ্যা কখন, মুখ্য প্রাণের শ্রেষ্ঠতা প্রতি- পাদন এবং শ্রেষ্ঠ প্রাণের উদ্দেশে ইন্দ্রিয়গণ কর্তৃক উপহার প্রদান ও প্রাণস্তুতি কথন ২-১৩ তৃতীয় প্রশ্নে— (১) প্রাণের উৎপত্তি, স্থিতি, আগমন ও বহির্গমনাদি বিষয়ে কৌশল্যকৃত প্রশ্ন ও প্রশ্ন- কর্ত্তার সাধুবাদ প্রদান ও উত্তর দানে সম্মতি জ্ঞাপন...... ১-২ (২) আত্মা হইতে প্রাণের উৎপত্তি ও সমস্ত ইন্দ্রিয়-প্রেরকতা কখন ৩-৫ (৩) হৃদয়স্থ একশত একটা নাড়ী কখন, নাড়ীভেদে প্রাণাদিবৃত্তির ভেদ, উৎক্রমণ ও তদনুসারে শুভাশুভ লোক প্রাপ্তি কথন...... ৬-১০ (৪) প্রাণ বিজ্ঞানের ফল কখন...... ১২-১৩ চতুর্থ প্রশ্নে— (১) গার্গ্যকর্তৃক জাগ্রৎ-স্বপ্নাদি বিষয়ে প্রশ্নকরণ... ১ (২) তদুত্তরে পিপ্পলাদ কর্তৃক, স্বপ্নাবস্থা, মনোমধ্যে ইন্দ্রিয়গণের বিলয় কখন, প্রাণাদি বায়ুর গার্হপত্যাদি অগ্নিরূপে জাগরণ কথন, এবং তদবস্থায় আত্মার বিষয়ানুভূতি ২-৫ (৩) সুষুপ্তি অবস্থা ও সে সময়ে আত্মার পরমাত্মায় প্রতিষ্ঠা কথন, এবং বিজ্ঞান-ফল নির্দেশ............ ৬-১১ পঞ্চম প্রশ্নে— (১) সত্যকাম কর্তৃক ওঙ্কার ধ্যান ও তাহার ফল বিষয়ে প্রশ্ন... ১ (২) তদুত্তরে ওঙ্কারের মাত্রানুসারে পরাপর ব্রহ্মবিষয়ক উপাসনা ও তাহার ফল কখন............ ২-৭ ষষ্ঠ প্রশ্নে— (১) ভারদ্বাজকর্তৃক ষোড়শকলাবিশিষ্ট পুরুষ বিষয়ে প্রশ্ন... ১ (২) পিপ্পলাদকর্তৃক উত্তর প্রদান, ষোড়শকলাবিশিষ্ট পুরুষকর্তৃক সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা ও প্রাণ-শ্রদ্ধাদি ষোড়শ কলার উৎপত্তি ও লয় নিরূপণ...... ২-৬ (৩) ভারদ্বাজাদি ঋষিগণকর্তৃক পিপ্পলাদ স্তুতি বর্ণন... ৭-৮ সমাপ্ত।

অথর্ব্ববেদীয়া প্রশ্নোপনিষৎ।

____________________

ওঁ ভদ্রং কর্ণেভিঃ শৃণুয়াম দেবাঃ। ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভির্যজত্রাঃ। স্থিরৈরঙ্গৈস্তুষ্টু বাৎসস্তনূভিঃ। ব্যশেম দেবহিতং যদায়ুঃ ॥

স্বস্তি ন ইন্দ্রো বৃদ্ধশ্রবাঃ স্বস্তি নঃ পূষা বিশ্বদেবাঃ। স্বস্তি ন স্তাক্ষ্যোহরিষ্টনেমিঃ। স্বস্তি নো বৃহস্পতি দধাতু ॥

॥ ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ওঁম্ ॥

ওঁ সুকেশা চ ভারদ্বাজঃ শৈব্যশ্চ সত্যকামঃ, সৌৰ্য্যায়ণী চ গার্গ্যঃ, কৌসল্যশ্চাশ্বলায়নঃ, ভার্গবো বৈদভিঃ, কবন্ধী কাত্যা- য়নঃ তে হৈতে ব্রহ্মপরা ব্রহ্মনিষ্ঠাঃ পরং ব্রহ্মান্বেষমাণাঃ, এষ হ বৈ তৎ সর্ব্বং বক্ষ্যতি ইতি তে হ সমিৎপাণয়ো ভগবন্তং পিপ্পলাদমুপসন্নাঃ ॥ ১ ॥

সরলার্থঃ—প্রণম্য গুরু-পাদাজং স্মৃত্বা শঙ্কর-সম্ম তম্। প্রশ্নোপনিষদাং ব্যাখ্যা সরলাখ্যা বিতন্যতে ॥

ইহ খলু দুঃখসাগর-নিমগ্নান্ নিরীক্ষ্য সমুপজাতকরুণমিব আথর্ব্বণ-ব্রাহ্মণ- মিদং বক্ষ্যমাণবিদ্যা-স্তুতয়ে শিষ্যবুদ্ধি-সমবধানায় চ আখ্যায়িকারূপেণ জ্ঞানোপা- সনে বক্তৃং প্রবর্ত্ততে সুকেশা ইত্যাদি।

২ প্রশ্নোপনিষৎ।

সুকেশা[নাম] ভারদ্বাজঃ(ভরদ্বাজসুতঃ), সত্যকামঃ[ নাম] শৈব্যঃ (শিবিনন্দনঃ), গার্গ্যঃ(গর্গবংশসম্ভূতঃ), সৌর্য্যায়ণী(সৌর্য্যায়ণিঃ-সূর্য্য- পুত্রস্য অপত্যং), কৌসল্যঃ[ নাম] আশ্বলায়নঃ(অশ্বলপুত্রঃ), বৈদভিঃ (বিদর্ভদেশোৎপন্নঃ) ভার্গবঃ(ভগুবংশীয়ঃ), কবনী[ নাম] কাত্যায়নঃ (কতায় যুবা পুত্রঃ), তে(প্রসিদ্ধাঃ) এতে(সুকেশাদয়ঃ যট্) ব্রহ্মপরাঃ (অপরং ব্রহ্ম পরঃ উপাস্যতয়া প্রধানং যেযাং, তে তথোক্তাঃ, বেদপরা বা) ব্রহ্মনিষ্ঠাঃ(অপরব্রহ্মারাধন-নিরতাঃ, বেদনিষ্ঠা বা) পরং(নির্বিশেষং) ব্রহ্ম (ব্রহ্মতত্ত্বং) অন্বেষমাণাঃ(জ্ঞাতুমিচ্ছন্তঃ)[ সন্তি]। তে ‘এষঃ(বুদ্ধিস্থঃ পিপ্পলাদঃ) তৎ সর্ব্বং(অস্মদভীষ্টং সর্ব্বমেব) বক্ষ্যতি(অস্মান্ কথয়িষ্যতি)’; ইতি (এবং নিশ্চিত্য) তে(পূর্ব্বোক্তাঃ ষট্) সমিৎপাণয়ঃ(যজ্ঞোপকরণকাষ্ঠহস্তাঃ সন্তঃ) ভগবন্তং(পূজার্হং) পিপ্পলাদং(তদাখ্যমাচার্য্যং) উপসন্নাঃ(সংপ্রাপ্তা ইত্যর্থঃ) ॥

ভরদ্বাজ-নন্দন সুদেশা, শিবিপুত্র সত্যকাম, গর্গবংশজাত সৌৰ্য্যায়ণী, অশ্বল- তনয় কৌশল্য, বিদর্ভদেশীয় ভার্গব এবং কত্যপুত্র কবন্ধী, ইহারা সকলেই অপর ব্রহ্মের উপাসনায় তৎপর ও তদুচিত অনুষ্ঠান-নিরত, এবং পর তত্ত্ব জানিতে সমুৎসুক। ইনিই(পিপ্পলাদ) আমাদিগকে সেই সমস্ত বিষয় উপদেশ দিবেন; এইরূপ অবধারণ করিয়া তাঁহারা হস্তে যজ্ঞীয় কাষ্ঠ গ্রহণপূর্ব্বক ভগবান্ পিপ্পলাদের সমীপে উপস্থিত হইলেন ॥ ১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

ওঁ নমঃ পরমাত্মনে নমঃ ॥ মন্ত্রোক্তস্যার্থস্য বিস্তরানুবাদীদং ব্রাহ্মণমারভ্যতে। ঋষি প্রশ্ন প্রতিবচনাখ্যাত্মিকা তু বিদ্যাস্ততয়ে,—এবং সংবৎসরব্রহ্মচর্য্যসংসাদাদি- যুক্তৈস্তপোযুক্তৈগ্রাহ্যা পিপ্পলাদাদিবৎ সর্ব্বজ্ঞকল্পৈরাচার্য্যৈর্ব্বক্তব্যা চ, ন সা যেন- কেনচিদিতি বিদ্যাং স্তৌতি। ব্রহ্মচর্য্যাদিসাধনসূচনাচ্চ তৎকর্তব্যতা স্যাৎ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

আথর্বণ মন্ত্রোপনিষদে(মুণ্ডকোপনিষদে) যে বিষয় উক্ত হইয়াছে, তাহারই বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করিবার উদ্দেশে এই ব্রাহ্মণ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ

” প্রশ্নোপনিষৎ।
প্রশ্নোপনিষৎ। ৩

ভাগোক্ত প্রশ্নোপনিষৎ আরব্ধ হইতেছে,(১) বর্ণনীয় বিদ্যার স্তুতি বা প্রশংসাখ্যাপনার্থ ঋষিগণের প্রশ্ন ও প্রতিবচনাত্মক আখ্যায়িকাটি (গল্পটি) রচিত হইয়াছে;-বক্ষ্যমাণ বিদ্যা পিপ্পলাদ প্রভৃতির ন্যায় সর্বজ্ঞতুল্য আচার্য্যগণেরই বক্তব্য বা উপদেশদানের যোগ্য এবং সংবৎসরব্যাপী ব্রহ্মচর্য্য-সংযতভাবে গুরুসমীপে বাস ও উপযুক্ত তপস্যাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গেরই গ্রহণযোগ্য; কিন্তু যে-সে লোকের বাচ্যও নহে, গ্রাহ্যও নহে;[উক্ত আখ্যায়িকা দ্বারা বর্ণনীয়] বিদ্যার এবংবিধ প্রশংসা সূচিত হইতেছে। আর বিদ্যালাভের পক্ষে যে, ব্রহ্ম-

প্রশ্নোপনিষৎ।

চর্য্যাদিই প্রকৃষ্ট সাধন, ইহা সূচনা করায়ও ব্রহ্মচর্য্যাদির কর্ত্তব্যতা জ্ঞান হইতে পারে।

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

সুকেশা চ নামতঃ, ভরদ্বাজস্যাপত্যং ভারদ্বাজঃ। শৈব্যশ্চ-শিবেরপত্যং শৈব্যঃ, সত্যকামো নামতঃ। সৌর্য্যায়ণী-সূর্য্যস্যাপত্যং সৌর্য্যঃ তস্যাপত্যং সৌর্য্যায়ণিঃ ছান্দসং ‘সৌর্য্যায়ণী’ ইতি,গার্গ্য: গর্গগোত্রোৎপন্নঃ। কৌসল্যশ্চ নামতঃ, অশ্বলস্যাপত্যমাশ্বলায়নঃ। ভার্গবঃ--ভূগোর্গোত্রাপত্যং ভার্গবঃ, বৈদভিঃ বিদর্ভেযু ভবঃ। কবন্ধী নামতঃ, কত্যস্যাপত্যং কাত্যায়নঃ। বিদ্যমানঃ প্রপিতামহো যস্য সঃ, যুবার্থপ্রত্যয়ঃ।

তে হৈতে ব্রহ্মপরা অপরং ব্রহ্ম পরত্বেন গতাঃ, তদনুষ্ঠাননিষ্ঠাশ্চ ব্রহ্মনিষ্ঠাঃ, পরং ব্রহ্ম অন্বেষমাণাঃ। কিং তৎ?—যৎ নিত্যং বিজ্ঞেয়মিতি, তৎপ্রাপ্ত্যর্থং যথাকামং বতিষ্যামঃ, ইত্যেবং তদন্বেষণং কুর্ব্বন্তঃ, তদধিগমায় ‘এষ হ বৈ তৎ সব্বং বক্ষ্যতি’ ইতি আচার্য্যমুপজগ্মুঃ। কথম্?—তে হ সমিৎপাণয়ঃ সমিদ্দার- গৃহীতহস্তাঃ সন্তো ভগবন্তং পূজাবন্তং পিপ্পলাদম্ আচার্য্যম্ উপসন্না উপজগ্মুঃ॥ ১

ভাষ্যানুবাদ।

সুকেশা নামক ভরদ্বাজ-পুত্র,সত্যকাম নামক শিবিসুত,গর্গকুলোৎ- পন্ন সৌর্য্যায়ণী। সূর্য্যের পুত্র—সৌর্য্য, তাহার পুত্র—সৌর্য্যায়নী,(এই পদটি চ্ছান্দস-(বৈদিক) প্রয়োগমাত্র, বস্তুতঃ ‘সৌর্য্যায়ণি’ হইবে)। কৌসল্য নামক অশ্বলপুত্র, ভার্গব অর্থ ভৃগুর বংশজাত(সন্তান) বৈদর্ভি—বিদর্ভদেশ-সম্ভূত, কবন্ধী নামক কাত্যায়ন অর্থাৎ কত্যের যুবা পুত্র; যুবার্থে ‘আয়নন্’ প্রত্যয় হইয়াছে,[অতএব বুঝিতে হইবে যে,] তাঁহার প্রপিতামহ তৎকালেও বর্তমান আছেন।

প্রসিদ্ধ বংশসম্ভূত ইঁহারা ব্রহ্মপর এবং ব্রহ্মনিষ্ঠ অর্থাৎ অপর ব্রহ্মকে( হিরণ্যগর্ভকে) পরমারাধ্যরূপে অবগত হইয়া, তাঁহারই আরাধনায় তৎপর আছেন, অধিকন্তু পরব্রহ্মের অনুসন্ধান করিতে-

প্রশ্নোপনিষৎ। ৫

ছেন। তাহা কিরূপ? যিনি নিত্য বিজ্ঞেয়রূপ(জ্ঞানের বিষয়ীভূত হইবার যোগ্য); তাঁহার প্রাপ্তির নিমিত্ত আমরা ইচ্ছামত যত্ন করিব; এইরূপে সেই পরব্রহ্মের অনুসন্ধান করিতে করিতে ‘ইনিই সেই সমস্ত জিজ্ঞাস্য বিষয়[আমাদিগকে] বলিবেন’ স্থির করিয়া, সেই ব্রহ্মজ্ঞানলাভের উদ্দেশে আচার্য্য-সমীপে গিয়াছিলেন। কি প্রকারে? না—সমিৎপাণি হইয়া; অর্থাৎ আচার্য্যের যজ্ঞসম্পা- দনোপযোগী কাষ্ঠরাশি হস্তে লইয়া(২) ভগবান্(পূজ্যপাদ) আচার্য্য পিপ্পলাদ সমীপে উপস্থিত হইয়াছিলেন ॥ ১ ॥

তান্ হ স ঋষিরুবাচ—ভূয় এব তপসা ব্রহ্মচর্য্যেণ শ্রদ্ধয়া সংবৎসরং সংবৎস্যথ। যথাকামং প্রশ্নান্ পৃচ্ছত। যদি বিজ্ঞা- স্যামঃ, সর্ব্বং হ বো বক্ষ্যাম ইতি ॥ ২

স ঋষিঃ(পিপ্পলাদঃ) তান্(সুকেশাদীন্ ষট্) হ(ঐতিহ্যসূচকং) [বক্ষ্যমাণং বচনম্] উবাচ(উপদিদেশ)—[যূয়ং] তপসা(বৈধক্লেশসহনেন— কায়নিগ্রহেণ), ব্রহ্মচর্য্যেণ(সংযমাদিনা) শ্রদ্ধয়া(আস্তিক্যবুদ্ধ্যা চ) ভূয়ঃ (পুনরপি) সংবৎসরং(তাবৎকালং) সংবৎস্যথ শুশ্রুষাদি-পরিচর্য্যয়া গুরুং প্রসাদয়ন্তঃ তৎসমীপে তিষ্ঠত।[অনন্তরং চ] যথাকামং(যথেচ্ছং) প্রশ্নান্ (প্রষ্টব্যান্ বিষয়ান্) পৃচ্ছত;[মাম্ ইতি শেষঃ]। যদি বিজ্ঞাস্যামঃ(বয়ং তান্ বিষয়ান্ জানীমঃ),[তদা] বঃ(যুগ্মান্) সর্ব্বং হ(এব) বক্ষ্যামঃ (কথয়িষ্যামঃ) ॥

পিপ্পলাদ ঋষি তাঁহাদিগকে বলিলেন—তোমরা পুনশ্চ সংবৎসর কাল

৬ প্রশ্নাপনিষৎ।

তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য ও শ্রদ্ধা বা আদরসম্পন্ন হইয়া[গুরুসমীপে] বাস কর; তাহার পর, ইচ্ছানুসারে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিও; আমরা যদি জানি, তাহা হইলে অবশ্যই তোমাদিগকে তাহা বলিব ॥ ২

শাঙ্করভাষ্যম্।

তান্ এবমুপগতান্ স হ কিল ঋষিঃ উবাচ-ভূয়ঃ পুনরেব, যদ্যপি যূয়ং পূর্ব্বং তপস্বিন এব তথাপীহ তপসা ইন্দ্রিয়সংযমেন, বিশেষতো ব্রহ্মচর্য্যেণ শ্রদ্ধয়া চাস্তিক্য- বুদ্ধ্যা আদরবন্তঃ সংবৎসরং কালং সংবৎস্যথ-সম্যগ্‌গুরুশুশ্রুষাপরাঃ সন্তো বৎস্যথ। ততো যথাকামং যো যস্য কামস্তমনতিক্রম্য-যবিষয়ে যস্য জিজ্ঞাসা, তদ্বিষয়ান্ প্রশ্নান্ পৃচ্ছত। যদি তদ্‌ যুগ্মৎপৃষ্টং বিজ্ঞাস্যামঃ, অনুদ্ধতত্ব প্রদর্শনার্থো যদিশব্দো নাজ্ঞানসংশয়ার্থঃ প্রশ্ননির্ণয়াদবসীয়তে। সর্ব্বং হ বো বঃ পৃষ্ঠার্থং বক্ষ্যাম ইতি ॥ ২

ভাষ্যানুবাদ।

সেই ঋষি(পিপ্পলাদ) উপস্থিত সেই ঋষিগণকে বলিলেন যে, যদিও তোমরা ইতঃপূর্ব্বে ইন্দ্রিয়-সংযমরূপ তপস্যা দ্বারা তপস্বীই বট, তথাপি পুনর্ব্বার বিশেষরূপ ব্রহ্মচর্য্য এবং শ্রদ্ধা বা আস্তিক্য বুদ্ধিতে আদর সম্পন্ন হইয়া সংবৎসরকাল বাস কর, অর্থাৎ উত্তমরূপে গুরু- শুশ্রূষায় তৎপর হইয়া অবস্থিতি কর। তাহার পর, কামনানুসারে অর্থাৎ যাহার যে বিষয়ে ইচ্ছা, সে সেই বিষয়েই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিও; যদি তোমাদের জিজ্ঞাসিত বিষয় আমার জানা থাকে, তাহা হইলে, তোমাদের জিজ্ঞাসিত সমস্ত বিষয়ই বলিব। এখানে নিজের ঔদ্ধত্য বা অহঙ্কার পরিহারার্থই-‘যদি’ শব্দটি প্রযুক্ত হইয়াছে, কিন্তু তদ্বিষয়ে অজ্ঞান বা সংশয় জ্ঞাপনার্থ নহে; কারণ, পরবর্তী প্রশ্নোত্তর সমূহ দর্শন করিলেই বুঝা যায় যে, তাঁহার কোন বিষয়ে অজ্ঞান বা সংশয় ছিল না ॥ ২

অথ কবন্ধী কাত্যায়ন উপেত্য পপ্রচ্ছ ভগবন্, কুতো হ বা ইমাঃ প্রজাঃ প্রজায়ন্ত ইতি ॥ ৩ ॥

প্রশ্নোপনিষৎ। ৭

অথ(সংবৎসরাং পরং) কাত্যায়নঃ কবন্ধী উপেত্য(পিপ্পলাদ- সমীপং গত্বা) পপ্রচ্ছ(পিপ্পলাদং পৃষ্টবান্)—ভগবন্(হে পূজ্য!) ইমাঃ(দৃশ্য- মানাঃ) প্রজাঃ(উৎপত্তিশালিন: জীবাঃ) কুতঃ(কস্মাৎ কারণবিশেষাৎ] হ বৈ(ঐতিহ্যাবধারণদ্যোতকং নিপাতদ্বয়ং) প্রজায়ন্তে(উৎপদ্যন্তে)। ইতি (প্রশ্নসমাপ্তৌ ॥

কাত্যায়ন কবন্ধী এক বৎসর পরে উপস্থিত হইয়া[পিপ্পলাদকে] জিজ্ঞাসা করিলেন—ভগবন্! এই প্রজাগণ(উৎপত্তিশীল জীবগণ) কোথা হইতে জন্মলাভ করে? ॥৩

শঙ্করভাষাম্।

অথ সংবৎসরাদূর্দ্ধং কবন্ধী কাত্যায়ন উপেত্য উপগম্য পপ্রচ্ছ পৃষ্টবান্,-হে ভগবন্! কুতঃ কস্মাৎ হ বৈ ইমা ব্রাহ্মণাদ্যা: প্রজাঃ প্রজায়ন্তে উৎপদ্যন্তে ইতি। অপরবিদ্যা-কর্মণোঃ(৩) সমুচ্চিতাসমুচ্চিতয়োর্যৎ কার্য্যং যা গতিঃ, তদ্বক্তব্যমিতি তদথোহয়ং প্রশ্নঃ ॥৩

প্রশ্নোপনিষৎ।

ভাষ্যানুবাদ।

‘অথ’ অর্থ—অনন্তর, সংবৎসরের পর কবন্ধিনামক কাত্যায়ন [ পিপ্পলাদ সমীপে] উপস্থিত হইয়া প্রশ্ন করিলেন—ভগবন্! কোথা হইতে এই ব্রাহ্মণাদি প্রজাগণ জন্মলাভ করে—উৎপন্ন হয়? অভি- প্রায় এই যে, অপর ব্রহ্মবিদ্যা এবং কৰ্ম্ম সমুচ্চিত বা অসমুচ্চিত ভাবে(এক সঙ্গে বা পৃথক্ পৃথক্) অনুষ্ঠান করিলে, যে প্রকার ফল ও গতি লাভ হয়; তাহা বলিতে হইবে। সেই অভিপ্রায় জ্ঞাপনার্থই এই প্রশ্ন হইয়াছে ॥ ৩

তস্মৈ স হোবাচ—প্রজাকামো হ বৈ প্রজাপতিঃ, স তপোহতপ্যত, স তপস্তপ্ত্বা। স মিথুনমুৎপাদয়তে রয়িঞ্চ প্রাণ- ঞ্চেতি, এতৌ মে বহুধা প্রজাঃ করিষ্যত ইতি ॥ ৪

সঃ(পিপ্পলাদঃ) তস্মৈ(কবন্ধিনে) উবাচ; সঃ(প্রসিদ্ধঃ) প্রজাপতিঃ (হিরণ্যগর্ভঃ) হ(কিল) বৈ(অবধারণে) প্রজাকামঃ(প্রজা মে জায়তাম্, ইত্যভিলাষবান্ সন্) তপঃ(বক্ষ্যমাণপ্রকারং জ্ঞানলক্ষণং) অতপ্যত(আলো- চিতবান্)। সঃ তপঃ তপ্তা এতৌ(রয়িপ্রাণৌ) যে প্রজাঃ(সৃজ্যমানাঃ) বহুধা করিষ্যতঃ(অনেক প্রকারেণ বদ্ধয়িষ্যতঃ) ইতি[নিশ্চিত্য] রয়িং(ধনং অর্থাৎ ধনলভ্যানামন্নানামুপকারকং চন্দ্রং) চ প্রাণং(ভোক্তারম্ অগ্নিং অর্থাৎ তদধি- দৈবতং সূর্য্যং) চ,(ইতি এবংলক্ষণং) মিথুনং(ভোজ্যভোক্তৃ যুগলং) উৎপাদ- য়তে(উৎপাদিতবানিত্যর্থঃ) ॥

পিপ্পলাদ তাঁহাকে বলিলেন—সেই লোক প্রসিদ্ধ প্রজাপতি(হিরণ্যগর্ভ) প্রজাসৃষ্টির অভিলাষী হইয়া তপস্যা(মনে মনে আলোচনা) করিয়াছিলেন। তিনি তপস্যা করিয়া[বুঝিলেন যে,] এই যে রয়ি(ধন) ও প্রাণ অর্থাৎ সূর্য্য ও চন্দ্র; ইহারাই আমার প্রজাগণকে বহু প্রকারে পরিবর্দ্ধিত করিবে, এইরূপ

প্রশ্নোপনিষৎ। ৯

নিশ্চয় করিয়া[ভোগ্য-ভোক্তৃরূপে] রয়ি অর্থ ধন—ধনলভ্য অন্নের পুষ্টিকর চন্দ্র, ও প্রাণ(প্রাণসম্বন্ধী অগ্নির অবিদেবতা সূর্য্য) এই উভয়কে উৎপাদন করিয়াছিলেন ॥ ৪ ॥

পাঞ্চরথ্যম্।

তস্মৈ এবং পৃষ্টবতে স হোবাচ-তদপাকরণায়াহ-প্রজাকামঃ প্রজা আত্মনঃ সিসৃক্ষুর্ব্বৈ প্রজাপতিঃ সর্বাত্মা সন্ জগৎ স্রক্ষ্যামি ইত্যেবং বিজ্ঞানবান্ যথোক্তকারী তদ্ভাবভাবিতঃ কল্পাদৌ নির্বৃত্তো হিরণ্যগর্ভঃ সৃজ্যমানানাং প্রজানাং স্থাবরজঙ্গ- মানাং পতিঃ সন্ জন্মান্তরভাবিতং জ্ঞানং শ্রুতিপ্রকাশিতার্থবিষয়ং তপোহন্বালোচয়ৎ অতপ্যত। অথ তু স এবং তপস্তপ্ত। শ্রৌতং জ্ঞানমন্বালোচ্য সৃষ্টিসাধনভূতং মিথুন- মুৎপাদয়তে-মিথুনং দ্বন্দ্বমুৎপাদিতবান্। রয়িঞ্চ সোমমন্নং, প্রাণঞ্চাগ্নিমত্তারম্ ইত্যেতৌ অগ্নীষোমৌ অত্রন্নভূতৌ মে মম বহুধা অনেকধা প্রজাঃ করিষ্যত ইত্যেবং সঞ্চিন্ত্য অণ্ডোৎপত্তিক্রমেণ সূর্য্যাচন্দ্রমসাবকল্পয়ৎ ॥ ৪

ভাষ্যানুবাদ।

তিনি(পিপ্পলাদ) পূর্ব্বোক্ত প্রশ্নকারী কবন্ধীকে বলিলেন— তাঁহার শঙ্কা দূরীকরণার্থ বলিলেন—প্রজাপতি প্রজাকাম হইয়া নিজের করণীয় প্রজা সৃষ্টির ইচ্ছুক হইয়া—অর্থাৎ ‘আমি সর্বাত্মক প্রজাপতি হইয়া জগৎ সৃষ্টি করিব’ এই প্রকার জ্ঞানসম্পন্ন এবং যথোক্ত কর্ম্মকারী(তদুপযুক্ত জ্ঞান ও কর্ম্মের একত্র অনুষ্ঠানকারী) ও তদ্ভাবে ভাবিত অর্থাৎ পূর্ব্বকল্পীয় সেই প্রজাপতি ভাবনা-সম্পন্ন [আত্মাই][বর্তমান] কল্পের আদিতে হিরণ্যগর্ভরূপে সমুৎপন্ন হইয়া সৃজ্যমান স্থাবর-জঙ্গমাত্মক প্রজাগণের পতি হইয়া—এই শ্রুতিতে যে সকল বিষয় বর্ণিত হইয়াছে, তদ্বিষয়ে জন্মান্তরীণ সংস্কারলব্ধ জ্ঞানরূপ তপস্যা করিয়াছিলেন, তদবিষয়ে আলোচনা করিয়াছিলেন; অর্থাৎ চিন্তাদ্বারা তদ্বিষয়ক পূর্ব্বসংস্কারকে উদ্বোধিত করিয়াছিলেন। অনন্তর, তিনি এবংবিধ তপস্যা করিয়া—শ্রৌতবিজ্ঞানের পর্যালোচনার

১০ প্রশ্নোপনিষৎ।

পর সৃষ্টির সাধন বা সহায়ভূত রয়ি—চন্দ্ররূপ অন্ন এবং প্রাণ— অগ্নিরূপ ভোক্তা, এই উভয় ‘মিথুন’ সৃষ্টি করিলেন—দ্বন্দ্ব উৎপাদন করিলেন।[ সহাবস্থিত বস্তুদ্বয়কে ‘দ্বন্দ্ব’ বলা হয়]। এই ভোক্তা ও ভোজ্য বা অন্নস্বরূপ অগ্নীযোম(সূর্য্য ও চন্দ্র) আমার প্রজাগণকে অনেক প্রকারে[ পরিণত] করিবে; এইরূপ চিন্তা করিয়া ব্রহ্মা সন্তানোৎপাদনের ক্রমানুসারে অর্থাৎ অগ্রে ব্রহ্মাণ্ড উৎপাদন করিয়া পরে সূর্য্য ও চন্দ্র সৃষ্টি করিলেন ॥(৪) ॥ ৪

আদিত্যো হ বৈ প্রাণো রয়িরেব চন্দ্রমা রয়ির্ব। এতৎ সর্বং, যন্মূর্তঞ্চামূর্ত্তঞ্চ, তস্মান্মর্ত্তিরেব রয়িঃ ॥ ৫

(৪) তাৎপর্য্য—পূর্ব্বকল্পে যিনি সমুচিতভাবে জ্ঞান ও কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াছেন, অর্থাৎ উপাসনার সহিত কম্মানুষ্ঠান করিয়াছেন, আমি হিরণ্যগর্ভরূপে প্রজাপতিত্ব লাভ করিয়া স্থাবর জঙ্গম সর্ব্বপদার্থ সৃষ্টি করিব, এইরূপ ভাবনা করিয়াছেন, এবং উপাসনাকালেও আপনাকে সর্ব্বাত্মক প্রজাগতিরূপে চিন্তা করিয়াছেন। সেই সংস্কারসম্পন্ন তিনিই নিজ কর্ম্মফলে পরবর্তী কল্পের প্রথমে হিরণ্যগর্ভরূপে সমস্ত প্রজার অধীশ্বর(প্রজাপতি) হইয়া আবির্ভূত হন; এবং তপস্যা বা চিন্তা দ্বারা পূর্ব্বকল্পীর সুপ্ত সংস্কার সমুহকে পুনব্বার জাগরিত করেন। সংস্কারের উদ্বোধক সেই চিন্তায় তাঁহার তপস্যা, তদ্ভিন্ন আর কোনরূপ তপস্যা তাঁহার নাই। সেই তপস্যার ফলে তাঁহার সেই পূর্ব্বসঞ্চিত জ্ঞানশ’ক্ত স্ফূর্ত্তি পায়; অনন্তর সৃষ্টি কার্য্যে প্রবৃত্তি হয়।

সৃষ্টির পূর্ব্বেই সৃষ্টি রক্ষার উপায় বিধান করা আবশ্যক; নচেৎ সৃজ্যমান পদার্থনিচয় বালির বাঁধের ন্যায় আপনা হইতেই বিধ্বস্ত হইয়া যাইতে পারে; এই কারণে তিনি প্রথমেই সূর্য্য ও চন্দ্র, এই দুইটি পদার্থের সূত্র করিলেন। তন্মধ্যে সূর্য্য স্বয়ংভোক্তা, এবং চন্দ্র তাঁহার ভোজ্য বা অন্নস্বরূপ। অভিপ্রায় এই যে, এক তেজেরই তিনটি অবস্থা(১) আধিদৈবিক(সূর্য্য),(২) আধিভৌতিক(আগ্ন), এবং(৩) আধ্যাত্মিক(দৈহিক উষ্মা)।

“অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ।

প্রাণাপানসমাযুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্ ॥[ গীতা ১০।১৪]

ভগবদ্গীতার কথানুসারে বুঝা যায় যে, দেহগত অগ্নিই প্রাণাপান সাহায্যে ভুক্ত অন্নের পরিপাক সাধন করেন। এই নিমিত্ত শ্রুতিতে অগ্নি বা সূর্য্যের উল্লেখ না করিয়া প্রাণের উল্লেখ করা হইয়াছে। কিন্তু শ্রুতির সমন্বয়ানুরোধে ‘প্রাণ’পদেই সূর্য্য অর্থ বুঝিতে হইবে। সূর্য্য অগ্নি ও প্রাণ, ইঁহারা সকলেই আদান, শোধন ও পরিপাকসাধন করিয়া থাকে; তজ্জন্য ইঁহাদিগকে ভোক্তশ্রেণীতে গণ্য করা যায়।

অপর দিকে ভোজ্যরূপে চন্দ্রের সৃষ্টি করিলেন; জীবভোজ্য যত প্রকার অন্ন আছে, সমস্তই চন্দ্রকিরণে পুষ্টিলাভ করে; এই কারণে চন্দ্রকেও ভোজ্যশ্রেণীতে গ্রহণ করা হইয়াছে। সর্ব্ব- প্রকার আহায্য—অন্নই ধনলভ্য, এই কারণে শ্রুতিতে চন্দ্র শব্দের পরিবর্তে ‘ররি’শব্দ প্রযুক্ত হইয়াছে। ‘ররি’ অর্থ—ধন।

প্রশ্নোপনিষৎ। ১১

শ্রুতিঃ স্বয়মেব প্রাণাদিশব্দার্থমাহ—আদিত্য ইত্যাদিনা। আদিত্যঃ হ বৈ (এব) প্রাণঃ(পূর্ব্বোক্তপ্রাণশব্দবাচ্যঃ), চন্দ্রমা এব রয়িঃ(পূর্ব্বোক্তরয়ি- পদার্থঃ)। যৎ মূর্ত্তং(স্থূলং), যৎ চ অমূর্ত্তং(সূক্ষ্মং), এতৎ সর্ব্বং বৈ(এব) রয়িঃ(অন্নং),[যত এতস্য ভোক্তৃ অপি অন্যেন ভুজ্যতে], তস্মাৎ মূর্ত্তিঃ(স্থূলরূপং মূর্ত্তম্) এব রয়ি(অন্নং)[সমর্থেন প্রাণেন অদ্যমানত্বাৎ ইতি ভাবঃ]॥

[শ্রুতি নিজেই ‘রয়ি’ ও ‘প্রাণ’ শব্দের অর্থ প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন]— আদিত্যই ‘প্রাণ’ পদবাচ্য এবং চন্দ্রই ‘রয়ি’ পদার্থ। মূর্ত্ত(স্থূল) ও অমূর্ত্ত (সূক্ষ্ম) যে সমস্ত পদার্থ, তৎসমস্তই ‘রয়ি’ অর্থাৎ অন্নস্বরূপ,[কিন্তু, মূর্ত্তমাত্রই অমূর্ত্তের উপভোগযোগ্য]; অতএব মূর্ত্তি বা মূল বস্তুই[যথার্থ,] রয়ি বা অন্ন- স্বরূপ ॥ ৫ ॥

শঙ্করভাষাম্।

তত্রাদিত্যো হ বৈ প্রাণোহত্তা অগ্নি; রয়িরেব চন্দ্রমাঃ। রয়িরেবান্নং সোম এব। তদেতদেকমত্তা অগ্নিশ্চান্নঞ্চ প্রজাপতিঃ, একং তু মিথুনম্; গুণ-প্রধানকৃতো ভেদঃ। কথম্? ররির্ব্বৈ অন্নমেব ততঃ—যন্মূওক স্থূলঞ্চ অমূর্ত্তঞ্চ সূক্ষ্মঞ্চ মূর্ত্তামূর্ত্তে অভ্রন্নরূপে রয়িরেব। তস্মাৎ প্রবিভক্তাদমূর্ত্তাৎ যদন্যম্মূর্ত্তরূপৎ মূর্ত্তিঃ, সৈব রয়িঃ অন্নম্ অমূর্ত্তেন অট্টা অন্যমানত্বাৎ॥ ৫॥

ভাব্যানুবাদ।

তন্মধ্যে আদিত্যই প্রাণ-ভোক্তা অগ্নিস্বরূপ, এবং চন্দ্রই ‘রয়ি’- অর্থাৎ সোম-চন্দ্রই রয়ি বা অন্নস্বরূপ। সেই এই ভোক্তা ও অন্ন, উভয়ই এক প্রজাপতিস্বরূপ; মিথুনও(পূর্ব্বোক্ত প্রাণ ও রয়ির সহবর্তিতারূপ দ্বন্দ্বও) একই বটে; গুণ-প্রধানভাব নিবন্ধন অর্থাৎ উভয়ের মধ্যে ভোগ্য-ভোক্তৃভাব বশতঃ ভেদ হইয়া থাকে। কি প্রকারে? এই সমস্তই রয়ি বা অন্নস্বরূপ তাহা কি?-যাহা এই মূর্ত স্থূল এবং যাহা অমূর্ত-সূক্ষম; অত্তা(ভোক্তা) ও অন্নস্বরূপ, মূর্ত ও অমূর্ত দ্বয় রয়ি বা অন্নস্বরূপই। অতএব প্রবিভক্ত বা মূর্ত হইতে পৃথককৃত অমূর্ত পদার্থ হইতে যে পৃথক্ মুর্তরূপ-মুর্তি

১২ প্রথাপনিষৎ।

(স্কুল পদার্থ), তাহাই[প্রকৃতপক্ষে] রয়ি; কারণ, উহা অমূর্ত্তকর্তৃক ভুক্ত হইয়া থাকে(৫) ॥ ৫

অথাদিত্য উদয়ন্ যৎ প্রাচীং দিশং প্রবিশতি,তেন প্রাচ্যান্ প্রাণান্ রশ্মিয়ু সন্নিধত্তে। যদ্দক্ষিণাং, যৎ প্রতীচীং, যদুদীচীং, যদধঃ, যদূদ্ধং, যদন্তরা দিশঃ, যৎ সর্ব্বং প্রকাশয়তি, তেন সর্ব্বান্ প্রাণান্ রশ্মিয়ু সন্নিধত্তে ॥ ৬

[ইদানীং রয়িবৎ প্রাণস্যাপি সর্ব্বাত্মকত্বং বক্তমাহ]-আদিত্য ইত্যাদি। আদিত্যঃ(সূর্য্যঃ) উদয়ন্(উদাচ্ছন্ সন্) যৎ প্রাচীং(পূর্ব্বাং) দিশং প্রবিশতি (স্বপ্রভয়া প্রকাশয়তি), তেন(প্রাচীদিক্রবেশেন) প্রাচ্যান্(পূর্বদিগ্‌তান্) প্রাণান্ রশ্মিযু(স্বীয়কিরণেযু) সনিধত্তে(সংবধ্নাতি-কিবণৈব্যাপ্নোতি, ইত্যর্থঃ)। যং দক্ষিণাং[দিশং প্রবিশতি, তেন তত্রত্যান্ প্রাণান রশ্মিযু সন্নিধত্তে। এবমুত্তরত্রাপি যোজনীয়ম্]। যৎ প্রতীচীং(পাশ্চমাং দিশ’), যৎ উদীচীং(উত্তরাং) দিশং যৎ অধঃ(দিশং) যৎ ঊর্দ্ধং(ঊর্দ্ধদিগ্‌ভাগং), যৎ অন্তরা(মধ্যবর্ত্তিনীঃ) দিশঃ,(অবান্তরদিশঃ), যৎ[চ][অন্যদপি] সর্ব্বং প্রকাশয়তি, তেন (তত্তদ্দিক্ প্রবেশেন)[তত্তদিক্স্মান্] সর্ব্বান্ প্রাণান্(প্রাণচক্ষুরাদীন) রশ্মিযু সন্নিধত্তে(ব্যাপ্নোতীত্যর্থঃ) ॥

[ এখন রয়ির ন্যায় উক্ত প্রাণেরও সর্ব্বাত্মভাব প্রতিপাদনার্থ বলিতেছেন যে],—আদিত্য উদয়কালে যে পূর্ব্বদিকে প্রবেশ করেন—স্বীয় কিরণ দ্বারা পরিব্যাপ্ত করেন, তাহা দ্বারা পূর্ব্বদিক্গত প্রাণসমূহকে স্বীয় রশ্মিসমূহে সন্নিহিত

প্রশ্নোপনিষৎ। ১৩

করেন, অর্থাৎ রশ্মি-সংযোগে পরিব্যাপ্ত করেন। আর যে, দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর, অধঃ, উর্দ্ধ, অবান্তরদিক্(কোণ) এবং আরও যে সমস্ত(বস্তু) প্রকাশ করেন, তাহা দ্বারা তত্রত্য সমস্ত প্রাণকে রশ্মিতে সন্নিহিত বা সংবদ্ধ করেন ॥ ৬

পাঞ্চরভাষ্যম্।

তথা অমূর্তোহপি প্রাণোহত্তা সব্বমেব, যচ্চাদ্যম্। কথম্?—অথ আদিত্য উদ- রন্ উদ্গচ্ছন্ প্রাণিনাং চক্ষুর্গোচরমাগচ্ছন্ যৎ প্রাচীং দিশং স্বপ্রকাশেন প্রবিশতি ব্যাপ্নোতি; তেন স্বাত্মব্যাপ্ত্যা সর্ব্বান্ তৎস্থান্ প্রাণান্ প্রাচ্যানন্তর্ভূতান্ * রশ্মিষু স্বাত্মাবভাসরূপেষু ব্যাপ্তিমৎসু ব্যাপ্তত্বাৎ প্রাণিনঃ সন্নিধত্তে সন্নিবেশয়তি, আত্মভূতান্ করোতীত্যর্থঃ। তথৈব যৎ প্রবিশতি দক্ষিণাং যৎ প্রতীচীং, যদুদীচীম্, অধঃ উর্দ্ধং, যৎ প্রবিশাত, যচ্চ অন্তরা দিশঃ কোণদিশোহবান্তরদিশঃ, যচ্চান্যৎ সর্ব্বং প্রকাশয়তি, তেন স্বপ্রকাশব্যাপ্তা সর্ব্বান্ সর্ব্বদিক্স্মান্ প্রাণান্ রশ্মিষু সন্নিধত্তে ॥ ৬

ভাবানুবাদ।

যে কিছু অদনীয় বা অন্ন, তৎসমুদয়ও[প্রাণ স্বরূপ, অতএব] ভোক্তা অমূর্ত্ত প্রাণও সর্বাত্মক। কি প্রকারে?[তাহা বলা হইতেছে-] আদিত্য উদীয়মান হইয়া-লোকলোচনের গোচর হইয়া যে, প্রাচী(পূর্ব) দিকে প্রবেশ করেন,-স্বীয় প্রভা দ্বারা ঐ দিককে পরিব্যাপ্ত করেন; সেই স্বীয় ব্যাপ্তি দ্বারাই ব্যাপ্তিমান্ বা ব্যাপক, স্বীয় প্রকাশরূপ রশ্মিসমূহে পরিব্যাপ্ত বা সম্বদ্ধ থাকায় তত্রত্য- পূর্বদিকস্থিত প্রাণেরই অন্তর্ভূত প্রাণসমূহকে প্রাণিগণকে সন্নিহিত- সন্নিবেশিত অর্থাৎ স্বাত্মভূত বা প্রকাশমান করিয়া থাকেন। সেই প্রকারই তিনি যে, দক্ষিণ দিকে প্রবেশ করেন, পশ্চিমদিকে যে, [প্রবেশ করেন],[এবং] উত্তর অধঃ ও উর্দ্ধদিকে যে প্রবেশ

১৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

করেন, আর যে, অন্তরা দিক্—কোণ দিক্ অবান্তর বা পূর্ব্বাদি দিকের মধ্যগত দিক্সমূহকে এবং অপরও যে সমস্ত বস্তুকে প্রকাশ করিয়া থাকেন; তাহাতেও স্বীয় প্রকাশ সম্বন্ধ দ্বারা সর্বদিক্-গত সমস্ত প্রাণকে রশ্মিসমূহে সন্নিহিত(আপনার ন্যায় প্রকাশমান) করিয়া থাকেন ॥ ৬

স এব বৈশ্বানরো বিশ্বরূপঃ প্রাণোহগ্নিদয়তে। তদেতদ্ ঋচাতুভ্যুক্তম্ ॥ ৭

[অথ প্রাণাদিত্যস্য সর্ব্বাত্মকত্ব-সমর্থনায়াহ স এষ ইতি]—সঃ আদিত্যরূপে- ণোক্ত এষ বিশ্বরূপঃ(বিশ্বং বিবিধং জগৎ রূপং যস্য স তথোক্তঃ সর্ব্বাত্মা ইত্যর্থঃ),[অতএব] বৈশ্বানরঃ(নরাঃ জীবাঃ, বিশ্বে নরা অন্য ইতি, বিশ্বশ্চাসৌ নরশ্চেতি বা, স তথোক্তঃ) প্রাণঃ(আদিত্যরূপঃ) অগ্নিঃ(দাহপ্রকাশহেতুঃ অত্তা) উদয়তে(প্রত্যহমুদ্গচ্ছতি)। তদেতৎ আদিত্যমাহাত্ম্যং) ঋচা(পাদ- বদ্ধমন্ত্রেণ) অভ্যুক্তম্(বর্ণিতম্)॥

সেই পূর্ব্ব-প্রস্তাবিত বিশ্বরূপী, বৈশ্বানর(সর্ব্বজীবাত্মক) প্রাণস্বরূপ অগ্নি (ভোক্তা)[আদিত্যরূপে প্রতাহ] উদিত হন, ইহা ঋকেও উক্ত হইয়াছে। [ছন্দোবদ্ধ—পাদযুক্ত মন্ত্রকে ‘ঋক্’ বলা হইয়াছে]॥ ৭

শঙ্কর-ভাব্যম্।

স এষোহত্তা প্রাণো বৈশ্বানরঃ সর্বাত্মা বিশ্বরূপঃ, বিশ্বাত্মত্বাচ্চ প্রাণোহগ্নিশ্চ, স এবাত্তা উদয়তে—উদ্‌গচ্ছতি প্রত্যহং সর্ব্বা দিশঃ আত্মসাৎ কুর্ব্বন্। তদে- তদুক্তং বস্তু ঋচা মন্ত্রেণাপ্যভ্যুক্তম্ ॥ ৭

ভাষ্যানুবাদ।

সেই এই ভোক্তা প্রাণই বৈশ্বানর(সর্ববনরাভিমানী) ও বিশ্বরূপ (সর্ববজগন্ময়); সর্বাত্মক বলিয়াই সেই প্রাণ অগ্নি স্বরূপও বটে; সেই অভ্রাই প্রত্যহ সমস্ত দিঘণ্ডলকে নিজের আয়ত্ত(প্রকাশময়)

প্রশ্নোপনিষৎ। ১৫

করিয়া উদিত—উদ্‌গত হইয়া থাকেন। এই কথিত বিষয়টি ঋক্ কর্তৃকও বিশেষভাবে উক্ত হইয়াছে(৬) ॥ ৭

বিশ্বরূপং হরিণং জাতবেদসং পরায়ণং জ্যোতিরেকং তপন্তম্। সহস্ররশ্মিঃ শতধা বর্ত্তমানঃ প্রাণঃ প্রজানামুদয়ত্যেষ সূর্য্যঃ ॥ ৮

[তামেব ঋচমাহ]—বিশ্বরূপমিত্যাদি। বিশ্বরূপং(সর্ব্বাত্মান, হরিণং (রশ্মিমন্তং, হরণশীলং সর্ব্বসংহার কারণং বা), জাতবেদসং(জাতানি বেদাংসি— সর্ব্ববিষয়ক-জ্ঞানানি যস্মাৎ; তং তথোক্তম্), পরায়ণং(সর্ব্বাশ্রয়ভূতং) একং (অদ্বিতীয়ং—ভেদশূন্যং) জ্যোতিঃ(তেজোময়ং), তপন্তং(তাপং কুর্ব্বন্তং সূর্য্যং) [অহং বিজানামীতি শেষঃ]। সহস্ররশ্মিঃ(অনন্তকিরণঃ), শতধা(প্রাণিভেদ- বশাৎ বহুপ্রকারেণ) বর্তমানঃ, প্রজানাং(জন্মশীলানাং) প্রাণঃ(সংস্থিতি- কারণং) এষ সূর্য্য উদয়তি(প্রত্যহমুদ্গচ্ছতীত্যর্থঃ) ॥

বিশ্বরূপী, হরিণ—রশ্মিযুক্ত বা সর্ব্বসংহারক, জাতবেদা(সর্ব্বজ্ঞানপ্রদ), সর্ব্বোৎকৃষ্ট আশ্রয়, এক, জ্যোতির্ম্ময় ও তাপপ্রদ[সূর্য্যকে আমি বিশেষরূপে জানি]। অনন্তরশ্মিসম্পন্ন, প্রাণিভেদে বহুরূপে প্রকাশমান এবং সমস্ত প্রজার প্রাণস্বরূপ এই সূর্য্য[প্রত্যহ] উদিত হইতেছেন ॥ ৮

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

বিশ্বরূপং সর্ব্বরূপং হরিণং রশ্মিমন্তং, জাতবেদসং জাতপ্রজ্ঞানং, পরায়ণং সর্ব্বপ্রাণাশ্রয়ং, জ্যোতিরেকং সর্ব্ব প্রাণিনাং চক্ষুর্ভূতমদ্বিতীয়ং, তপন্তং তাপক্রিয়াং কুর্ব্বাণং, স্বাত্মানং সূর্য্যং সূরয়ো বিজ্ঞাতবন্তো ব্রহ্মবিদঃ। কোহসৌ? যং বিজ্ঞাত- বন্তঃ? সহস্ররশ্মিঃ অনেকরশ্মিঃ শতধা অনেকধা প্রাণিভেদেন বর্তমানঃ প্রাণঃ প্রজানাম্ উদয়ত্যেষঃ সূর্য্যঃ ॥ ৮

ভাষ্যানুবাদ।

বিশ্বরূপ—সর্ব্বরূপী, হরিণ—রশ্মিমান্, জাতবেদস্—প্রজ্ঞানসম্পন্ন, পরায়ণ সমস্ত প্রাণের আশ্রয়ীভূত, এক বা প্রধান জ্যোতিঃ অর্থাৎ

১৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

সমস্ত প্রাণীর অদ্বিতীয় চক্ষুঃস্বরূপ, এবং তাপপ্রদ, স্বাত্মভূত সূর্য্যকে ব্রহ্মজ্ঞ পণ্ডিতগণ বিশেষরূপে জানিয়াছেন। যাঁহাকে জানিয়াছেন, ইনি কে? না—সহস্ররশ্মি---অনেক কিরণ-সম্পন্ন, প্রাণিভেদে বহু- প্রকারে অবস্থিত এবং প্রজাগণের প্রাণস্বরূপ এই সূর্য্য উদিত হইয়া থাকেন ॥ ৮

সংবৎসরো বৈ প্রজাপতিঃ; তস্যায়নে দক্ষিণঞ্চোত্তরঞ্চ। তদ্যে হ বৈ তদিষ্টাপূর্ত্তে কৃতমিত্যুপাসতে; তে চান্দ্রমসমেব লোকমভিজয়ন্তে। ত এব পুনরাবর্ত্তন্তে। তস্মাদেতে ঋষয়ঃ প্রজাকামা দক্ষিণং প্রতিপদ্যন্তে। এষ হ বৈ রয়ির্যঃ পিতৃযাণঃ॥৯

[সূর্য্যাচন্দ্রমসাত্মক-প্রজাপতেঃ সর্ব্বপ্রজোৎপাদনপ্রকারং বক্তুং তস্য কালরূপং রূপান্তরমাহ]-সংবৎসর ইত্যাদি। ‘বৈ’ শব্দঃ প্রসিদ্ধিদ্যোতকঃ।[পূর্ব্বোক্তঃ চন্দ্রসূর্য্যাত্মকঃ] প্রজাপতিরেব সংবৎসরঃ[সংবৎসরস্য চন্দ্র-সূর্যাধীনত্বাদিতি ভাবঃ]। তস্য(প্রজাপতেঃ) দক্ষিণং চ, উত্তরং চ,[ইত্যেতে দ্বে] অয়নে (মার্গৌ)[বর্তেতে]।[‘হ’ ‘বৈ’ পদদ্বয়ং প্রসিদ্ধিসূচকং,] তৎ(তস্মাৎ) যে(ফলাথিনঃ) তৎ(যথা স্যাৎ, তথা) ইষ্টাপূর্তে(ইষ্টং বৈদিকং যাগাদিকং কৰ্ম্ম, পূর্তং-মৃত্যুক্তং কুপারামাদিকরণং; তদুভয়ং) কৃতং(প্রযত্নসম্পাদিতম্) ইতি কৃত্বা উপাসতে(অনুতিষ্ঠন্তি)। তে(তদনুষ্ঠাতারঃ) চান্দ্রমসং(চন্দ্রমসি ভবং) লোকম্ এব(নতু লোকান্তরং) অভিজয়ন্তে(সর্ব্বতঃ প্রাপ্নুবন্তি)। তে(চান্দ্রমস- লোকগতাঃ) এব(ন তু অন্যে) পুনঃ(তত্রত্যভোগক্ষয়াৎ পরং) আবর্তন্তে (মর্ত্যলোকং পুনরাগচ্ছন্তীত্যর্থঃ)। তস্মাৎ এতে(কর্মিণঃ) ঋষয়ঃ(স্বর্গদ্রষ্টারঃ) প্রজাকামা:(সন্তানার্থিনঃ);[তত এব চ] দক্ষিণং(দক্ষিণায়নং) প্রতিপদ্যন্তে (লভন্তে)। এবঃ(চান্দ্রমসঃ লোকঃ) হ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) রয়িঃ(অন্নং-ভোগ্যঃ), যঃ পিতৃযাণঃ(ধূমাদিলক্ষণ-পিতৃযাণলভ্যঃ চান্দ্রমসো লোক ইত্যর্থঃ) ॥

চন্দ্র সূর্য্যাত্মক প্রজাপতি হইতে যে প্রকারে সমস্ত প্রজার উৎপত্তি হয়, তাহা বলিবার অভিপ্রায়ে প্রজাপতির কালস্বরূপ অপর একটি রূপ নির্দেশ করিতে- ছেন।—সেই চন্দ্রাদিত্যময় প্রজাপতিই আবার সংবৎসরস্বরূপ; তাহার দুইটি

প্রশ্নোপনিষৎ। ১৭

অয়ন বা পথরূপ অংশ আছে,—একটি দক্ষিণ, অপরটি উত্তর। অতএব যাহারা কৃত অর্থাৎ যত্নসাধ্য—অনিত্য মনে করিয়া ইষ্ট—বেদোক্ত যাগাদি কৰ্ম্ম ও পূর্ত্ত— স্মৃত্যুক্ত কূপ ও উদ্যান নির্মাণ প্রভৃতি কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়া থাকে, তাহারা চন্দ্রমণ্ডলে স্থান প্রাপ্ত হয়, এবং তাহারাই পুনর্ব্বার[ইহলোকে] প্রত্যাগত হয়, সেই কারণেই প্রজাকাম বা সন্তানার্থী এই সকল(কর্মী) ঋষি দক্ষিণায়ন (ধূমাদিমার্গ) প্রাপ্ত হন। ইহাই রয়ি—সর্ব্বভোগ্য, যাহা পিতৃযাণ(ধূমাদিমার্গ) বলিয়া কথিত হয়॥ ৯

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

যশ্চাসৌ চন্দ্রমা মূর্তিরন্নম্, অমূর্তিশ্চ প্রাণোহত্তাদিত্যঃ, তদেকমেতন্মিথুনং সর্ব্বং কথং প্রজাঃ করিষ্যত ইতি? উচ্যতে-তদেব কালঃ সংবৎসরো বৈ প্রজাপতিঃ, তন্নির্বর্ত্যত্বাৎ সংবৎসরস্য। চন্দ্রাদিতা-নির্বর্ত্য-তিথ্যহোরাত্র-সমুদায়ো হি সংবৎসরঃ তদনন্যত্বাদ্রয়ি-প্রাণমিথুনাত্মক এব ইত্যুচ্যতে। তৎ কথং? তস্য সংবৎসরস্য প্রজাপতেঃ অয়নে মাগোঁ দ্বৌ-দক্ষিণং চোত্তরঞ্চ। যে প্রসিদ্ধে হ্যায়নে যক্ষ্মাসলক্ষণে, যাভ্যাং দক্ষিণেনোত্তরেণ চ যাতি সবিতা কেবলকর্মিণাং জ্ঞানসংযুক্তকর্মবতাঞ্চ লোকান্ বিদধৎ। কথং তৎ? তত্র চ ব্রাহ্মণাদিষু যে হ বৈ ঋষয়ঃ তদুপাসত ইতি। ক্রিয়াবিশেষণো দ্বিতীয়স্তচ্ছন্দঃ। ইষ্টঞ্চ পূর্ত্তঞ্চ-ইষ্টাপূর্তে, ইত্যাদি কৃতমেবোপাসতে, নাকৃতং নিত্যম্; তে চান্দ্রমসমেব চন্দ্রমসি ভবং প্রজাপতের্ম্মিখুনাত্মকস্যাংশং রয়িমন্নভূতং লোকম্ অভিজয়ন্তে, কৃতরূপত্বাচ্চান্দ্রমসস্য। তএব চ কৃতক্ষয়াৎ পুনরাবর্তন্তে; “ইমং লোকং হীনতরং বা বিশন্তি” ইতি হ্যুক্তম্। যম্মাদেবং প্রজাপতিমন্নাত্মকং ফলত্বেনাভিনির্বর্তয়ন্তি চন্দ্রমিষ্টাপূর্ত্তকৰ্ম্মণা এতে ঋষয়ঃ স্বর্গদ্রষ্টারঃ প্রজাকামাঃ প্রজার্থিনো গৃহস্থাঃ, তস্মাৎ স্বকৃতমেব:দক্ষিণং দক্ষিণায়নোপলক্ষিতং চন্দ্রং প্রতিপদ্যন্তে। এষ হ বৈ রয়িঃ অন্নং, যঃ পিতৃযাণঃ পিতৃযাণোপলক্ষিতশ্চন্দ্রঃ ॥ ৯

ভাষ্যানুবাদ।

এই যে, মূর্তিসম্পন্ন চন্দ্রমারূপ অন্ন এবং অমূর্ত্ত প্রাণস্বরূপ ভক্ষণকর্ত্তা আদিত্য সর্ব্বময় হইলেও এই একটি মাত্র মিথুনই কি প্রকারে প্রজাসমূহকে সৃষ্টি করিবে? হাঁ, বলা যাইতেছে,—

১৮ প্রশ্নোপনিষৎ

সেই পূর্ব্বোক্ত মিথুনই কালরূপী সংবৎসরাত্মক প্রজাপতি-স্বরূপ; কারণ, তাহা দ্বারাই(চন্দ্র সূর্য্য দ্বারাই অহোরাত্রাদিরূপে) সংবৎসর সম্পন্ন হইয়া থাকে। কেন না, চন্দ্র ও সূর্য্য দ্বারা সম্পাদ্য তিথি ও অহোরাত্র সমষ্টিরূপ সংবৎসর(৭)[কার্য্য-কারণের অভেদ নিয়মানু- সারে কখনই] সেই মিথুনাত্মক চন্দ্র সূর্য্য হইতে অন্য নহে; এই কারণেই রয়ি ও প্রাণের মিথুনাত্মক বলিয়া কথিত হইয়া থাকে। তাহাই বা(মিথুন-নিষ্পাদ্যই বা) কি প্রকারে?[এই প্রকারে]-সেই সংবৎসররূপী প্রজাপতির দুইটি অয়ন বা পথ-দক্ষিণ এবং উত্তর। সূর্য্য দক্ষিণ ও উত্তরসংজ্ঞক যে দুইটি অয়ন দ্বারা কেবল কর্মীদিগের (উপাসনা-রহিত কর্মানুষ্ঠাতৃগণের) এবং জ্ঞানসহকৃত কৰ্ম্মানুষ্ঠাতৃ- গণের ফল-বিধানার্থ(৮) গমন করেন, যম্নাসাত্মক সেই দুইটি অয়ন (দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ণ) প্রসিদ্ধই[আছে]। তাহা কি প্রকার? [তদুত্তরে বলিতেছেন]-শ্রুতির দ্বিতীয় ‘তৎ’ শব্দটি ক্রিয়া-বিশেষণ। সেই ব্রাহ্মণাদির মধ্যে যাহারা সেইরূপ উপাসনা করেন; ইষ্ট ও পূর্ত্ত, এই উভয়বিধ ‘কৃত’(অনিত্য) কর্মেরই উপাসনা করেন;(৯)

প্রশ্নোপনিষৎ।

—অকৃত বা নিত্য কর্ম্মের নহে; তাঁহারা চান্দ্রমস—চন্দ্র-সম্ভূত, মিথুনাত্মক, প্রজাপতিরই অংশভূত রয়ি—অন্নস্বরূপ লোক(চন্দ্র- লোক) সম্যরূপে জয় করেন(প্রাপ্ত হন); কারণ, চান্দ্রমস লোক ও কৃতরূপী(অনিত্য)। তাঁহারাই আবার কৰ্ম্ম-ক্ষয়ের পর প্রত্যাবৃত্ত হন(১০)। ‘এই লোকে অথবা[এতদপেক্ষাও] হীনতর লোকে প্রবেশ করেন।’ এই কথাটি[মন্ত্রকাণ্ডে] উক্ত আছে। যে হেতু, এই সকল ঋষি—স্বর্গ-দ্রষ্টা, পূর্ব্বোক্ত প্রজাকাম—ফলার্থী গৃহস্থগণ উক্তপ্রকার ইষ্টাপূর্ত্ত কৰ্ম্ম দ্বারা এই অন্নরূপী প্রজাপতি চন্দ্রকে ফল- রূপে সম্পন্ন করেন, সেই হেতুই[তাঁহারা] স্বসম্পাদিত দক্ষিণ অর্থাৎ দক্ষিণায়নগম্য চন্দ্রকেই প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। এই যে, পিতৃযাণ অর্থাৎ পিতৃযাণোপলক্ষিত চন্দ্র, ইহাই সেই প্রসিদ্ধ রয়ি—অন্ন ॥ ৯

অথোত্তরেণ তপসা ব্রহ্মচর্য্যেণ শ্রদ্ধয়া বিদ্যয়াত্মানমন্বিষ্যা- দিত্যমভিজয়ন্তে। এতদ্বৈ প্রাণানামায়তনমেতদমৃতমভয়মেতৎ পরায়ণম্; এতস্মান্ন * পুনরাবর্ত্তন্ত ইত্যেষ নিরোধঃ। তদেব শ্লোকঃ ॥ ১০

অথ(অনন্তরং)[অনাবৃত্তিসাধনময়নমুচ্যতে]--তপসা(বৈধক্লেশ- সহনেন) ব্রহ্মচর্য্যেণ(ইন্দ্রিয়-সংযমেন) শ্রদ্ধয়া(তৎপরতয়া, আস্তিক্যবুদ্ধ্যা বা)

২০ প্রশ্নোপনিষৎ।

বিদ্যয়া(উপাসনেন) আত্মানং অন্বিষ্য(আদিত্যং প্রাণম্ আচার্য্যাৎ ‘অহমস্মি’ ইতি জ্ঞাত্বা) উত্তরেণ(উত্তরায়ণেন অচ্চিরাদিমার্গেণ ইতি যাবৎ) আদিত্যম অভিজয়ন্তে,(সর্ব্বতঃ প্রাপ্নুবন্তীত্যর্থঃ)। এতৎ(প্রাজাপত্যং রূপং) বৈ(এব) প্রাণানাম্(প্রাণ-চক্ষুরাদীনাং) আয়তনম্(আশ্রয়ঃ), এতৎ অমৃতম্(অবিনাশি), [অতএব] অভয়ং(নাস্তি বিনাশাদিভয়ং যস্মিন্, তৎ তথা)। এতৎ পরায়ণং (উৎকৃষ্টং স্থানম্ উপাসকানাং, বিদ্যাসহকৃতকর্মিণাং চ)। এতস্মাৎ(স্থানাৎ আদিত্যাৎ) পুনঃ ন আবর্ত্তন্তে(ন সংসরন্তি),[জ্ঞানিনঃ, জ্ঞানসহকৃত-কর্ম্মিণশ্চ ইতিশেষঃ]। ইতি। এষঃ(পূর্ব্বোক্ত আদিত্যঃ) নিরোধঃ(অনাবৃত্তিসাধনঃ) [অথবা অবিদুযাং গতিনিরোধ ইত্যর্থঃ]। তৎ(তস্মিন্ বিষয়ে) এষঃ(বক্ষ্যমাণ- প্রকারঃ) শ্লোকঃ(মন্ত্রঃ)[অস্তি ইতি শেষঃ।]॥

এখন অনাবৃত্তি-সাধক পথ কথিত হইতেছে]—আর উত্তর পথে (অর্থাৎ অচ্চিরাদি মার্গে) তপস্যা ব্রহ্মচর্য্য শ্রদ্ধা ও বিদ্যা দ্বারা আত্মাকে অন্বেষণ করিয়া আদিত্যকে জয় করেন; অর্থাৎ আদিত্যলোকে গমন করেন। ইহাই প্রাণসমূহের আয়তন(অর্থাৎ আশ্রয়) ইহাই অমৃত (বিনাশহীন),[অতএব] অভয়। ইহাই পরমার্থ(অর্থাৎ উৎকৃষ্ট স্থান), এই স্থান হইতে আর ফিরিয়া আইসে না;[কারণ ইহাই তাহাদের] নিরোধ বা অনাবৃত্তি-সাধন। অথবা নিরোধ অর্থ অবিদ্বদ্গণের অগম্য স্থান ॥ ১০

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

অথ উত্তরেণ অয়নেন প্রজাপতেরংশং প্রাণমত্তারম্ আদিত্যমভিজয়ন্তে। কেন? তপসা ইন্দ্রিয়জয়েন, বিশেষতো ব্রহ্মচর্য্যেণ, শ্রদ্ধয়া, বিদ্যয়া চ প্রজাপত্যাত্ম- বিষয়য়া আত্মানং প্রাণং সূর্য্যং জগতঃ তস্থুষশ্চ অন্বিষ্য ‘অহমস্মি’ ইতি বিদিত্বা আদিতাম্ অভিজয়ন্তে অভিপ্রাপ্নুবন্তি। এতদ্বৈ আয়তনং সর্বপ্রাণানাং সামান্যম্ আয়তনম্ আশ্রয়ঃ, এতদমৃতম্ অবিনাশি, অভয়ং, অতএব ভয়বর্জিতং-ন চন্দ্রবৎ ক্ষয়-বৃদ্ধিভয়বৎ, এতৎ পরায়ণং পরা গতির্ব্বিন্যাবতাং কম্মিণাঞ্চ জ্ঞানবতাম্, এতস্মান্ন পুনরাবর্ত্তন্তে যথেতরে কেবলকস্মিণঃ, ইতি-যম্মাদেষঃ অবিদুষাং নিরোধঃ; আদিত্যাদ্ধি নিরুদ্ধা অবিদ্বাংসঃ। নৈতে সংবৎসরমাদিত্যমাত্মানং প্রাণ- মভিপ্রাপ্ত বন্তি।স হি সংবৎসরঃ কালাত্মা অবিদুষাং নিরোধঃ। তত্তত্রাস্মিন্নর্থে এষঃ শ্লোকো মন্ত্রঃ ॥১০

প্রশ্নোপনিষৎ। ২১

ভাষ্যানুবাদ।

“অথ”—[‘অথ’ শব্দে পূর্ব্বোক্ত পথের সহিত ইহার পার্থক্য সূচনা করিতেছে]। উত্তরায়ণ দ্বারা প্রজাপতির অংশভূত, ভোক্তা, প্রাণরূপী আদিত্যকে জয় করিয়া থাকেন; কি উপায়ে?—তপস্যা— ইন্দ্রিয়সংযম দ্বারা, বিশেষতঃ ব্রহ্মচর্য্য দ্বারা, শ্রদ্ধা দ্বারা এবং প্রজা- পতিতে আত্মভাববিষয়ক বিদ্যা(উপাসনা) দ্বারা আত্মা—প্রাণরূপী সূর্য্যকে এবং স্থাবর-জঙ্গম সমস্তকেই অন্বেষণ করিয়া—‘আমিই তদাত্মক’ এইরূপে অবগত হইয়া আদিত্যকে জয় করেন, অর্থাৎ আদিত্যকে প্রাপ্ত হন। ইহাই সমস্ত প্রাণের আয়তন বা সাধারণ আশ্রয়, ইহা অমৃত— বিনাশরহিত, অতএব অভয়—সর্বভয়বিবর্জিত, অর্থাৎ চন্দ্রলোকের ন্যায় ক্ষয় ও বৃদ্ধিজনিত ভয়স্থান নহে। ইহাই বিদ্যাসহকৃত কর্মী ও জ্ঞানিগণের উৎকৃষ্ট গম্যস্থান। জ্ঞানরহিত কম্মিগণের ন্যায় [ইহারা] এই স্থান হইতে পুনরাবৃত্ত হন না; কারণ, ইহা বিদ্যাবিহীন- গণের নিরোধ স্থান; অর্থাৎ অবিদ্বদ্ ব্যক্তিরা আদিত্য হইতে প্রতিষিদ্ধ; সুতরাং তাহারা সংবৎসরাত্মক আদিত্যরূপী আত্মাকে প্রাপ্ত হয় না, কেন না, কালরূপী সেই সংবৎসর অবিদ্বান্ দিগের নিরোধ বা নিষিদ্ধ স্থান(১১)। এ বিষয়ে এইরূপ মন্ত্র আছে—॥১০

২২ প্রশ্নোপনিষৎ।

পঞ্চপাদং পিতরং দ্বাদশাকৃতিং দিব আহুঃ পরে অর্দ্ধে পুরীষিণম্। অথেমে অন্য উ পরে বিচক্ষণং সপ্তচক্রে ষড়র আহুরপিতমিতি ॥১১

[সংবৎসরাত্মনঃ আদিত্যস্য রূপকপুরিকল্পনমাহ-পঞ্চপাদমিত্যাদিনা]।— ইমে(বুদ্ধিস্থাঃ) অন্যে(কালজ্ঞাঃ) পঞ্চপাদং(পঞ্চ ঋতবঃ পাদা আবর্তনসহায়া যস্য আদিত্যস্য স তথোক্তঃ, তং),[হেমন্ত-শিশিরৌ একীকৃত্য ঋতুনাং পঞ্চ- বিধত্বং বোধ্যম্।] পিতরং(জগজ্জনয়িতারম্), দ্বাদশাকৃতিং(দ্বাদশ মাসা আকৃতয়ঃ অবয়বা যস্য, স তথোক্তঃ, তম্), দিবঃ(অন্তরীক্ষাৎ) পরে(উর্দ্ধে) অর্দ্ধে(স্থানে—স্বর্গে)[স্থিতং], পুরীষণং(পুরীষং—পুরীষমিব ত্যাজ্যং উদকম্ অস্য অস্তীতি, তম্)[আদিত্যম্] আহুঃ(কথয়ন্তি)[কালবিদ ইতি শেষঃ]। অথ(পক্ষান্তরসূচকং), পরে(অপরে কালবিদঃ) উ(তু—পুনঃ) বিচক্ষণং (বিচক্ষণে—নিপুণে) সপ্তচক্রে(সপ্তসংখ্যকা অশ্বাঃ চক্রাণি গতিসাধনানি যস্য; সঃ, তস্মিন্), ষড়রে(ষড়ঋতবঃ অরাঃ—নাভিশলাকাঃ যস্য, সঃ, তস্মিন্), [আদিত্যে ইদং জগৎ] অর্পিতম্ আহুঃ। ইতিশব্দঃ মন্ত্রসমাপ্তৌ ॥

এই অপর কালবিদ্গণ,[আদিত্যকে] পাঁচট পাদযুক্ত, পিতা(জগতের জন্ম-হেতু), দ্বাদশ প্রকার আকৃতি(অবয়ব) বিশিষ্ট, পুরীষী(বিষ্ঠার ন্যায় জলত্যাগকারী) এবং দ্যুলোকের(অন্তরীক্ষলোকেরও) পরার্দ্ধে(স্বর্গে)[অবস্থিত] বলিয়া থাকেন। আবার অপর সকলে[এই জগৎকে] সপ্তচক্র বিশিষ্ট ছয়টি অর(নাভিশলাকাসম্পন্ন) এবং বিচক্ষণে(আদিত্যে) অর্পিত বলিয়া বর্ণনা করেন ॥১১

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

পঞ্চপাদং পঞ্চর্তবঃ পাদা ইবাস্য সংবৎসরাত্মন আদিত্যস্য, তৈরসৌ পাদৈরিব ঋতুভিরাবর্ততে। হেমন্তশিশিরাবেকীকৃত্যেয়ং কল্পনা। পিতরং সর্ব্বস্য জনয়ি- তৃত্বাৎ পিতৃত্বং তস্য; তং, দ্বাদশাকৃতিং—দ্বাদশমাসা আকৃতয়োহবয়বাঃ, আকরণং বা অবয়বিকরণমস্য দ্বাদশমাসৈঃ, তং দ্বাদশাকৃতিং, দিবঃ দ্যুলোকাৎ পরে উর্দ্ধে অর্দ্ধেস্থানে তৃতীয়স্যাং দিবীত্যর্থঃ পুরীষিণং পুরীষবন্তমাউদকবন্তমাহুঃ,—কালবিদঃ।

প্রশ্নোপনিষৎ। ২৩

অথ তমেবান্যে ইমে উপরে কালবিদঃ বিচক্ষণং নিপুণং সর্ব্বজ্ঞং সপ্তচক্রে সপ্তহয়রূপে চক্রে সন্ততগতিমতি কালাত্মনি ষড়রে ষড়ঋতুমতি আহুঃ সর্ব্বমিদং জগৎ কথয়ন্তি, অর্পিতম্ অরা ইব রথনাভৌ নিবিষ্টমিতি। যদি পঞ্চপাদো দ্বাদশাকৃতির্ষদি সপ্তচক্রঃ ষড়রঃ, সর্ব্বথাপি সংবৎসরঃ কালাত্মা প্রজাপতিশ্চন্দ্রাদিত্যলক্ষণোহপি জগতঃ কারণম্ ॥১১

ভাষ্যানুবাদ।

অন্য কালবিদ্গণ[এই আদিত্যকে] পঞ্চপাদ – পাঁচটি ঋতুই এই সংবৎসাত্মক আদিত্যের পাদস্বরূপ];[কারণ,] সেই ঋতুরূপ পাদ সমূহ দ্বারাই এই ‘আদিত্য বিবর্ত্তমান হইয়া থাকেন, অর্থাৎ পরিভ্রমণ করেন। হেমন্ত ও শিশির ঋতুকে এক ধরিয়া এইরূপ(ঋতুর পঞ্চত্ব) কল্পনা[করা হইয়াছে]। পিতা—সমস্ত বস্তুর উৎপত্তির হেতু বলিয়া তাঁহার(আদিত্যের) পিতৃত্ব কল্পনা[হইয়াছে]। দ্বাদশাকৃতি— দ্বাদশ মাসই ইহার আকৃতি বা, অবয়ব; অথবা দ্বাদশ মাস দ্বারাই ইহার আ-করণ অবয়বিত্ব সম্পাদন[হয় বলিয়া] ইনি দ্বাদশাকৃতি; পুরীষিন্—উদকরূপ পুরীষ(মল)-সম্পন্ন,(১২) বিচক্ষণ—নিপুণ অর্থাৎ সর্বজ্ঞ এবং দ্যুলোকেরও পরে অর্থাৎ অন্তরীক্ষ লোকেরও উর্দ্ধে—তৃতীয় স্বর্গে[অবস্থিত] বলিয়া থাকেন। ‘অথ’ শব্দ (পক্ষান্তরসূচক), অপর এই সকল কালবিদ্গণ কিন্তু রথনাভিতে (চক্রমধ্যস্থ রন্ধ্রে) অর বা শলাকাসমূহের ন্যায় ষড়্‌বিধ ঋতুযুক্ত এবং সপ্তচক্রে অর্থাৎ সপ্তাশ্বরূপে চক্রবৎ সর্বদা গমনশীল(পরিবর্ত্তন- স্বভাব) এই কালচক্রে বিচক্ষণকে—নিপুণ সর্বজ্ঞকে(আদিত্যকে) অবস্থিত বলিয়া থাকেন; আর রথনাভিতে(চক্রমধ্যস্থ রন্ধে) অর বা শলাকা সমূহের ন্যায়(সেই বিচক্ষণে আবার) এই সমস্ত জগৎকে

২৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

অর্পিত—সন্নিবিষ্ট বলিয়া থাকেন।[ ফল কথা,] যদি পঞ্চপাদ ও দ্বাদশাকৃতিই হন, অথবা যদি সপ্তচক্র ও ষড়রই হন, সর্ব-প্রকারেই (১৩) কালরূপী সংবৎসাত্মক প্রজাপতিই যে, চন্দ্র-সূর্য্যরূপেও জগতের কারণ;(ইহা সিদ্ধ হইতেছে) ॥১১

মাসো বৈ প্রজাপতিঃ, তস্য কৃষ্ণপক্ষ এব রয়িঃ; শুক্লঃ প্রাণঃ তস্মাদেতে ঋষয়ঃ শুক্ল ইষ্টং কুর্ব্বন্তি; ইতর ইতরস্মিন্ ॥১২

[সংবৎসরবৎ মাসোহপি রয়ি-প্রাণাত্মক ইত্যাহ]—মাস ইতি।[‘বৈ’ শব্দঃ প্রসিদ্ধৌ] মাসঃ(শুক্ল-কৃষ্ণপক্ষাত্মকঃ) বৈ প্রজাপতিঃ; তস্য(মাসরূপস্য প্রজাপতেঃ) কৃষ্ণপক্ষ এব রয়িঃ(অন্নং চন্দ্রমাঃ, তত্র চন্দ্রমসঃ ক্ষীয়মাণত্বাৎ)। শুক্লঃ(শুক্লপক্ষঃ)[এব] প্রাণঃ(ভোক্তা—আদিত্যঃ)। তস্মাৎ(হেতোঃ) এতে ঋষয়ঃ(প্রাণ-সর্ব্বাত্মকত্বদর্শিনঃ) শুক্লে(শুক্লপক্ষে) ইষ্টং(যাগং) কুর্ব্বন্তি; ইতরে(অপরে—প্রাণসর্ব্বাত্মকত্বদর্শনহীনাঃ) ইতরস্মিন্(কৃষ্ণপক্ষে)[ইষ্টং কুর্ব্বন্তীতি শেষঃ]। প্রাণদর্শিনো হি কৃষ্ণপক্ষে ইষ্টং কুর্ব্বন্তোহপি শুক্লপক্ষে এব কুর্ব্বন্তি, যতস্তে প্রাণব্যতিরিক্তং ন কিঞ্চিৎ পশ্যন্তি; প্রাণদর্শনহীনাস্তু শুক্লপক্ষে কুর্ব্বন্তোহপি প্রাণদর্শনাভাবাৎ কৃষ্ণপক্ষে এব তে কুর্ব্বন্তীত্যভিপ্রায়ঃ।]॥

[ সংবৎসরের ন্যায় এক একটি মাসও যে রয়ি ও প্রাণস্বরূপ; তাহা জ্ঞাপ- নার্থ বলিতেছেন]—প্রসিদ্ধ মাসই প্রজাপতিস্বরূপ, তাহার কৃষ্ণপক্ষই রয়ি—অন্ন-

প্রশ্নোপনিষৎ। ২৫
* প্রোতম্ ইতি বা পাঠঃ। (১৪) তাৎপর্য্য—যাঁহারা সর্ব্বত্র জ্ঞানপ্রকাশময় শুক্ল প্রাণের সম্ভাষ দর্শন করেন, তাঁহাদের

স্বরূপ চন্দ্র, আর শুক্লপক্ষই প্রাণ-ভোক্তা-আদিত্য। সেই কারণে এই ঋষিগণ (যাঁহারা প্রাণকে সর্ব্বময় বলিয়া বুঝিয়াছেন; তাঁহারা) শুক্লপক্ষে যজ্ঞ করেন; আর অপর সকলে অপর পক্ষে(কৃষ্ণপক্ষে) যজ্ঞ করেন ॥ ১২

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

যস্মিন্নিদং শ্রিতং * বিশ্বঃ, স এব প্রজাপতিঃ সংবৎসরাখ্যঃ স্বাবয়বে মাসে কৃৎস্নঃ পরিসমাপ্যতে। মাসো বৈ প্রজাপতির্যথোক্তলক্ষণ এব মিথুনাত্মকঃ। তস্য মাসাত্মনঃ প্রজাপতেরেকো ভাগঃ কৃষ্ণপক্ষ এব রয়িরন্নং চন্দ্রমাঃ, অপরো ভাগঃ শুক্লঃ শুক্লপক্ষঃ প্রাণ আদিত্যোহত্তাগ্নিঃ। যস্মাৎ শুক্লপক্ষাত্মানং প্রাণং সর্ব্বমেব পশ্যন্তি; তস্মাৎ প্রাণদর্শিন এতে ঋষয়ঃ কৃষ্ণপক্ষেহপীষ্টং যাগং কুর্ব্বন্তঃ শুক্লপক্ষ- এব কুর্ব্বন্তি। প্রাণব্যতিরেকেণ ‘কৃষ্ণপক্ষস্তৈর্ন দৃশ্যতে যস্মাৎ; ইতরে তু প্রাণং ন পশ্যন্তীত্যদর্শনলক্ষণং কৃষ্ণাত্মানমের পশ্যন্তি। ইতরে ইতরস্মিন্ কৃষ্ণপক্ষ এব কুর্ব্বন্তি শুক্লে কুর্ব্বন্তোহপি ॥ ১২

ভাষানুবাদ।

যাঁহাতে এই সমস্ত জগৎ আশ্রিত রহিয়াছে; সেই সংবৎসর- সংজ্ঞক প্রজাপতিই সম্পূর্ণভাবে স্বীয় অবয়ব বা অংশভূত মাসে পরি- সমাপ্ত আছেন। পূর্ব্বোক্তলক্ষণ মিথুনাত্মক(রয়ি ও প্রাণাত্মক) প্রজাপতিই মাসস্বরূপ। সেই মাসরূপী প্রজাপতির একটি ভাগ— কৃষ্ণপক্ষটি ‘রয়ি’—অন্নস্বরূপ চন্দ্র, অপরভাগ—শুক্লপক্ষটি প্রাণ আদিত্য—ভোক্তা অগ্নিস্বরূপ। যে হেতু সমস্তকেই শুক্লপক্ষাত্মক প্রাণরূপে দর্শন করেন; সেই হেতু প্রাণদর্শী এই সকল ঋষি কৃষ্ণপক্ষে যজ্ঞ করিলেও[বস্তুতঃ] শুক্ল পক্ষেই করিয়া থাকেন; যে হেতু, প্রাণ ভিন্ন কৃষ্ণ পক্ষ তাঁহারা দেখিতে পান না। কিন্তু অপর সকলে প্রাণকে দেখিতে পায় না; অদর্শনাত্মক কৃষ্ণ পক্ষকেই দর্শন করিয়া থাকে। অপর সকলে শুক্লপক্ষে করিলেও অন্যত্র—কৃষ্ণ পক্ষেই করিয়া থাকে(১৪) ॥১২

২৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

অহোরাত্রো বৈ প্রজাপতিঃ, তস্যাহরেব প্রাণো রাত্রিরেব রয়িঃ। প্রাণং বা এতে প্রস্কন্দন্তি, যে দিবা রত্যা সংযুজ্যন্তে; ব্রহ্মচর্য্যমেব তদ্ যদ্রাত্রৌ রত্যা সংযুজ্যন্তে ॥ ১৩

[মাসরূপোহপি প্রজাপতিরহোরাত্রে পরিসমাপ্যতে, ইত্যাহ]—অহোরাত্র- ইতি। অহোরাত্রঃ(দিবারাত্রাত্মকঃ কালঃ) বৈ(প্রসিদ্ধৌ) প্রজাপতিঃ। তস্য (অহোরাত্রাত্মকস্য প্রজাপতেঃ) অহঃ(দিনং) এব প্রাণঃ—(ভোক্তা অগ্নিরূপঃ), রাত্রিঃ এব রয়িঃ(অন্নং—চন্দ্রঃ)। যে(জনাঃ) দিবা রত্যা(মৈথুনেন) সংযুজ্যন্তে,(সংবধান্তে), এতে(রতিসম্পন্নাঃ) প্রাণং বৈ(এব) প্রস্কন্দন্তি (নিঃসারয়ন্তি; বিনাশয়ন্তীতি যাবৎ)। রাত্রৌ যৎ রত্যা সংযুজ্যন্তে, তৎ ব্রহ্মচর্য্যং (ব্রহ্মচারিধৰ্ম্মঃ সংযমঃ) এব[ভবতীতি শেষঃ]।[তস্মাৎ দিবা গ্রাম্যধর্মো ন সেবনীয়ঃ; রাত্রৌ তু ঋতুকালে সেবনীয়: ইত্যয়ং প্রাসঙ্গিকো বিধিঃ।]॥

সেই প্রসিদ্ধ প্রজাপতি আবার অহোরাত্রস্বরূপ; দিনই তাঁহার প্রাণ বা ভোক্তা (আদিত্য ও অগ্নিস্বরূপ), এবং রাত্রিই তাঁহার রয়ি অর্থাৎ অন্নস্থানীয় চন্দ্রমাস্বরূপ। [অতএব] যাহারা দিনে রতিসংযুক্ত হয়, তাহারা প্রাণকে বহিষ্কৃত করে; আর যে, রাত্রিতে(ঋতুকালে) রতিসংবদ্ধ হওয়া, তাহা ব্রহ্মচর্য্যই বটে, অর্থাৎ তাহা দ্বারাই প্রাণ সংযমরূপ ব্রহ্মচর্য্যই রক্ষিত হইয়া থাকে ॥ ১৩

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

সোহপি মাসাত্মা প্রজাপতিঃ স্বাবয়বেহহোরাত্রে পরিসমাপ্যতে। অহোরাত্রো- বৈ প্রজাপতিঃ পূর্ব্ববৎ। তস্যাপ্যহরের প্রাণঃ অত্তা অগ্নিঃ রাত্রিরেব রয়িঃ পূর্ব্ববৎ। প্রাণম্ অহরাত্মানং বৈ এতে প্রস্কন্দন্তি নির্গময়ন্তি শোষয়ন্তি বা স্বাত্মনো বিচ্ছিন্য অপনয়ন্তি। কে? যে দিবা অহনি রত্যা রতিকারণভূতয়া সহ স্ত্রিয়া সংযুজ্যন্তে মিথুনং মৈথুনমাচরন্তি মুঢ়াঃ। যত এবং, তস্মাৎ তন্ন কর্তব্যমিতি প্রতিষেধঃ প্রাসঙ্গিকঃ। যৎ রাত্রৌ সংযুজ্যন্তে রত্যা ঋতৌ, ব্রহ্মচর্য্যমেব তদিতি প্রশস্তত্বাৎ ঋতৌ ভার্য্যাগমনং কর্তব্যমিতি। অয়মপি

প্রশ্নোপনিষৎ। ২৭

প্রাসঙ্গিকো বিধিঃ। প্রকৃতং তুচ্যতে—সোহহোরাত্রাত্মকঃ প্রজাপতির্ব্রীহি- যবাদ্যন্নাত্মনা ব্যবস্থিতঃ॥ ১৩

ভাষ্যানুবাদ।

পূর্বের ন্যায় সেই মাসাত্মক প্রজাপতিও আবার স্বীয় অবয়ব-ভূত (মাসের অংশভূত) অহোরাত্রে(দিবা ও রাত্রিতে) সমাপ্ত হইয়া থাকেন। পূর্বের ন্যায় তাঁহারও দিবাই প্রাণ-ভোক্তা অগ্নিস্বরূপ, এবং রাত্রিই রয়ি(অন্ন – চন্দ্রমাঃ)। ইঁহারা সেই অহঃস্বরূপ প্রাণকেই প্রস্ক ন্দিত করে-নির্গত করায় অথবা বিশেষরূপে শোষিত করে, অর্থাৎ শরীর হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দূরীকৃত করে। কাহারা?-যে সমস্ত মূঢ় দিনে রতিসহ অর্থাৎ রতির কারণীভূত স্ত্রীর সহিত সংবদ্ধ হয়-মিথুনী- ভাব বা মৈথুন আবরণ করে। যে হেতু এইরূপ[হয়], সেই হেতু তাহা করা উচিত নহে; এই প্রতিষেধ বা নিষেধটি(এখানে) প্রাসঙ্গিক(অর্থাৎ এই প্রতিষেধের উদ্দেশে এই শ্রুতির অবতারণা হয় নাই)। আর ঋতুকালে যে রতির সহিত সম্বদ্ধ হয়, তাহা ব্রহ্মচর্য্যেরই স্বরূপ; অতএব প্রশস্ততা নিবন্ধন[রাত্রিতেই] ঋতুকালে ভার্য্যাভি- গমন করা উচিত। এই বিধিটিও প্রাসঙ্গিক বা প্রসঙ্গাগত(১৫); প্রকৃত বিষয় বলা হইতেছে যে, সেই অহোরাত্রাত্মক প্রজাপতিই ব্রীহি-যবাদি অন্নরূপে অবস্থান করেন ॥১৩

অন্নং বৈ প্রজাপতিস্ততো হ বৈ তদ্রোতঃ, তস্মাদিম্মাঃ প্রজাঃ প্রজায়ন্ত ইতি ॥ ১৪

[ অধুনা প্রথমপ্রশ্নস্যোত্তরং বক্ত মুপক্রমতে অন্নমিত্যাদিনা]—অন্নং(ব্রীহি- যবাদিরূপঃ) বৈ(প্রসিদ্ধৌ) প্রজাপতিঃ, ততঃ(তস্মাৎ ভুক্তাৎ অন্নাৎ) হ(অবধারণে) বৈ(প্রসিদ্ধৌ) তৎ রেতঃ(শুক্রং)[নিষ্পদ্যতে ইতি শেষঃ]।

২৮ প্রশ্নোপনিষৎ।

তস্মাৎ(রেতসঃ) ইমাঃ(জাগতিকাঃ) প্রজাঃ(জায়মানাঃ জন্তবঃ) প্রজায়ন্তে ইতি(উত্তরম্) ॥

[ এখন প্রকৃত প্রশ্নের উত্তর প্রদত্ত হইতেছে]—[ ব্রীহি যবাদিরূপ] অন্নই সেই প্রজাপতি; তাহা হইতেই(অন্ন হইতেই) সেই রেতঃ(শুক্র)[ উৎপন্ন হয় এবং] তাহা হইতে এই সকল প্রজা(প্রাণী) উৎপন্ন হইয়া থাকে ॥ ১৪

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

এবং ক্রমেণাহোরাত্রঃ প্রজাপতিরন্নে বিপরিণম্যতে; অন্নং বৈ প্রজাপতিঃ। * কথম্? ততস্তস্মাদ হ বৈ রেতো নৃবীজং তৎ প্রজাকারণং, তস্মাৎ যোষিতি সিক্তাৎ ইমা মনুষ্যাদিলক্ষণাঃ প্রজাঃ প্রজায়ন্তে;-যৎপৃষ্টং ‘কুতো হ বৈ প্রজাঃ প্রজায়ন্তে’ ইতি। তদেবং চন্দ্রাদিত্যমিথুনাদিক্রমেণ অহোরাত্রান্তেন অম্নরেতো- দ্বারেণ ইমাঃ প্রজাঃ প্রজায়ন্ত-ইতি নির্ণীতম্ ॥ ১৪

ভাষ্যানুবাদ।

এইরূপ ক্রমানুসারে অহোরাত্রাত্মক প্রজাপতি অন্নেতে পরিণত হন; অন্নই সেই প্রজাপতি। কিরূপে? তাহা হইতেই সেই প্রজার কারণ(প্রজোৎপত্তির কারণ) নর-বীজ রেতঃ(শুক্র)[ উৎপন্ন হয়]। যোষিতে(নারীতে) নিষিক্ত সেই রেতঃ হইতে এই মনুষ্য প্রভৃতি প্রজাগণ জন্মলাভ করিয়া থাকে। ‘কোথা হইতে এই সকল প্রজা জন্ম লাভ করে?’ বলিয়া যাহা জিজ্ঞাসিত হইয়াছিল; পূর্বোক্ত- প্রকার চন্দ্র ও আদিত্যরূপ মিথুনাদি হইতে অহোরাত্র পর্য্যন্ত ক্রমানু- সারে রেতঃ দ্বারা এই সমস্ত প্রজা জন্ম লাভ করে; এই কথায় তাহাই নির্ণীত হইল ॥১৪

তদযে হ বৈ তৎ প্রজাপতিব্রতং চরন্তি, তে মিথুনমুৎপাদ- য়ন্তে। তেষামেবৈষ ব্রহ্মলোকো যেষাং তপো ব্রহ্মচর্য্যং যেষু সত্যং প্রতিষ্ঠিতম্ ॥১৫

[ইদানীং প্রজাপতিব্রতফলমাহ]-তদ্য ইতি। তৎ(তস্মাৎ) যে(গৃহস্থাঃ) অবিদ্বাংসঃ) হ(এব) বৈ তৎ(প্রসিদ্ধং) প্রজাপতি-ব্রতং(তদাখ্যং ব্রতং) চরন্তি

প্রশ্নোপনিষৎ। ২৯

(অনুতিষ্ঠন্তি); তে মিথুনং(পুত্রং কন্যাং চ) উৎপাদয়ন্তে(জনয়ন্তি)। যেষাং তপঃ(চান্দ্রায়ণব্রতাদি) ব্রহ্মচর্য্যং, যেষু। চ] সত্যং(অসত্যাভাবঃ) প্রতিষ্ঠিতং (স্থিরতরং বর্ত্ততে), তেষাম্ এব এষঃ(পূর্ব্বোক্তঃ) ব্রহ্মলোকঃ(ব্রহ্মণ: প্রজা- পতেরংশভূতঃ চন্দ্রলোক ইত্যর্থঃ)[ভবতীতি শেষঃ] ॥

অতএব যাঁহারা সেই প্রজাপতিব্রত আচরণ বা প্রতিপালন করেন, তাঁহারা মিথুন(পুত্র ও কন্যা) উৎপাদন করেন। যাঁহাদের তপস্যা ও ব্রহ্মচর্য্য স্থিরতর আছে, এবং যাঁহাদের সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত আছে; উক্ত ব্রহ্মলোক(চন্দ্রলোক) তাঁহাদেরই লভ্য হইয়া থাকে ॥১৫

শাঙ্কর. ভাষ্যম্।

তৎ তত্রৈবং সতি যে গৃহস্থাঃ ‘হ বৈ’ ইতি প্রসিদ্ধ-স্মরণার্থৌ নিপাতো। তৎ প্রজাপতেরতম্—ঋতৌ ভার্য্যাগমনং চরন্তি কুর্ব্বন্তি; তেষাং দৃষ্টং ফলমিদম্। কিম্? তে মিথুনং পুত্রং দুহিতরঞ্চোৎপাদয়ন্তে। অদৃষ্টঞ্চ ফলম্--ইষ্টাপূর্ত্তদত্ত- কারিণাং তেষামেব এষঃ যশ্চান্দ্রমসো ব্রহ্মলোকঃ পিতৃযাণলক্ষণঃ, যেষাং তপঃ স্নাতকব্রতাদি, ব্রহ্মচর্য্যম্। ঋতোরন্যত্র মৈথুনাসমাচরণং—ব্রহ্মচর্য্যম্। যেষু চ সত্যমনুতবর্জনং প্রতিষ্ঠিতম্ অব্যভিচারিতয়া বর্ত্ততে নিত্যমেব ॥ ১৫

ভাষ্যানুবাদ।

এইরূপ ব্যবস্থা হওয়ায়, যে সকল গৃহস্থ সেই প্রজাপতি-ব্রত— ঋতুকালে ভার্য্যাভিগমন আচরণ করিয়া থাকেন; ইহা তাঁহাদের দৃষ্ট ফল(ঐহিক ফল)। ইহা কি? তাঁহারা মিথুন অর্থাৎ পুত্র ও কন্যাসন্তান উৎপাদন করিয়া থাকেন।(১৬) আর অদৃষ্ট ফলও(পার-

৩০ প্রশ্নোপনিষৎ।

লৌকিক ফল এই যে, পিতৃযাণগম্য চান্দ্রমস ব্রহ্মলোক, ইহা ইষ্ট পূর্ত্ত ও দত্তানুষ্ঠানকারী তাঁহাদেরই হইয়া থাকে, যাঁহাদের তপস্যা—স্নাতক- ব্রত প্রভৃতি[ও] ব্রহ্মচর্য্য—ঋতু ভিন্ন সময়ে মৈথুন বর্জ্জনরূপ ব্রহ্মচর্য্য এবং যাঁহাদের সত্য—অসত্যবর্জ্জন প্রতিষ্ঠিত, অর্থাৎ সর্বদা অব্যভি- চারিরূপে বর্তমান রহিয়াছে ॥১৫

তেষামসৌ বিরজো ব্রহ্মলোকো ন যেযু জিহ্মমনৃতং ন মায়া চেতি ॥১৬

ইত্যর্থবেদীয়-প্রশ্নোপনিষদ প্রথমঃ প্রশ্নঃ ॥১॥

[ অথ ব্রহ্মলোক-প্রাপ্তিনিদানমাহ]—তেষামিতি। যেষু(জনেষু) জিহ্মং (কৌটিল্যং), অনৃতং(অসত্যসমাচারঃ)[ চ] ন, মায়া(ছলং) চ ন[বিদ্যতে], তেষাং(জনানাং) অসৌ বিরজঃ(বিশুদ্ধঃ) ব্রহ্মলোকঃ[লভ্যো ভবতি]॥

[ এখন ব্রহ্মলোক-লাভের উপযোগী গুণ বলা হইতেছে]—যাঁহাদের কপটতা মিথ্যা ব্যবহার ও ছল নাই, তাঁহাদের পক্ষে এই বিশুদ্ধ ব্রহ্মলোক[ লাভযোগ্য হইয়া থাকে ॥ ১৬

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

যস্ত পুনরাদিত্যোপলক্ষিত উত্তরায়ণ: প্রাণাত্মভাবঃ বিরজঃ শুদ্ধো ন চন্দ্র-ব্রহ্ম- লোকবদ্ রজস্বলো বৃদ্ধিক্ষয়াদিযুক্তঃ, অসৌ কেষাং? তেষামিত্যুচ্যতে,-যথা গৃহস্থা- নামনেকবিরুদ্ধ-সংব্যবহার প্রয়োজনবত্ত্বাৎ জিহ্মং কৌটিল্যং বক্রভাবোহবশ্যম্ভাবি, তথা ন যেষু জিহ্মম্। যথা চ গৃহস্থানাং ক্রীড়াদিনিমিত্তমনৃতমবর্জনীয়ং, তথা ন যেষু তৎ, তথা মায়া গৃহস্থানামিব ন যেষু বিদ্যতে। মায়া নাম বহিরন্যথা আত্মানং প্রকাশ্যান্যথৈব কার্য্যং করোতি, সা মায়া মিথ্যাচাররূপা। মায়েত্যেবমাদয়ো দোষা যেঘধিকারিষু ব্রহ্মচারি-বান প্রস্থ-ভিক্ষুষু নিমিত্তাভাবান্ন বিদ্যন্তে; তৎসাধনানু- রূপেণৈব তেষামসৌ বিরজো ব্রহ্মলোকঃ, ইত্যেষা জ্ঞানযুক্তকর্মবতাং গতিঃ। পূর্ব্বোক্তস্ত ব্রহ্মলোকঃ কেবলকম্মিনাং চন্দ্রলক্ষণ ইতি ॥ ১৬

ইতি শ্রীমচ্ছঙ্কর-ভগবতঃ কৃতৌ প্রশ্নোপনিষদ্ভাষ্যে প্রথমঃ প্রশ্নঃ ॥ ১

প্রশ্নোপনিষৎ। ৩১

ভাষ্যানুবাদ।

আদিত্য দ্বারা পরিলক্ষিত যে, প্রাণাত্মরূপী উত্তরায়ণ, ইহা বিরজঃ —বিশুদ্ধ অর্থাৎ চন্দ্র-ব্রহ্মলোকের ন্যায় রজোযুক্ত(মলিন) বা হ্রাস-বৃদ্ধি যুক্ত নহে। ইহা যাহাদের[লভ্য], তাহাদের কথা কথিত হইতেছে,—গৃহস্থগণের অনেকপ্রকার বিরুদ্ধ ব্যবহার থাকায় যেরূপ জিহ্ম অর্থাৎ কুটিলতা বা বক্রভাব অবশ্যম্ভাবী হইয়া থাকে, যাঁহাদের সেরূপ বক্রতা নাই, এবং গৃহস্থগণের যেরূপ ক্রীড়া- কৌতুকাদির জন্য অনৃত অর্থাৎ অসত্য ব্যবহার অপরিহার্য্য হইয়া থাকে, সেরূপ যাঁহাদের তাহা(মিথ্যা ব্যবহার) নাই; সেইরূপ গৃহস্থগণের ন্যায় যাঁহাদের মায়া নাই। মায়া সাধারণতঃ বাহিরে আপনাকে অন্যরূপে প্রকাশ করিয়া কার্য্যতঃ অন্যপ্রকার করিয়া থাকে, সেই মিথ্যা ব্যবহারই মায়া শব্দের অর্থ। অধিকারপ্রাপ্ত যে সকল ব্রহ্মচারী বানপ্রস্থ ও ভিক্ষুতে(সন্ন্যাসীতে) প্রয়োজনাভাববশতই মায়া প্রভৃতি দোষসমূহ বিদ্যমান নাই, এই বিরজঃ ব্রহ্মলোক জ্ঞানসহকৃত কর্মানুষ্ঠানকারী তাদৃশ ব্যক্তির সেই সাধনেরই অনুরূপ গতি বা প্রাপ্য স্থান; আর পূর্ব্বোক্ত চন্দ্ররূপ ব্রহ্মলোক, কেবল কর্মীদিগেরই গন্তব্য স্থান ॥১৬

ইতি প্রশ্নোপনিষদে প্রথম প্রশ্নের ভাষ্যানুবাদ।

প্রশ্নোপনিষৎ।

— — ௨௧௬௪ — —

দ্বিতীয়ঃ প্রশ্নঃ।

অথ হৈনং ভার্গবো বৈদভিঃ পপ্রচ্ছ—ভগবন্! কত্যেব দেবা প্রজাং বিধারয়ন্তে? কতর এতৎ প্রকাশয়ন্তে? কঃ পুনরেষাং বরিষ্ঠঃ? ইতি ॥ ১৭ ॥ ১ ॥

[পূর্ব্বোক্তপ্রজাপতেরেব অস্মিন্ শরীরেহপি ভোক্তৃত্বাদিকম্ অবধারয়িতং দ্বিতীয়ঃ প্রশ্ন আরভ্যতে]-অথেতি। অথ(কাত্যায়ন প্রশ্নানন্তরম্) বৈদভিঃ ভার্গবঃ হ(ঐতিহ্যে) এনং(পিপ্পলাদং) পপ্রচ্ছ,-ভগবন্! কতি(কিয়ৎ- সংখ্যকাঃ) এব দেবাঃ প্রজাং(স্থাবর-জঙ্গমরূপাং) বিধারয়ন্তে(বিশেষেণ ধারয়ন্তি)?[এষু দেবেষু মধ্যে] কতরে(কে দেবাঃ) এতৎ(শরীরং) প্রকাশয়ন্তে (আবিভাবয়ন্তি)। যদ্বা এতৎ প্রকাশয়ন্তে(অবকাশদানাদিরূপং স্বমাহাত্ম্যং প্রকটয়ন্তি)। এষাং(দেবানাং মধ্যে) কঃ পুনঃ(কো বা) বরিষ্ঠঃ? ইতিশব্দঃ (প্রশ্নসমাপ্তৌ)।

[এই শরীরেও প্রথম প্রশ্নোক্ত প্রজাপতিরই ভোক্ত ত্বাবধারণার্থ দ্বিতীয় প্রশ্ন আরব্ধ হইতেছে]।—কাত্যায়নের প্রশ্নের পর বিদর্ভদেশীয় ভার্গব ইঁহাকে (পিপ্পলাদকে) জিজ্ঞাসা করিলেন—ভগবন্! কতগুলি দেবতা প্রজাকে(স্থাবর জঙ্গম শরীরকে) বিশেষরূপে ধারণ বা রক্ষা করিয়া থাকেন? ইঁহাদের মধ্যে কাহারাই বা এই শরীরকে প্রকাশিত(প্রকটিত) করেন?[এবং] ইঁহাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠই বা কে? ॥ ১৭ ॥ ১ ॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

প্রাণোহত্তা প্রজাপতিরিত্যুক্তম্, তস্য প্রজাপতিত্বমত্তৃত্বঞ্চ অস্মিন্ শরীরে- হবধায়রিতব্যম্, ইত্যয়ং প্রশ্ন আরভ্যতে। অথ অনন্তরং হ কিল এনং ভার্গবো বৈদর্ভিঃ পপ্রচ্ছ--হে ভগবন্! কত্যেব দেবাঃ প্রজাং শরীরলক্ষণাং বিধারয়ন্তে— —বিশেষেণ ধারয়ন্তে। কতরে বুদ্ধীন্দ্রিয়-কর্মেন্দ্রিয়বিভক্তানামেতং প্রকাশনং

প্রশ্নোপনিষৎ। ৩৩

স্বমাহাত্ম্যপ্রখ্যাপনং প্রকাশয়ন্তে। কোহসৌ পুনরেষাং বরিষ্ঠঃ প্রধানঃ কায্য- করণলক্ষণানামিতি ॥ ১৭ ॥ ১ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

প্রাণই যে, ভোক্তৃস্বরূপে প্রজাপতি, ইহা(প্রথম-প্রশ্নোত্তরে) উক্ত হইয়াছে। এই শরীরেও তাহার প্রজাপতিত্ব ও ভোক্তাত্ব অবধারণ করিতে হইবে, এই নিমিত্ত এই(দ্বিতীয়) প্রশ্ন আরব্ধ হইতেছে— ‘অথ’ অর্থ—অনন্তর, ‘হ’ শব্দ পুরাবৃত্তসূচক; অনন্তর বিদর্ভদেশীয় ভার্গব ইঁহাকে(পিপ্পলাদকে) জিজ্ঞাসা করিলেন—কতগুলি দেবতাই শরীররূপ প্রজাকে রিধৃত করেন?—বিশেষরূপে ধারণ করেন? জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্ম্মেন্দ্রিয়ভেদে বিভক্ত[দেবগণের মধ্যে] কাহারা এই প্রকাশন অর্থাৎ স্বীয় মহিমা প্রকটিত করিয়া প্রকাশ পাইয়া থাকেন? এবং কার্য্য-করণলক্ষণ অর্থাৎ দেহেন্দ্রিয়াদিময় দেবগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠই বা কে?(১) ॥ ১৭ ॥ ১ ॥

তস্মৈ স হোবাচ। আকাশো হ বা এষ দেবো বায়ুরগ্নিরাপঃ পৃথিবী বাঙ্মনশ্চক্ষুঃ শ্রোত্রঞ্চ। তে প্রকাশ্যাভিবদন্তি— বয়মেতদ্বাণমবষ্টভ্য বিধারয়ামঃ ॥ ১৮॥ ২॥

[ইদানীং ভার্গবপ্রশ্নস্য উত্তরং দাতুং আখ্যায়িকারূপেণ প্রাণসংবাদমবতারয়তি তস্মৈ ইত্যাদিনা]।—সঃ(পিপ্পলাদঃ) হ(ঐতিহ্যসূচকং) তস্মৈ(ভার্গবায়) উবাচ, —কিম্? ইত্যাহ—এষঃ(লোকপ্রতীতিগ্রাহ্য:) দেবঃ(দ্যোতমানঃ) হ(কিল), বৈ(প্রসিদ্ধৌ), আকাশঃ(ভূতাকাশঃ), বায়ুঃ, অগ্নিঃ, আপঃ (জলানি), পৃথিবী, বাক্(‘বাক্’ ইতি কম্মেন্দ্রিয়োপলক্ষণং কর্ম্মেন্দ্রিয়াণি, ইত্যর্থঃ),

(১) তাৎপর্য্য—প্রথম প্রশ্নোত্তরে কর্ম্মফলে লোকান্তর গতি এবং ভোগান্তে পুনরাবৃত্তি শ্রবণে তদবিষয়ে শ্রোতার বৈরাগ্য উপস্থিত হইতে পারে সত্য; কিন্তু চিত্তের একাগ্রতা না হইলে আত্ম- জ্ঞানে অধিকার উপস্থিত হয় না; উপাসনাহ একাগ্রতা-সম্পাদনের প্রধান সহায়; এই কারণে এই দ্বিতীয় প্রশ্নে প্রাণোপাসনার প্রণালী বর্ণন করা আবশ্যক হইয়াছে। এখানে ‘প্রজা’ শব্দে স্থাবর-জঙ্গমাত্মক শরীর বুঝিতে হইবে, কিন্তু আত্মা নহে; কারণ, আত্মাই প্রাণের ধারক, কিন্তু প্রাণ কখনই আত্মার ধারক হয় না। এখানে ‘দেব’ শব্দেও ইন্দ্রিয় সমূহ বুঝিতে হইবে। ইন্দ্রিয় সমূহেরও অধিষ্ঠাতা পৃথক্ পৃথক্ দেবতা আছেন।

৩৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

মনঃ(অন্তঃকরণং), চক্ষুঃ, শ্রোত্রং, চকারাৎ অপরাণ্যপি জ্ঞানেন্দ্রিয়াণি)। তে (উক্তা আকাশাদয়ঃ দেবাঃ) প্রকাশ্য(ইদং শরীরং নিৰ্দ্দিশ্য, স্বমাহাত্ম্যং বা উদ্যোষ্য) অভিবদন্তি(অন্যোন্যং স্পর্দ্ধাং কুর্ব্বন্তঃ বদন্তি);[যৎ] বয়ং [এব] এতৎ বাণং(বাতি—কর্ম্মক্ষয়ে অপগচ্ছতীতি বাণং শরীরং) অবষ্টভ্য (দৃঢ়তাং সম্পাদ্য; বিধারয়ামঃ(অবকাশদানাদিনা স্পষ্টং ধারয়ামঃ[ইতি]॥

তিনি(পিপ্পলাদ) তাঁহার উদ্দেশে বলিলেন—এই প্রসিদ্ধ দেবতা আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবী, বাক্(কর্ম্মেন্দ্রিয় সমূহ), মনঃ(অন্তঃকরণ), চক্ষুঃ, শ্রোত্র(সমস্ত জ্ঞানেন্দ্রিয়)। তাঁহারা প্রকাশ করিয়া অভিমানপূর্ব্বক বলিতে লাগিলেন যে, আমরাই এই বাণকে(শরীরকে) অবষ্টব্ধ করিয়া(দৃঢ়তর করিয়া) বিশেষরূপে ধারণ করিতেছি ॥ ১৮ ॥ ২ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

এবং পৃষ্টবতে তস্মৈ স হোবাচ। —আকাশো হ বৈ এষ দেবঃ বায়ুঃ অগ্নিঃ আপঃ পৃথিবী ইত্যেতানি পঞ্চ মহাভূতানি শরীরারম্ভকাণি, বাঙ্মনশ্চক্ষুঃশ্রোত্র- মিত্যাদীনি কর্ম্মেন্দ্রিয়-বুদ্ধীন্দ্রিয়াণি চ।(২) কার্য্যলক্ষণাঃ করণলক্ষণাশ্চ তে দেবা আত্মনো মাহাত্ম্যং প্রকাশ্যং প্রকাশ্যাভিবদন্তি স্পর্দ্ধমানা অহং শ্রেষ্ঠতায়ৈ। কথং বদন্তি? বয়মেতদ্বাণং শরীরং কার্য্যকরণসঙ্ঘাতমবষ্টভ্য প্রাসাদমিব স্তম্ভাদয়ঃ অবিশিথিলীকৃত্য বিধারয়ামঃ বিশ্পষ্টং ধারয়ামঃ। ময়ৈবৈকেনায়ং সঙ্ঘাতো প্রিয়ত ইত্যেকৈকস্যাভিপ্রায়ঃ ॥১৮৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

তিনি(পিপ্পলাদ) এইরূপে প্রশ্নকারী সেই ভার্গবের উদ্দেশে বলিলেন,—এই প্রসিদ্ধ দেবতা আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবী ও শরীরের আরম্ভক(উপাদানকারণ) এই পঞ্চমহাভূত, বাক্, মনঃ, চক্ষুঃ, শ্রোত্র ইত্যাদি কর্ম্মেন্দ্রিয় ও বুদ্ধীন্দ্রিয়সমূহ, তাহারা কার্য্যস্বরূপ এবং করণস্বরূপ, অর্থাৎ আকাশাদি পঞ্চভূত কার্য্যস্বরূপ, আর ভোগসাধন ইন্দ্রিয়গণ করণস্বরূপ। সেই দেবগণ স্বীয় মাহাত্ম্য

প্রশ্নোপনিষৎ। ৩৫

প্রকাশ করিয়া নিজ নিজ শ্রেষ্ঠতা-খ্যাপনের জন্য[পরস্পর] স্পর্দ্ধা করতঃ বলিতে লাগিল। কি প্রকারে বলিল? স্তম্ভ প্রভৃতি যেরূপ প্রাসাদকে ধরিয়া রাখে, সেইরূপ আমরা এই বাণকে—কার্য্য-করণ- সমষ্টিকে(দেহকে) অবষ্টব্ধ করিয়া অর্থাৎ অশিথিল করিয়া(দৃঢ়তা সম্পাদন করিয়া) বিধৃত করি—বিস্পষ্টরূপে ধারণ করিয়া রাখি। প্রত্যেকেরই অভিপ্রায় এই যে, এক আমা দ্বারাই এই সংঘাত (দেহেন্দ্রিয়াদিসমষ্টি) বিধৃত হইয়া আছে ॥ ১৮ ॥ ২॥

তান্ বরিষ্ঠঃ প্রাণ উবাচ—মা মোহমাপদ্যথ; অহ- মেবৈতৎ পঞ্চধাত্মানং প্রবিভজ্যৈতদ্বাণমবষ্টভ্য বিধারয়া- মীতি, তেহশ্রদ্দধানা বভূবুঃ ॥ ১৯ ॥ ৩॥

[ ইদানীং প্রাণান্(ইন্দ্রিয়াণি) প্রতি মুখ্যপ্রাণোক্তিমাহ-তানিত্যাদিনা]।— বরিষ্ঠঃ(শ্রেষ্ঠঃ, মুখ্যঃ) প্রাণঃ তান্(পূর্ব্বোক্তাভিমানবতঃ প্রাণান্) উবাচ— [যূয়ং] মোহং(বয়মেব এতৎ শরীরং বিধারয়ামঃ ইত্যেবমভিমানং) মা(ন) আপদ্যথ(কুরুত);[যস্মাৎ] অহমেব এতৎ(ধারণং যথা স্যাৎ, তথা) আত্মানং পঞ্চধা(প্রাণাপানাদিপঞ্চপ্রকারৈঃ) প্রবিভজ্য(বিভক্তং কৃত্বা) এতৎ বাণং(শরীরং) অবষ্টভ্য বিধারয়ামি(বিশেষেণ ধারয়ামি), ইতি(বাক্যসমাপ্তৌ) তে(ইতরে প্রাণাঃ) অশ্রদ্দধানাঃ(তদ্বচসি বিশ্বাসং স্থাপয়িতুমসমর্থাঃ) বভূবুঃ।

[ প্রাণাপানাদিপঞ্চবৃত্তিবিশিষ্ট] শ্রেষ্ঠ প্রাণ তাহাদিগকে(পূর্ব্বোক্ত অভিমান- কারী প্রাণদিগকে) বলিলেন—তোমরা মোহপ্রাপ্ত হইও না, অর্থাৎ ঐরূপ অভিমান করিও না;[যেহেতু] আমিই আপনাকে এইরূপে পঞ্চ প্রকারে বিভক্ত করিয়া এই শরীর অবষ্টব্ধ করিয়া বিশেষরূপে ধারণ করিয়া থাকি। তাহারা [কিন্তু এ কথায়] শ্রদ্ধাবান্ হইল না;(অর্থাৎ সে কথা বিশ্বাস করিতে পারিল না) ॥ ১৯ ॥ ৩ ॥

শঙ্করভাষ্যম্।

তান্ এবমভিমানবতঃ বরিষ্ঠঃ প্রাণো মুখ্য উবাচ উক্তবান্,—মা মৈবং মোহ- মাপদ্যথ—অবিবেকতয়া অভিমানং মা কুরুত; যস্মাৎ অহমেব এতদ্ বাণম্

৩৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

অবষ্টভ্য বিধারয়ামি পঞ্চধা আত্মানং প্রবিভজ্য প্রাণাদিবৃত্তিভেদং স্বস্য কৃত্বা বিধারয়ামি, ইতি উক্তবতি চ তস্মিন্ তে অশ্রদ্দধানা অপ্রত্যয়বস্তো বভূবুঃ— কথমেতদেবমিতি ॥ ১৯ ॥ ৩ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

এইরূপে অভিমানশালী তাহাদিগকে(ইন্দ্রিয়সমূহকে) বরিষ্ঠ— মুখ্য প্রাণ বলিলেন—না—এই প্রকার মোহ প্রাপ্ত হইও না, অর্থাৎ অবিবেকনিবন্ধন অভিমান করিও না; যেহেতু আমিই আপনাকে পঞ্চপ্রকারে বিভক্ত করিয়া এই শরীর অবষ্টব্ধ(সুদৃঢ়) করিয়া বিধৃত করিয়া থাকি, অর্থাৎ আমি নিজেই প্রাণাদিভেদে পঞ্চপ্রকার অবস্থা অবলম্বন করিয়া ধারণ করিয়া থাকি(২) প্রাণ ইহা বলিলে পর তাহারা অশ্রদ্ধালু হইয়াছিল, অর্থাৎ কেন যে ইহা এরূপ, তাহা বিশ্বাস করিতে পারে নাই ॥ ১৯ ॥ ৩ ॥

সোহভিমানাদূদ্ধমুৎক্রামত ইব, তস্মিন্নুৎক্রামত্যথেতরে সর্ব্ব এবোৎক্রামন্তে; তস্মিংশ প্রতিষ্ঠমানে সর্ব্বএব প্রাতিষ্ঠন্তে। তদ্যথা মক্ষিকা মধুকররাজানমুৎক্রামন্তং সর্ব্বা এবোৎক্রামন্তে, তস্মিশ্চ প্রতিষ্ঠমানে সর্ব্বা এব প্রাতিষ্ঠন্তে, এবং বাঙ্মনশ্চক্ষুঃ শ্রোত্রঞ্চ। তে প্রীতাঃ প্রাণং স্তন্বন্তি ॥ ২০॥ ৪॥

সঃ(প্রাণঃ) অভিমানাৎ(তেষামশ্রদ্ধাদর্শনজাতাৎ) ঊর্দ্ধং উৎক্রামতে ইব(দেহাদবহির্গস্তমিব প্রবর্ত্তঃ), | বস্তুতস্তু ন উৎক্রান্তবান্]; তস্মিন্(প্রাণে)

প্রশ্নোপনিষৎ। ৩৭

উৎক্রামতি সতি, অথ(অনন্তরং) ইতরে(অপরে) সর্ব্বে এব প্রাণাঃ(চক্ষুঃ- প্রভৃতয়ঃ) উৎক্রামন্তে(বহির্ভবিতুং প্রবৃত্তাঃ); তস্মিন্(মুখ্য প্রাণে) চ[পুনঃ] প্রতিষ্ঠমানে(সুস্থিতে সতি) সর্ব্বে এব(চক্ষুঃপ্রভৃতয়ঃ) প্রাতিষ্ঠন্তে(সুস্থিতা বভূবুঃ)। তৎ(তত্র) যথা(দৃষ্টান্তঃ)—মধুকররাজানং(মক্ষিকারাজং) উৎক্রামন্তং(উদ্‌গচ্ছন্তং)[অনুসৃত্য] সর্ব্বা এব মক্ষিকা উৎক্রামন্তে, তস্মিন্ (মধুকররাজে) প্রতিষ্ঠমানে(অবস্থিতে সতি) সর্ব্বা এব(মক্ষিকাঃ) প্রাতিষ্ঠন্তে (অবস্থিতা ভবন্তি। বাক্, মমঃ, চক্ষুঃ, শ্রোত্রং চ(বাগাদয়ঃ প্রাণা অপি) এবং(মক্ষিকাবদেব প্রাণানুসারিণঃ)। তে(বাগাদয়ঃ)[প্রাণমাহাত্ম্যদর্শনেন] প্রীতাঃ[সন্তঃ] প্রাণং স্তন্বন্তি(শ্রেষ্ঠতয়া স্তবন্তি)।

সেই প্রাণ যেন অভিমানে উর্দ্ধে উৎক্রান্ত ইহাতেই(দেহ হইতে বহির্গত হইতেই যেন) প্রবৃত্ত হইল; সে উৎক্রমণে প্রবৃত্ত হইলে পর, অপর সকলের উৎক্রমণে প্রবৃত্ত হইল; পুনর্ব্বার সেই প্রাণ স্থির হইলে পর, সকলেই সুস্থির হইল। এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই—যেমন মধুকর-রাজকে(মৌমাছির রাজাকে) উংক্রান্ত হইতে দেখিলে, সমস্ত মধুমক্ষিকাই উৎক্রান্ত হইয়া থাকে, এবং সে সুস্থির হইলে, অপর সকলেও সুস্থির হইয়া থাকে, বাক্, মনঃ, চক্ষু, শ্রোত্রও ঠিক এইরূপ। তাহারা প্রাণমাহাত্ম্যদর্শনে প্রীত হইয়া প্রাণকে স্তব করিয়া থাকে ॥ ২০॥ ৪ ॥

শঙ্করভাষ্যম্।

স চ প্রাণঃ তেষামশ্রদ্দধানতামালক্ষ্য অভিমানাৎ ঊর্দ্ধ মুৎক্রামত ইব উৎক্রামতীব ইদমুৎক্রান্তবানিব স রোষান্নিরপেক্ষ:, তস্মিন্নুৎক্রামতি যদ্বৃত্তং, তৎ দৃষ্টান্তেন প্রত্যক্ষীকরোতি,-তস্মিন্নুৎক্রামতি সতি অথ অনন্তরমেব ইতরে সর্ব্ব এব প্রাণাশ্চক্ষুরাদয় উৎক্রামন্তে উৎক্রামন্তি উচ্চক্রমুঃ; তস্মিংশ প্রাণে প্রাতিষ্ঠ- মানে তৃষ্ণীং ভবতি অনুৎক্রামতি সতি সর্ব্ব এব প্রাতিষ্ঠন্তে তৃষ্ণীং ব্যবস্থিতা বভূবুঃ। তৎ তত্র যথা লোকে মক্ষিকা মধুকরাঃ স্বরাজানং মধুকররাজানম্ উৎক্রামন্তং প্রতি সর্ব্বা এব উৎক্রামন্তে, তস্মিংশ প্রতিষ্ঠমানে সর্ব্বা এব প্রাতিষ্ঠন্তে প্রতিতিষ্ঠন্তি। যথায়ং দৃষ্টান্তঃ, এবং বাঙ্মনশ্চক্ষুঃশ্রোত্রঞ্চেত্যাদয়ঃ, তে উৎসৃজ্যাশ্রদ্দধানতাং বুদ্ধা প্রাণমাহাত্ম্যং প্রীতাঃ প্রাণং স্তন্বস্তি স্তুবন্তি ॥ ২০ ॥৪॥

৩৮ প্রশ্নোপনিষৎ।

ভাষ্যানুবাদ।

সেই প্রাণ তাহাদের অশ্রদ্ধা অবলোকনে অভিমানবশতঃ যেন উর্দ্ধে উৎক্রান্ত হইবারই উপক্রম করিল,-অর্থাৎ অন্যের অপেক্ষা না করিয়া যেন ক্রোধসহকারে এই শরীর পরিত্যাগ করিতেই উদ্যত হইল। প্রাণ উৎক্রমণোদ্যত হইলে পর যাহা ঘটিয়াছিল, দৃষ্টান্ত দ্বারা তাহা প্রত্যক্ষায়মাণ করিতেছেন-সেই প্রাণ উৎক্রমণোদ্যত হইলে, পরক্ষণেই চক্ষুঃ প্রভৃতি অপর সমস্ত প্রাণ(করণবর্গ) উৎক্রান্ত হইবার উপক্রম করিয়াছিল; এবং সেই প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হইলে পর-তৃষ্ণীংভাব অব- লম্বন করিলে পর, তাহারা সকলেই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, অর্থাৎ স্থিরভাবে অবস্থিত হইয়াছিল। এতদ্বিষয়ে[দৃষ্টান্ত এই]-জগতে মক্ষিকাসমূহ অর্থাৎ সমস্ত মধুকরগণ যেমন স্বীয় রাজাকে-মধুকর- রাজকে উৎক্রান্ত(উড্ডীন)[দর্শন করিয়া] সকলেই তাহাকে লক্ষ্য করিয়া উৎক্রান্ত হইয়া থাকে, এবং সে প্রতিষ্ঠিত হইলে, যেমন সকলেই প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকে; এই দৃষ্টান্তটি যে প্রকার, এই প্রকারে সেই বাক্য, মনঃ, চক্ষুঃ এবং শ্রোত্র প্রভৃতি প্রাণসমূহ অশ্রদ্ধা পরিত্যাগ করিয়া-প্রাণের মাহাত্ম্য অবগত হইয়া, প্রীতিলাভকরতঃ প্রাণকে স্তব করিয়া থাকে ॥ ২০॥ ৪॥

এষোহগ্নিস্তপত্যেষ সূর্য্য এষ পর্জন্যো মঘবানেষ বায়ুঃ। এষ পৃথিবী রয়িৰ্দ্দেবঃ সদসচ্চামৃতঞ্চ যৎ ॥ ২১ ॥ ৫ ॥

[ তৎস্তুতিমেবাহ এষ ইত্যাদি না।]-এষঃ(প্রাণঃ) অগ্নিঃ[সন্] তপতি(তাপং করোতি) এষঃ(প্রাণঃ) সূর্য্যঃ[সন্ প্রকাশতে]। এষঃ পর্জন্যঃ(মেঘঃ সন্) [বর্ষতি]। এষঃ মঘবান(ইন্দ্রঃ সন্)[সর্ব্বং রক্ষতি]। এষঃ বায়ুঃ[সন্ প্রবাতি] [এবং সর্ব্বত্র যথাযোগ্যং ক্রিয়াপদং যোজনীয়ম্।] এষঃ দেবঃ(প্রকাশাত্মা)

প্রশ্নোপনিষৎ। ৩৯

পৃথিবী(ধরিত্রী) রয়িঃ(অন্নং চন্দ্রমাঃ) সৎ(সূক্ষ্মং কারণং) অসৎ(স্থূলং কার্য্যং) চ অমৃতং(দেবভোজ্যম্, অমরণস্বভাবং ব্রহ্মাদিভাবো বা) চ(অপি) যৎ, [তদপি এষ প্রাণ ইতি শেষঃ]।

[ এষ ইত্যাদি বাক্যে সেই প্রাণস্তুতিই কথিত হইতেছে]—এই প্রাণ অগ্নি হইয়া তাপ দিতেছেন; ইনি সূর্য্য, ইনি পর্জন্য(মেঘ), ইনি মঘবান্(ইন্দ্র), ইনি বায়ু, ইনি পৃথিবী, এবং ইনি প্রকাশস্বভাব রয়ি(অন্ন—চন্দ্র)।[ অধিক কি,] যাহা, সৎ(সূক্ষ্ম), অসৎ(স্থূল) এবং অমৃত[তাহাও ইনি]॥ ২১ ॥৫॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

কথম্—এষ প্রাণঃ অগ্নিঃ সন্ তপতি জ্বলতি; তথা এষঃ সূর্য্যঃ সন্ প্রকাশতে; তথা এষঃ পর্জন্যঃ সন্ বর্ষতি। কিঞ্চ, মঘবান্ ইন্দ্রঃ সন্ প্রজাঃ পালয়তি, জিঘাংসত্যসুররক্ষাংসি। এষঃ বায়ুঃ আবহ-প্রবহাদিভেদঃ। কিঞ্চ, এষঃ পৃথিবী, রয়িদ্দেবঃ সর্বস্য জগতঃ সৎ, মূর্ত্তম্ অসৎ অমূর্ত্তঞ্চ অমৃতঞ্চ যদ্দেবানাং স্থিতিকারণম্ ॥ ২১॥ ৫ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

কি প্রকার?—এই প্রাণ অগ্নি হইয়া তাপ দেন—প্রজ্বলিত হন; সেইরূপ ইনি সূর্য্য হইয়া প্রকাশ পান, সেইরূপ ইনি পর্জন্য(মেঘ) হইয়া বর্ষণ করেন। আরও—মঘবান্—ইন্দ্র হইয়া প্রজাগণকে পালন করেন,—অসুর এবং রাক্ষসগণকে হিংসা করিতে ইচ্ছা করেন; ইনিই আবহ-প্রবহাদি ভেদসম্পন্ন বায়ু। অপিচ, ইনি পৃথিবী এবং দ্যোতমান রয়ি(চন্দ্র) হইয়া সমস্ত জগতের[ধারক হন]। আর অসৎ—মূর্ত্ত(স্থূল) ও সৎ(সূক্ষম) এবং দেবগণের জীবনসাধন যে, অমৃত,[তাহাও এই প্রাণ]॥ ২১ ॥ ৫ ॥ অরা। ইব রথনাভৌ প্রাণে সর্ব্বং প্রতিষ্ঠিতম্।

খাটো যক্ষ্মি সামানি যজ্ঞঃ ক্ষত্রং ব্রহ্ম চ ॥ ২২ ॥ ৬ ॥[ কিং বহুনা,] রথনাভৌ(রথচক্রস্য নাভিরন্ধে) অরাঃ(শলাকাঃ) ইব প্রাণে(সংসারচক্রনাভিভূতে) সর্ব্বং(বক্ষ্যমাণশ্রদ্ধাদি নামপর্য্যন্তং, অগ্নি-চন্দ্রা- দিকং বা) প্রতিষ্ঠিতং।[বিশিষ্যাহ] ঋচঃ, যজুংষি, সামানি,(এতে ত্রয়ো বেদাঃ)

৪০ প্রশ্নোপনিষৎ।

যজ্ঞঃ(বৈদিকী ক্রিয়া), ক্ষত্রং(পালয়িত্রী জাতিঃ) ব্রহ্ম(যজ্ঞসম্পাদকো দ্বিজাতিঃ)। চ(অপি)[প্রতিষ্ঠিতমিতি শেষঃ]॥

আর বেশী কি? রথচক্রের নাভিতে শলাকা-সমূহের ন্যায়[ শ্রদ্ধাদি নাম পর্য্যন্তই অথবা অগ্নিচন্দ্রাদি] সমস্ত এই প্রাণে অবস্থিত রহিয়াছে, ঋক্, এবং যজুঃ ও সামবেদ, যজ্ঞ, ক্ষত্রিয় এবং ব্রাহ্মণও[এই প্রাণে অবস্থিত রহিয়াছে] ॥ ২২৷৬৷৷

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

কিং বহুনা, অরা ইব রথনাভৌ শ্রদ্ধাদি নামান্তং সর্ব্বং স্থিতিকালে প্রাণে এব প্রতিষ্ঠিতম্। তথা ঋচো যজুংষি সামানীতি ত্রিবিধা মন্ত্রাঃ, তৎসাধ্যশ্চ যজ্ঞঃ, ক্ষত্রঞ্চ সর্ব্বস্য পালয়িতৃ, ব্রহ্ম চ যজ্ঞাদি-কর্মকর্তৃত্বেহধিকৃতঞ্চ এবৈষ প্রাণঃ সর্ব্বম্ ॥ ২২ ॥ ৬ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

অধিক কি, রথের নাভিতে অর বা শলাকাসমূহের ন্যায় শরীরাব- স্থিতিকালে[বক্ষ্যমাণ] শ্রদ্ধা হইতে নাম পর্য্যন্ত সমস্তই প্রাণে অবস্থিত [আছে](১২)। সেইরূপ, ঋক্, যজুঃ, সাম, এই ত্রিবিধ মন্ত্রসমূহ, মন্ত্র-সাধ্য যজ্ঞ, সর্বপালক ক্ষত্রিয় এবং যজ্ঞাদি কর্ম্মের কর্তৃত্বাধিকারী ব্রাহ্মণ, সমস্তই এই প্রাণ ॥ ২২ ॥ ৬ ॥

প্রজাপতিশ্চরসি গর্ভে

ত্বমেব প্রতিজায়সে।

তুভ্যং প্রাণ প্রজাস্বিধা বলিং হরন্তি যঃ প্রাণৈঃ প্রতিতিষ্ঠসি ॥২৩॥৭॥

অপিচ,[হে প্রাণ!] ত্বম্ এব প্রজাপতিঃ সন্ গর্ভে(মাতৃজঠরে) চরসি (তিষ্ঠসি), প্রতিজায়সে(মাতাপিত্রোরনুরূপঃ সন্ উৎপদ্যসে)[চ]। হে প্রাণ! ইমাঃ প্রজাঃ(মনুষ্যপ্রভৃতয়ঃ) তু(পুনঃ) তুভ্যং বলিং(ভোজ্যং উপহারং) হরন্তি, যঃ ত্বং প্রাণৈঃ(চক্ষুরাদিভিঃ) সহ প্রতিতিষ্ঠসি(শরীরে বর্ত্তসে) ॥

(১২) তাৎপর্য্য—এই উপনিষদেই ষষ্ঠ প্রশ্নের চতুর্থ মন্ত্রে শ্রদ্ধাদি নামপৰ্য্যন্ত পঞ্চদশ কলার উল্লেখ আছে।

প্রশ্নোপনিষৎ। ৪১

হে প্রাণ! তুমিই প্রজাপতি হইয়া গর্ভে বিচরণ কর এবং[মাতাপিতার] অনুরূপ হইয়া জন্ম লাভ কর। হে প্রাণ! যে তুমি প্রাণসমূহের(চক্ষুঃপ্রভৃতির) সহিত অবস্থান কর,[সেই] তোমার উদ্দেশে ইহারা সকলে(মনুষ্যপ্রভৃতিরা) বলি(ভোজ্য) উপহার প্রদান করিয়া থাকে ॥ ২৩॥ ৭ ॥

শাঙ্কর ভাষ্যম্।

কিঞ্চ, যঃ প্রজাপতিরপি, স ত্বমেব গর্ভে চরসি, পিতুৰ্ম্মাতুশ্চ প্রতিরূপঃ সন্ প্রতিজায়সে; প্রজাপতিত্বাদেব প্রাগেব সিদ্ধং তব মাতৃপিতৃত্বম্; সর্ব্বদেহ-দেহ্যা- কৃতিচ্ছদ্মনা একঃ প্রাণঃ সর্ব্বাত্মাসীত্যর্থঃ। তুভ্যং ত্বদর্থায় ইমাঃ মনুষ্যাদ্যা: প্রজান্ত হে প্রাণ! চক্ষুরাদিদ্বারৈঃ বলিং হরন্তি। যতত্ত্বং প্রাণৈশ্চক্ষুরাদিভিঃ সহ প্রতিতিষ্ঠসি সর্ব্বশরীরেষু, অতস্তুভ্যং বলিং হরন্তীতি যুক্তম্। ভোক্তাসি যতত্ত্বং, তবৈবান্যৎ সর্ব্বং ভোজ্যম্ ॥ ২৩॥ ৭ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

আর যিনি প্রজাপতিরূপও বটে, তুমিই তদ্রূপে গর্ভে বিচরণ কর এবং পিতা ও মাতার অনুরূপ হইয়া জন্ম পরিগ্রহ কর। প্রজাপতিত্ব- নিবন্ধন তৎপূর্ব্বেই তোমার মাতা-পিতৃস্বরূপত্ব সম্পন্ন আছে। তুমিই এক প্রাণ সমস্ত দেহ ও দেহি-চ্ছলে সর্বাত্মক হইতেছ। হে প্রাণ! এই যে মনুষ্যাদি প্রজাগণ(প্রাণিবর্গ), সকলেই তোমার উদ্দেশে চক্ষুঃ প্রভৃতি ইন্দ্রিয় দ্বারা বলি(ভোগ্য বস্তু) উপহার দিয়া থাকে। যে হেতু তুমি চক্ষুঃপ্রভৃতি প্রাণ সমুদয়ের সহিত সমস্ত শরীরে অবস্থিতি কর, এই কারণে তোমার উদ্দেশে যে বলি আহরণ করে, ইহা সমুচিতই বটে। যেহেতু তুমিই ভোক্তা এবং অপর সমস্তই তোমার ভোজ্য বা ভোগাই(১৩) ॥ ২৩ ॥ ৭ ॥

৪২ প্রশ্নোপনিষৎ।

দেবানামসি বহ্নিতমঃ পিতৃণাং প্রথমা স্বধা। ঋষীণাং চরিতং সত্যমথর্ব্বাঙ্গিরসামসি ॥ ২৪ ॥ ৮॥

বিভূত্যন্তরমাহ—দেবানামিতি।—[হে প্রাণ!][ত্বং] দেবানাং সম্বন্ধে বহ্নিতমঃ(অতিশয়েন হবির্বাহকঃ), পিতৃণাং(অগ্নিস্বাত্তাদীনাং) প্রথমা (শ্রেষ্ঠা) স্বধা(তৃপ্তসাধনম্),[তথা] অথর্ব্বাঙ্গিরসাম্(অঙ্গিরসভূতানাম্ অথর্ব্বণাম্) ঋষীণাং(চক্ষুরাদিপ্রাণানাং) সত্যং(যথার্থভূতং) চরিতম্(দেহধারণ- রূপং চেষ্টিতম্) অসি(ভবসি ইত্যর্থঃ)॥

[হে প্রাণ] তুমি দেবগণের শ্রেষ্ঠ বহ্নিস্বরূপ এবং পিতৃগণের স্বধা বা তৃপ্তিসাধন, অথর্ব্বাঙ্গিরস ঋষিগণের(প্রাণসমূহের) সত্য চরিত বা চেষ্টাস্বরূপ[হও] ॥ ২৪ ॥ ৮ ॥

শাঙ্কর ভাষ্যম্।

কিঞ্চ, দেবানামিন্দ্রাদীনাম্ অসি ভবসি ত্বং বহ্নিতমঃ হবিষাং প্রাপয়িতৃতমঃ। পিতৃণাং নান্দীমুখে শ্রাদ্ধে যা পিতৃভ্যো দীয়তে স্বধা অন্নং, সা দেবপ্রদানমপেক্ষ্য প্রথমা ভবতি; তস্যা অপি পিতৃভ্যঃ প্রাপয়িতা ত্বমেবেত্যর্থঃ। কিঞ্চ, ঋষীণাং চক্ষুরাদীনাং প্রাণানাম্ অথর্ব্বাঙ্গিরসাম্ অঙ্গিরসভূতানাম্ অথর্ব্বণাং তেষামের “প্রাণো বা অথর্ব্বা” ইতি শ্রুতেঃ। চরিতং চেষ্টিতং সত্যম্ অবিতথং দেহ- ধারণাদ্যপকারলক্ষণং ত্বমেবাসি ॥ ২৪॥ ৮॥

ভাষ্যানুবাদ।

আরও, ইন্দ্রাদি দেবগণের সম্বন্ধে তুমি বহ্নিতম অর্থাৎ সর্বোত্তম হবিঃ-প্রাপক(যজ্ঞীয় দ্রব্যের শ্রেষ্ঠ বাহক)। নান্দীমুখ শ্রাদ্ধে পিতৃগণ উদ্দেশে যে স্বধা অর্থাৎ অন্ন প্রদত্ত হয়, দেবতার উদ্দেশে দ্রব্য- প্রদানের প্রথমেই তাহা দত্ত হয়, অর্থাৎ দেবগণের উদ্দেশে যজ্ঞাদি ক্রিয়া করিতে হইলেও প্রথমে নান্দীমুখ শ্রাদ্ধে পিতৃগণের উদ্দেশে অন্নদান করিতে হয়; এই কারণে স্বধাকে ‘প্রথমা’ বলা হইয়াছে। তুমিই পিতৃগণ উদ্দেশে সেই স্বধারও প্রাপয়িতা বা প্রাপক। আরও এক কথা, অঙ্গিরস্ অর্থাৎ অঙ্গিরসস্বরূপ অথর্বন ঋষিগণের অর্থাৎ

প্রশ্নোপনিষৎ। ৪৩

চক্ষুঃপ্রভৃতি প্রাণসমূহের সত্য—যথার্থ চরিত—অর্থাৎ দেহ ধারণরূপ চেষ্টাও তুমিই। শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, ‘প্রাণই অথর্বা।’ [ তদনুসারে ‘অথর্বা’ শব্দে ‘প্রাণ’ অর্থ বুঝিতে হইবে]।। ২৪।। ৮

ইন্দ্রস্ত্বং প্রাণ তেজসা রুদ্রোহসি পরিরক্ষিতা। ত্বমন্তরিক্ষে চরসি সূর্য্যস্ত্বং জ্যোতিষাম্পতিঃ ॥ ২৫ ॥ ৯ ॥

কিঞ্চ, হে প্রাণ! ত্বং ইন্দ্রঃ(দীপ্তিমাস্ পরমেশ্বর:, ব্রহ্মা বা)[পূর্ব্বং মঘোন উক্তত্বাৎ নেহ তৎপরিগ্রহো ন্যায্যঃ পুনরুক্তিপ্রসঙ্গাৎ]। অস(ভবসি)। তেজসা (বীর্য্যেণ) রুদ্রঃ(জগৎসংহারকোহসি)। পরি(সমন্তাৎ) রক্ষিতা[চ অসি]। ত্বং সূর্য্যঃ(সন্) অন্তরিক্ষে(দ্যুলোকে) চরসি(ভ্রমসি)। ত্বং জ্যোতিষাং পতিঃ (প্রভুঃ)[অসি]॥

হে প্রাণ! তুমি ইন্দ্র স্বরূপ(পরমেশ্বর বা ব্রহ্মা), তুমি তেজে রুদ্রস্বরূপ, এবং সর্ব্বতোভাবে রক্ষকও হও। তুমি সূর্য্যরূপে অন্তরিক্ষে বিচরণ কর, এবং তুমিই জ্যোতিঃসমূহের পতি বা প্রভু ॥ ২৫ ॥ ৯ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কিঞ্চ, ইন্দ্রঃ পরমেশ্বরত্ত্বং হে প্রাণ! তেজসা বীর্য্যেণ রুদ্রোহসি সংহরন্ জগৎ। স্থিতৌ চ পরি সমন্তাৎ রক্ষিতা পালয়িতা; পরিরক্ষিতা ত্বমেব জগতঃ সৌম্যেন রূপেণ। ত্বম্ অন্তরিক্ষে অজস্রং চরসি উদয়াস্তময়াভ্যাং সূর্য্যস্তমেব চ_সর্ব্বেবাং জ্যোতিষাং পতিঃ ॥ ২৫ ॥ ৯ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

অপিচ, হে প্রাণ! তুমি ইন্দ্র অর্থাৎ পরমেশ্বর,[ এবং তুমিই] স্বীয় শক্তিবলে জগৎসংহারকারক রুদ্র, এবং স্থিতিকালেও এক তুমিই শান্তরূপে সর্বতোভাবে জগতের রক্ষিতা—পরিপালক। তুমি সূর্য্যরূপে অন্তরিক্ষে উদয় ও অস্তময় দ্বারা অনবরত বিচরণ কর, এবং তুমিই সমস্ত জ্যোতিরও পতি বা প্রভু ॥ ২৫ ॥ ৯ ॥

৪৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

যদা ত্বমভিবর্ষস্যথেমাঃ প্রাণ তে প্রজাঃ। আনন্দরূপাস্তিষ্ঠন্তি কামায়ান্নং ভবিষ্যতীতি ॥ ২৬ ॥ ১০ ॥

অপিচ, হে প্রাণ! ত্বং যদা অভিবর্ষসি(পর্জন্যরূপেণ বারি মুঞ্চসি), অথ (তদা বর্ষণানন্তরং) তে(তব) ইমাঃ প্রজাঃ(প্রাণিনঃ) ‘কামায়(ইচ্ছানুরূপং) অন্নং ভবিষ্যতি’ ইতি(হেতোঃ) আনন্দরূপাঃ(অতিশয়েন আনন্দিতাঃ সন্তঃ) তিষ্ঠন্তি(মোদন্তে ইত্যর্থঃ)। যদ্বা, ‘প্রাণতে’ ইত্যেকং পদং, বর্ষণানন্তরং প্রজাঃ প্রাণতে প্রাণচেষ্টাং কুর্ব্বন্তীত্যর্থঃ। অন্যৎ সমানম্ ॥

হে প্রণ তুমি যখন[মেঘরূপে বারি] বর্ষণ কর, তাহার পরই ‘ইচ্ছানুরূপ অন্ন হইবে’ এই মনে করিয়া তোমার এই সকল প্রজা আনন্দিত হইয়া থাকে ॥ ২৬॥১০ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

যদা পর্জন্যো ভূত্বা অভিবর্ষসি ত্বং, অথ তদা অন্নং প্রাপ্য ইমাঃ প্রজাঃ প্রাণতে প্রাণচেষ্টাং কুর্ব্বন্তীত্যর্থঃ। অথবা প্রাণ! তে তব ইমাঃ প্রজাঃ স্ব’ত্মভূতাঃ ত্বদন্ন- সংবদ্ধিতাঃ ত্বদভিবর্ষণদর্শনমাত্রেণ চানন্দরূপাঃ সুখং প্রাপ্তা ইব সত্যঃ তিষ্ঠন্তি। ‘কামায় ইচ্ছাতোহন্নং ভবিষ্যতি’ ইত্যেবমভিপ্রায়ঃ ॥ ২৬ ॥ ১০ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

তুমি যখন মেঘ হইয়া বর্ষণ কর, তখন এই প্রজাগণ প্রাণিত হয় অর্থাৎ প্রাণের উপযুক্ত চেষ্টা করে,(বাঁচিয়া থাকে)। অথবা হে প্রাণ! তোমার আত্মভূত এই প্রজাগণ তোমার অন্নে পরিবর্দ্ধিত হইয়া, তোমার বারিবর্ষণ-দর্শনমাত্রেই আনন্দরূপ অর্থাৎ সুখ-প্রাপ্ত হইয়াই যেন অবস্থান করে।[তাহাদের] অভিপ্রায় এই যে,[এখন] ইচ্ছামত অন্ন(শস্য) হইবে,[তাই তাহারা সুখী হয়]। ২৬৷ ১০৷৷

ব্রাত্যত্ত্বং প্রাণৈক ঋষিরত্তা * বিশ্বস্য সৎপতিঃ। বয়মাদ্যস্য দাতারঃ পিতা ত্বং মাতরিশ্ব নঃ ॥ ২৭ ॥ ১১

বিষ্ণু, হে প্রাণ! ত্বং ব্রাত্যঃ( প্রথমজত্বাদেব সংস্কারক-পিত্রাদেরভাবাৎ

প্রশ্নোপনিষৎ। ৪৫

অসংস্কৃতঃ,) এক-ঋষিঃ(একর্ষিনামকোহগ্নিঃ সন্) অত্তা(হবির্ভোক্তা)[তথা] বিশ্বস্য(জগতঃ) সৎপতিঃ(সাধীয়ান্ অধিপতিঃ)[অসি]। বয়ং(করণবর্গাঃ) আদ্যস্য(প্রথমজন্য) তব(প্রাণস্য)[ভক্ষণীয়স্য হবিষঃ দাতারঃ। ত্বং মাত- রিশ্বনঃ(বায়োঃ) পিতা(জনকঃ), অথবা, হে মাতরিশ্বন্! ত্বং নঃ(অস্মাকং) পিতা[অসি]॥

হে প্রাণ! তুমি ব্রাত্য(উপনয়নাদি সংস্কারহীন), একষিনামক অগ্নিরূপে অত্তা (হবির্ভোক্তা), এবং জগতের উত্তম পতিস্বরূপ। আমরা তোমার আদি পুরুষ ভক্ষণীয়[হবি] প্রদান করিয়া থাকি। হে মাতরিশ্বন্(বায়ুরূপিন্) তুমি আমাদের পিতা, অথবা তুমি মাতরিখা—বায়ুর পিতা(কারণস্বরূপ) ॥ ২৭ ॥ ১১.

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কিঞ্চ, প্রথমজত্বাদন্যস্য সংস্কর্ত্তুরভাবাদসংস্কৃতো ব্রাত্যত্ত্বং স্বভাবত এব শুদ্ধ ইত্যভিপ্রায়ঃ। হে প্রাণ এক ঋষিঃ ত্বম্ আথর্ব্বণানাং প্রসিদ্ধ একর্ষিনামা অগ্নিঃ সন্ অত্তা সর্ব্বহবিষাম্। ত্বমেব বিশ্বস্য সর্ব্বশ্য সতো বিদ্যমানস্য পতিঃ সৎপতিঃ, সাধুব্বা পতিঃ সৎপতিঃ। বয়ং পুনরাদ্যস্য তব অদনীয়স্য হবিষো দাতারঃ। ত্বং পিতা মাতরিশ্ব! হে মাতরিশ্বন্ নোহস্মাকম্। অথবা মাতরিশ্বন: বায়োঃ পিতা ত্বম্। অতশ্চ সর্ব্বস্যৈব জগতঃ পিতৃত্বং সিদ্ধম্ ॥ ২৭ ॥ ১১ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

অপিচ হে প্রাণ, সর্ব্বপ্রথমে সমুৎপন্ন বলিয়া অপর কেহ সংস্কার- কারক না থাকায়, তুমি সংস্কার-হীন ব্রাত্য(১৪) অভিপ্রায় এই যে, তুমি

৪৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

তাদৃশ হইয়াও স্বভাবতই বিশুদ্ধ। তুমি একঋষি অর্থাৎ আথর্বণদিগের প্রসিদ্ধ একর্ষিনামক অগ্নি হইয়া সমস্ত হবির(যজ্ঞীয় দ্রব্যের) ভোক্তা; তুমিই বিদ্যমান সমস্ত জগতের পতি—সৎপতি, অথবা সৎপতি অর্থ— সাধু(উৎকৃষ্ট) পতি। আমরা কিন্তু আদ্য বা প্রথমোৎপন্ন তোমার ভক্ষণীয় হবির দাতা। হে মাতরিশ্ব!(মাতরিশ্বন্ বায়ো)! তুমি আমাদের পিতা। অথবা তুমি মাতরিশ্বা—বায়ুর পিতা; এই কারণে সমস্ত জগৎসম্বন্ধেই[তাঁহার] পিতৃত্ব সিদ্ধ হইল ৷৷ ২৭ ৷৷ ১১ ৷৷

যা তে তনূর্বাচি প্রতিষ্ঠিতা, যা শ্রোত্রে, যা চ চক্ষুষি। যা চ মনসি সন্ততা, শিবাং তাং কুরু মোৎক্রমীঃ ॥২৮॥ ১২॥

[কিং বহুনা]—তে(তব) যা তনুঃ(বাক্শক্তিরূপা) বাচি(বাগিন্দ্রিয়ে) প্রতিষ্ঠিতা(স্থিতা) যা(তনুঃ) শ্রো-ন(শ্রবণেন্দ্রিয়ের), যা চ(অপি, তনুঃ) চক্ষুষি[প্রতিষ্ঠিতা]। যা চ(অপি) মনসি(অন্তঃকরণে সন্ততা(অনুগতা) [বর্ত্ততে]। তাং(তনুং) শিবাং(কল্যাণময়ীং) কুরু; মা উৎক্রমীঃ(উৎ- ক্রমণং মা কাষীঃ)[অত্রৈব তিষ্ঠেতি ভাবঃ] ॥

[হে প্রাণ!] তোমার যে তনু বাক্যে প্রতিষ্ঠিত আছে, এবং যাহা শ্রোত্রে ও চক্ষুতে[প্রতিষ্ঠিত আছে]। আর যাহা মনেতে সন্তত বা নিয়তভাবে রহিয়াছে; তাহাকে(সেই তনুকে) শিব—কল্যাণময় কর; উৎক্রমণ করিও না; অর্থাৎ দেহ হইতে বহির্গত হইও না॥ ২৮॥ ১২॥

শাঙ্কর ভাব, ম্।

কিং বহুনা, যা তে ত্বদীয়া তনুঃ বাচি প্রতিষ্ঠিতা—বক্তৃত্বেন বদনচেষ্টাং কুর্ব্বতী। যা শ্রোত্রে যা চ চক্ষুষি। যা মনসি সঙ্কল্পাদিব্যাপারেণ সন্ততা— সমনুগতা তনুঃ, তাং শিবাং শান্তাং কুরু, মা উৎক্রমীঃ উৎক্রমণেনাশিবাং মা কার্ষী- রিত্যর্থঃ ॥ ২৮॥ ১২॥

ভাষ্যানুবাদ।

আর অধিকে প্রয়োজন নাই; ত্বদীয় যে তনু বাক্যে প্রতিষ্ঠিত, অর্থাৎ বক্তৃরূপে বাগিন্দ্রিয়ের কার্য্য সম্পাদন করে; যাহা শ্রবণেন্দ্রিয়ে

প্রশ্নোপনিষৎ। ৪৭

এবং যাহা চক্ষুরিন্দ্রিয়ে[প্রতিষ্ঠিত], আর যে তনু মনোমধ্যে সংকল্পাদি ব্যাপার দ্বারা সম্পূর্ণরূপে অনুগত আছে, তাহাকে(সেই তনুকে) শিব—প্রশান্ত কর; উৎক্রান্ত হইও না, অর্থাৎ উৎক্রমণ দ্বারা তনকে অমঙ্গলময়ী করিও না ৷৷ ২৮ ॥ ১২ ॥

প্রাণস্যেদং বশে সর্ব্বং ত্রিদিবে যৎ প্রতিষ্ঠিতম্। মাতেব পুত্রান্ রক্ষস্ব শ্রীশ্চ প্রজ্ঞাঞ্চ বিধেহি ন ইতি ॥২৯৷১৩৷৷

ইত্যর্থবেদীয়-প্রশ্নোপনিষদি দ্বিতীয়ঃ প্রশ্নঃ ॥ ২ ॥

[ বিশেষপ্রার্থনয়া প্রাণস্তুতিমুপসংহরতি প্রাণস্যেত্যাদিনা।]—ত্রিদিবে (ত্রৈলোক্যে) যৎপ্রতিষ্ঠিতং, ইদং সর্ব্বং(বস্তু) প্রাণস্য(পঞ্চবৃত্ত্যাত্মকস্য তব) বশে(অধীনতায়াং)[বর্ত্ততে]। মাতা(জননী) পুত্রান্ ইব[অস্মান্] রক্ষস্ব(পালয়স্ব); নঃ(অস্মাকং) শ্রীঃ(সম্পদঃ), প্রজ্ঞাং(হিতবুদ্ধিং) চ বিধেহি(প্রযচ্ছ)। নেদানীং পূর্ব্ববদস্মাকং স্বাতন্ত্র্যমস্তি, ত্বদধীনা বয়ং, অতঃ অস্মৎকল্যাণং ত্বয়া সম্পাদনীয়মিত্যাশয়ঃ।

ইতি প্রশ্নোপনিষদব্যাখ্যায়াং দ্বিতীয়ঃ প্রশ্নঃ সমাপ্তঃ ॥

ত্রিলোকে যাহা অবস্থিত আছে, এ সমস্তই প্রাণের বশীভূত।[হে প্রাণ!] মাতা যেরূপে পুত্রগণকে রক্ষা করেন, সেইরূপ[আমাদিগকে] রক্ষা কর; এবং আমাদের সম্পৎ ও হিতবুদ্ধি বিধান কর ॥ ২৯॥ ১৩॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কিং বহুনা, অস্মিন্ লোকে প্রাণস্যৈব বশে সর্ব্বমিদং যংকিঞ্চিদুপভোগজাতং, ত্রিদিবে তৃতীয়স্যাং দিবিচ যৎ প্রতিষ্ঠিতং দেবাদ্যপভোগলক্ষণং, তস্যাপি প্রাণ এব ঈশিতা রক্ষিতা। অতো মাতেব পুত্রান্ অস্মান্ রক্ষস্ব পালয়স্ব। ত্বন্নিমিত্তা হি ব্রাহ্ম্যঃ ক্ষাত্রিয়াশ্চ শ্রিয়ঃ, তাঃ ত্বং শ্রীশ্চ শ্রিয়শ্চ প্রজ্ঞাং চ ত্বৎস্থিতিনিমিত্তাং বিধেহি নো বিধৎস্বেত্যর্থঃ। ইত্যেবং সর্ব্বাত্মতয়া বাগাদিভিঃ প্রাণৈঃ স্তুত্যা গমিতমহিমা প্রাণঃ প্রজাপতিরেবেত্যবধৃতম্ ॥ ২৯ ॥ ১৩ ॥

ইতি শ্রীমচ্ছকরভগবতঃ কৃতৌ প্রশ্নোপনিষদ্ভাষ্যে দ্বিতীয়ঃ প্রশ্নঃ ॥২॥

৪৮ প্রশ্নোপনিষৎ।
ভাষ্যানুবাদ।

আর অধিকে প্রয়োজন নাই; ইহলোকে যাহা কিছু উপভোগ-যোগ্য বস্তু এবং ত্রিদিবে[অর্থাৎ পৃথিবী অপেক্ষা] তৃতীয় স্থানে স্বর্গেও দেবভোগ্য যাহা অবস্থিত আছে, প্রাণই তাহারও ঈশ্বর বা রক্ষক; সুতরাং এ সমস্তই প্রাণের বশে বা প্রাণের অধীন। অতএব তুমি মাতার ন্যায় আমাদিগকে পুত্রগণের ন্যায় রক্ষা কর—পালন কর। যে হেতু ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের শ্রীও তোমার অধীন,[অতএব) সেই শ্রী(সম্পৎ) এবং তোমার স্থিতির অধীন প্রজ্ঞা(বুদ্ধি) আমাদিগের সম্বন্ধে বিধান কর। এই বাক্যসমষ্টি হইতে নিশ্চিত হইল যে, বাক্ প্রভৃতি প্রাণগণ সর্বপ্রকার স্তুতি দ্বারা যাহার মহিমা বিজ্ঞাপিত করিয়াছে, সেই প্রাণ নিশ্চয়ই প্রজাপতিস্বরূপ,[তাহা হইতে পৃথক্ নহে] ॥ ২৯॥ ১৩॥

ইতি প্রশ্নোপনিষদে দ্বিতীয় প্রশ্নের ভাষ্যানুবাদ।

প্রশ্নোপনিষৎ।

অথ তৃতীয়ঃ প্রশ্নঃ।

অথ হৈনং কৌসল্যশ্চাশ্বলায়নঃ পপ্রচ্ছ,—ভগবন্ কুত এষ প্রাণো জায়তে? কথমায়াত্যস্মিঞ্ছরীর আত্মানং বা প্রবি- ভজ্য কথং প্রাতিষ্ঠতে? কেনোৎক্রমতে? কথং বাহ্যমভিধত্তে? কথমধ্যাত্মমিতি ॥ ৩০ ॥ ১ ॥

[প্রাণস্য প্রাজাপত্যাদি গুণজাতমুপদিশ্য তস্যৈব উপাসনার্থমুৎপত্ত্যাদি নির্দ্ধারয়িতুমুপক্রমতে]—অথেতি। অথ-(বৈদর্ভিপ্রশ্নানন্তরং) আশ্বলায়নঃ কৌসল্যঃ হ(ঐতিহ্যে) এনং(পিপ্পলাদং) পপ্রচ্ছ—ভগবন্! এষ প্রাণঃ কুতঃ(কারণ- বিশেষাৎ) জায়তে(উৎপদ্যতে)? কথং(কেন হেতুনা বা) অস্মিন্ শরীরে আয়াতি(প্রবিশতি)? কথং(কেন প্রকারেণ বা) আত্মানং প্রবিভজ্য প্রাতি- ষ্ঠতে(শরীরে তিষ্ঠতি)? কেন বা(ব্যাপারবিশেষেণ) উৎক্রমতে(অস্মাচ্ছরীরা- দুৎক্রামতি)? কথং(কেন রূপেণ) বাহ্যং(অধিভূতং অধিদৈবতং চ) অভি- ধত্তে(ধারয়তি), কথং[বা] অধ্যাত্মং(শরীরেন্দ্রিয়াদি)[ধারয়তীতিশেষঃ]। ইতি(প্রশ্নসমাপ্তৌ)॥

অনন্তর কৌশল্য আশ্বলায়ন ইঁহাকে(পিপ্পলাদকে) জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবন্! এই প্রাণ কোথা হইতে জন্ম লাভ করে? কিরূপে এই শরীরে আগমন করে? কিরূপেই বা আপনাকে[পাঁচভাগে] বিভক্ত করিয়া অবস্থান করে? কিরূপে উৎক্রমণ করে?(দেহ হইতে বহির্গত হয়?) এবং কিরূপে বাহ্যও অধ্যাত্ম (শরীরেন্দ্রিয় প্রভৃতি) ধারণ করে? ইতি শব্দটি(প্রশ্নসমাপ্তিসূচক ॥ ৩০ ॥ ১ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

অথ দৈনঃ কোশলকপাণিঃ পথ্যৈঃ—প্রাতোহরঃ প্রাতঃ নির্দ্ধারিততঃ।

৫০ প্রশ্নে, পনিষৎ।

উপলব্ধমহিমাপি সংহতত্বাৎ স্যাদস্য কার্য্যত্বম্, অতঃ পৃচ্ছামি,-ভগবন্ কুতঃ কস্মাৎ কারণাদেষ যথাবধৃতঃ প্রাণো জায়তে? জাতশ্চ কথং কেন বৃত্তিবিশেষেণ অয়াত্যস্মিন্ শরীরে; কিংনিমিত্তকমস্য শরীরগ্রহণমিত্যর্থঃ। প্রবিষ্টশ শরীরে আত্মানং বা প্রবিভজ্য প্রবিভাগং কৃত্বা কথং কেন প্রকারেণ প্রাতিষ্ঠতে প্রতি- তিষ্ঠতি? কেন বা বৃত্তিবিশেষেণ অস্মাৎ শরীরাৎ উৎক্রমতে উৎক্রামতি। কথং বাহ্যম্ অধিভূতম্ অধিদৈবতঞ্চ অভিধত্তে ধারয়তি? কথমধ্যাত্মম্ ইতি ধারয়তীতি শেষঃ ॥ ৩০ ॥ ১ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

অনন্তর কোসলবংশীয় আশ্বলায়ন ইহাঁকে জিজ্ঞাসা করিলেন,- পূর্ব্বোক্তক্রমে যাহারা মুখ্যপ্রাণের তত্ত্ব উপলব্ধি করিয়াছে, সেই চক্ষুঃ শ্রোত্রাদি প্রাণগণকর্তৃক প্রাণ-মহিমা উপলব্ধি হইলেও সংহতত্বহেতু (সাবয়বত্ব বশতঃ) ইহার কার্য্যত্ব(জন্যত্ব) সম্ভাবিত হইতে পারে; এই কারণে জিজ্ঞাসা করিতেছি-হে ভগবন্! যথাবধৃত(পূর্ব্বে যেরূপ অবধারণ করা হইয়াছে), এই প্রাণ কোন্ কারণ হইতে জন্ম- লাভ করে? জন্মলাভ করিয়াও কিরূপ ব্যাপার দ্বারা এই দেহে আগমন করে? অর্থাৎ ইহার শরীর ধারণের নিমিত্ত কি? শরীরে প্রবিষ্ট হইয়া আপনাকে বিভক্ত করতঃ কিপ্রকারেই বা অবস্থান করে? কিপ্রকার ব্যাপার দ্বারা এই শরীর হইতে উৎক্রমণ করে (বহির্গত হয়)? কিপ্রকারেইবা বাহ্য-অধিভূত ও অধিদৈবত বিষয়কে ধারণ করে? এবং অধ্যাত্ম(দেহেন্দ্রিয়াদি) বিষয়কেই বা কিপ্রকারে ধারণ করে? ৩০ ॥ ১ ॥

তস্মৈ স হোবাচ অতিপ্রশ্নান্ পৃচ্ছসি, ব্রহ্মিষ্ঠোহসীতি, তস্মাত্তেহহং ব্রবীমি ॥ ৩১ ॥ ২ ॥

সঃ(পিপ্পলাদঃ) তস্মৈ(কৌশল্যায়) উবাচ—[ ত্বং] অতিপ্রশ্নান্(দুবি- জ্ঞেয়বিষয়ান্) পৃচ্ছসি;[ অতঃ ত্বং] ব্রহ্মিষ্ঠঃ(অতিশয়েন ব্রহ্মবিৎ) অসি (ভবসি) ইতি। তস্মাৎ(হেতোঃ) অহং তে(তুভ্যং) ব্রবীমি(প্রশ্নোত্তরং কথয়ামীতি ভাবঃ) ॥

প্রশ্নোপনিষৎ। ৫১

তিনি(পিপ্পলাদ) তাহার উদ্দেশে বলিলেন—[তুমি] অতি দুজ্ঞেয় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতেছে,[অতএব তুমি] অন্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ব্রহ্মবিৎ। এজন্য আমি তোমার উদ্দেশে বলিতেছি ॥ ৩১ ॥ ২ ॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

ইত্যেবং পৃষ্টস্তস্মৈ স হোবাচ আচার্য্যঃ, প্রাণ এব তাবৎ দুর্ব্বিজ্ঞেয়ত্বাৎ বিষম- প্রশ্নাইঃ, তস্যাপি জন্মাদি ত্বং পৃচ্ছসি, অতঃ অতি প্রশ্নান পৃচ্ছসি। ব্রহ্মিষ্টোহপীতি অতি- শয়েন ত্বং ব্রহ্মবিদ, অতস্তুষ্টোহহং; তস্মাত্তে তুভ্যং ব্রবীমি—যৎপৃষ্ঠং; শৃণু ॥৩১৷৷২৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

সেই আচার্য্য(পিপ্পলাদ) পূর্ব্বোক্তপ্রকারে জিজ্ঞাসিত হইয়া, তাহার উদ্দেশে বলিলেন,—প্রথমতঃ প্রাণই দুজ্ঞেয়ত্বনিবন্ধন বিষম(কঠিন) প্রশ্নের বিষয়; তাহারও আবার জন্মাদি বিষয়ে তুমি প্রশ্ন করিতেছ; অতএব[তুমি] অতিপ্রশ্নসমূহ জিজ্ঞাসা করিতেছ।[অতএব তুমি] ব্রহ্মিষ্ঠ,—অর্থাৎ তুমি অতিশয় ব্রহ্মবিৎ; এজন্য আমি তুষ্ট[হইয়াছি], সেই হেতু তুমি যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছ,[তাহা] তোমার উদ্দেশে বলিতেছি; শ্রবণ কর ॥ ৩২ ॥ ২॥

আত্মন এষ প্রাণো জায়তে। যথৈষা পুরুষে চ্ছায়া, এতস্মিন্নেতদাততং, মনোকৃতেনায়াত্যস্মিঞ্জরীরে ॥ ৩২ ॥ ৩ ॥

[ক্রমেণ প্রশ্নোত্তরাণ্যাহ ‘আত্মন’ ইত্যাদিনা।]—এষঃ(পূর্ব্বোক্তঃ) প্রাণঃ আত্মনঃ (পরমেশ্বরাৎ) জায়তে(উৎপদ্যতে)।[তত্রায়ং দৃষ্টান্তঃ]—পুরুষে(দেহে) [দেহনিমিত্তা] যথা ছায়া[জায়তে, তথা] এতৎ(প্রাণরূপং বস্তু) এতস্মিন্ (পুরুষে—পরমেশ্বরে) আততং(ব্যাপ্তং অনুগতমিত্যর্থঃ)। মনোকৃতেন (সংকল্পাদিনা) অস্মিন্ শরীরে আয়াতি(আগচ্ছতি)॥

আত্মা বা পরমেশ্বর হইতে এই প্রাণ জন্ম লাভ করিয়া থাকে। পুরুষদেহে যেরূপ ছায়া সমুৎপন্ন হয়,[সেইরূপ] এই প্রাণও এই আত্মাতে(পরমেশ্বরে), আতত বা অনুগত থাকে, এবং মনঃসম্পাদিত[কামাদি দ্বারা] এই স্থূল শরীরে আগমন করে ॥ ২ ॥ ৩ ॥

৫২ প্রশ্নোপনিষৎ।

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

আত্মনঃ পরস্মাৎ পুরুষাদক্ষরাৎ সত্যাৎ এষ উক্তঃ প্রাণো জায়তে। কথং? ইত্যত্র দৃষ্টান্তঃ—যথা লোকে এষা পুরুষে শিরঃপাণ্যাদিলক্ষণে নিমিত্তে ছায়া নৈমিত্তিকী জায়তে; তদ্বৎ এতস্মিন্ ব্রহ্মণি এতৎ প্রাণাখ্যং ছায়াস্থানীয়মমৃতরূপং তত্ত্বং সত্যে পুরুষে আততং সমর্পিতমিত্যেতৎ। ছায়ৈব দেহে মনোক্বতেন মনঃ- কৃতেন মনঃসঙ্কল্পেচ্ছাদিনিষ্পন্নকৰ্ম্মনিমিত্তেন ইত্যেতৎ। বক্ষ্যতি হি—“পুণ্যেন পুণ্যম্” ইত্যাদি। “তদেব সক্তঃ সহ কৰ্ম্মণৈতি” ইতি চ শ্রুত্যন্তরাৎ। আয়াতি আগচ্ছতি অস্মিন্ শরীরে ॥ ৩২ ॥ ৩ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

আত্মা হইতে অর্থাৎ পরমপুরুষ সত্য অক্ষর(ব্রহ্ম) হইতে এই পূর্ব্বোক্ত প্রাণ জন্ম ধারণ করে। কিপ্রকারে? এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত এই যে, জগতে পুরুষে অর্থাৎ শিরোহস্তাদিময় দেহে যেরূপ দেহ-নিমিত্তক ছায়া উৎপন্ন হয়, সেইরূপ ছায়াস্থানীয় এই অসত্যভূত প্রাণনামক তত্ত্বটিও এই সত্যস্বরূপ ব্রহ্মপুরুষে আতত—সমর্পিত(আছে); দেহ- গত-মনঃকৃত অর্থ মানস সংকল্প ও ইচ্ছাদি দ্বারা সম্পাদিত কর্মানুসারে ছায়ার ন্যায় এই শরীরে আগমন করিয়া থাকে। শ্রুতি পরেও বলিবেন যে, ‘পুণ্য দ্বারা পুণ্য লোক(জয় করে)’ ইত্যাদি। আসক্ত পুরুষ কৰ্ম্ম-সংস্কারসহ তাহাই প্রাপ্ত হইয়া থাকে,[তাঁহার সূক্ষ্ম মনঃ যে বিষয়ে আসক্ত থাকে।] এই অন্য শ্রুতিতেও ইহা উক্ত হইয়াছে ॥ ৩২ ॥ ৩ ॥

যথা সম্রাড়েবাধিকৃতান্ বিনিযুক্তে—এতান্ গ্রামানেতান্ গ্রামানধিতিষ্ঠস্বেতি; এবমেবৈষ প্রাণ ইতরান্ প্রাণান্ পৃথক্ পৃথগেব সন্নিধত্তে ॥ ৩৩ ॥ ৪ ॥

যথা সম্রাট্(সার্বভৌমঃ) এব অধিকৃতান্(অধিকারপ্রাপ্তান্ জনান্) ‘এতান্ গ্রামান্ এতান্ গ্রামান্ অধিতিষ্ঠস্ব(অধিষ্ঠায় পালয়)” ইতি[কৃত্বা] বিনিযুক্তে(নিয়োজয়তি)। এবমেব এষঃ(প্রাণঃ) ইতরান্(অপরান্) প্রাণান্ (চক্ষুরাদীন্) পৃথক্ পৃথক্ এব সন্নিধত্তে(স্ব-স্ববিষয়েযু নিযুঙেক্ত) ॥

প্রশ্নোপনিবৎ। ৫৩

সম্রাট, যেরূপ ‘এই সমস্ত গ্রাম, এই সমস্ত গ্রাম শাসন কর’ বলিয়া অধিকৃত বা অধিকারপ্রাপ্ত লোকদিগকে নিযুক্ত করেন; ঠিক এই রূপই এই প্রাণও অপর প্রাণসমূহকে পৃথক্ পৃথক্‌ভাবে[স্ব স্ব বিষয়ে] নিযুক্ত করিয়া থাকে ॥ ৩৩ ॥ ৪ ॥

শঙ্কর-ভাব্যম্।

যথা যেন প্রকারেণ লোকে রাজা সম্রাড়েব গ্রামাদিযু অধিকৃতান্ বিনিযুঙক্তে। কথম্? এতান্ গ্রামান্ এতান্ গ্রামানধিতিষ্ঠস্বেতি। এবমেব যথা দৃষ্টান্তঃ; এষঃ মুখ্যঃ প্রাণ ইতরান্ প্রাণান্ চক্ষুরাদীন্ আত্মভেদাংশ্চ পৃথক্ পৃথগেব যথা- স্থানং সন্নিধত্ত্বে বিনিযুঙক্তে॥ ৩৩ ॥ ৪ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

জগতে রাজা সম্রাটই যেপ্রকারে অধিকৃত লোকদিগকে গ্রাম প্রভৃতি বিষয়ে নিযুক্ত করে; কিরূপে(নিযুক্ত করে)?(তুমি) ‘এই গ্রামসমূহে, এই গ্রামসমূহে অধিষ্ঠান কর,’[এইরূপে নিযুক্ত করে], এইরূপই, অর্থাৎ এই দৃষ্টান্তের অনুরূপই এই মুখ্যপ্রাণ ও অপর প্রাণ—চক্ষুঃ-প্রভৃতিকে এবং স্বীয় ভেদসমূহকেও পৃথক্ পৃথক্- ভাবেই যথাস্থানে বিশেষরূপে নিযুক্ত করিয়া থাকে ॥ ৩৩ ॥ ৪ ॥

পায়ুপস্থেহপানং চক্ষুঃশ্রোত্রে মুখনাসিকাভ্যাং প্রাণঃ স্বয়ং প্রাতিষ্ঠতে; মধ্যে তু সমানঃ; এষ হোতদ্ধুতমন্নং সমং নয়তি, তস্মাদেতাঃ সপ্তার্চ্চিষো ভবন্তি ॥৩৪।৫৷৷

[ তত্র চক্ষুরাদীনাং বিষয়-বিনিয়োগস্য সুগমত্বাৎ, তং পরিত্যজ্য মুখ্যপ্রাণস্যৈব বিতজ্য নিয়োগ প্রকারমাহ]—পায়ুপস্থে ইত্যাদি। পায়ুপস্থে(পায়ুশ্চ উপস্থশ্চ পায়ূপস্থং, তস্মিন্) অপানং(প্রাণভেদং)[ বিনিযুঙক্ত প্রাণ ইতিশেষঃ]। মুখ- নাসিকাভ্যাং(সহ, মুখে নাসিকায়াং চ)[তথা] চক্ষুঃশ্রোত্রে(চক্ষুষি শ্রোত্রে চ) স্বয়ং প্রাণঃ সন্নিধত্তে। মধ্যে(নাভৌ) তু(পুনঃ) সমানঃ[সন্নিধত্তে]; হি (যস্মাৎ) এবঃ(সমানঃ) হুতং(ভুক্তং) অন্নং সমং নয়তি(রস-রুধিরাদি-

৫৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

ভাবেন পরিণময়তি)। তস্মাৎ(প্রাণাগ্নেঃ) এতাঃ সপ্ত(দর্শন-শ্রবণ-মুখ- নাসিকাজন্যাঃ) অর্চ্চিষঃ(শিখাঃ প্রকাশরূপাঃ) ভবন্তি ॥

[উক্ত প্রাণই] অপানকে পায়ু ও উপস্থদেশে[নিযুক্ত করে]; এবং প্রাণ, নিজেই চক্ষুঃ, শ্রোত্র, মুখ ও নাসিকায় অধিষ্ঠান করে। সমান আবার মধ্যস্থানে [নাভিতে][অবস্থান করে]; কারণ, ইনিই[সমান বায়ুই] হুত(ভুক্ত); অন্নকে সমতা প্রাপ্ত করান। তাহা হইতে(প্রাণাগ্নি হইতে) এই সাত প্রকার দীপ্তি(চক্ষুর্দ্বয়, শ্রোত্রদ্বয়, নাসিকাদ্বয়, মুখ ও জিহ্বা-সম্পাদিত জ্ঞান) নির্গত হইয়া থাকে ॥৩৪।৫৷৷

শঙ্কর-ভাষাম্।

তত্র বিভাগঃ-পায়ুপস্থে পায়ুশ্চ উপস্থশ পায়ুপস্থং, তস্মিন্। অপানম্ আত্মভেদং মূত্রপুরীষাদ্যপনয়নং কুর্ব্বন্ সন্নিধত্তে তিষ্ঠতি। তথা চক্ষুঃশ্রোত্রে চক্ষুশ্চ শ্রোত্রঞ্চ চক্ষুঃশ্রোত্রং, তস্মিন্ চক্ষুঃশ্রোত্রে, মুখনাসিকাভ্যাং মুখঞ্চ নাসিকা চ মুখনাসিকে, তাভ্যাং মুখ-নাসিকাভ্যাং নির্গচ্ছন্ প্রাণঃ স্বয়ং সম্রাট্সনীয়ঃ প্রাতি- ষ্ঠতে প্রতিতিষ্ঠতি। মধ্যে তু প্রাণাপানয়োঃ স্থানয়োঃ নাভ্যাম্, সমানঃ অশিতং পীতঞ্চ সমং নয়তীতি সমানঃ। এষ হি যস্মাদ্যদেতৎ হুতং ভুক্তং পীতঞ্চ আত্মাগ্নৌ প্রক্ষিপ্তম্ অন্নং সমং নয়তি, তস্মাৎ অশিতপীতেন্ধনাদগ্নেরৌদৰ্য্যাৎ হৃদয়দেশং প্রাপ্তাৎ এতাঃ সপ্তসংখ্যাকা অর্চ্চিষা দীপ্তয়ো নির্গচ্ছন্ত্যো ভবন্তি শীর্ষণ্যঃ। প্রাণদ্বারা দর্শনশ্রবণাদিলক্ষণ-রূপাদিবিষয় প্রকাশ ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥৩৪৫৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

নিয়োগ বিষয়ে বিভাগ এইরূপ—যিনি মূত্র-পুরীষাদি অপনয়ন করতঃ অবস্থিতি করেন, সেই আত্মভেদ অর্থাৎ প্রাণেরই অবস্থাবিশেষ- রূপ অপান বায়ুকে[সম্রাটৃূপী প্রাণ] পায়ুপস্থে অর্থাৎ পায়ু ও উপস্থ প্রদেশে নিযুক্ত করেন। সেইরূপ সম্রাট্‌স্থানীয় প্রাণ নিজেই মুখ ও নাসিকা দ্বারা নির্গত হইয়া, চক্ষুঃশ্রোত্রে অর্থাৎ চক্ষুতে ও কর্ণে অবস্থিতি করেন। আবার প্রাণস্থান ও অপানস্থানের মধ্যে—নাভি- দেশে, ভুক্ত ও পীত বস্তুর সমতাকারী(রস-রুধিরাদিভাবে পরিণতি- সাধন) ‘সমান’-সংজ্ঞক সমানবায়ু অবস্থান করে। যেহেতু এই

প্রশ্নোপনিষৎ। ৫৫

সমানই হুত—ভুক্ত ও পীত অর্থাৎ আত্মরূপ অগ্নিতে প্রক্ষিপ্ত যে-কিছু অন্নকে সমতাপ্রাপ্ত করায়; অশিত ও পীত বস্তুই যাহার ইন্ধন (কাষ্ঠ); হৃদয়দেশস্থ সেই জাঠর অগ্নি হইতে শীর্ষবর্তী এই সপ্ত- সংখ্যক অর্চ্চিঃ—দীপ্তি নির্গত হইয়া থাকে। অভিপ্রায় এই যে, রূপ-রসাদি বিষয়ানুভূতিরূপ দর্শন-শ্রবণাদিরূপ প্রকাশ প্রাণ দ্বারাই নিষ্পন্ন হইয়া’ থাকে ॥ ৩৪ ॥ ৫ ॥

হৃদি হোষ আত্মা; অত্রৈতদেকশতং নাড়ীনাং, তাসাং শতং শতমেকৈকস্যাং দ্বাসপ্ততিদ্বাসপ্ততিঃ প্রতিশাখানাড়ী- সহস্রাণি ভবন্ত্যাসু ব্যানশ্চরতি ॥৩৫।৬৷৷

কিঞ্চ, এষ আত্মা(জীবঃ) হৃদি(হৃদয়-পুণ্ডরীকে) হি(এব)[প্রকাশতে]। অত্র(হৃদয়ে) নাড়ীনাম্(শিরাণাম্) এতৎ(বুদ্ধিগম্যং) একশতং(একাধিক- শতসংখ্যাকাঃ প্রধাননাড্য ইত্যর্থঃ)। তাসাং(নাড়ীনাং) একৈকস্যাং একৈকস্যা নাড্যাঃ) শতং শতং(শাখানাড্যঃ)। প্রতিশাখানাড়ী-সহস্রাণি চ দ্বাসপ্ততিঃ দ্বাসপ্ততিঃ, দ্বাভ্যাং অধিকাঃ সপ্ততিঃ-দ্বাসপ্ততিঃ[একৈকস্যাং শাখানাড্যাং দ্বাসপ্ততিদ্বাসপ্ততিঃ সহস্রাণি শাখানাড্যঃ সন্তীত্যর্থঃ]। আসু নাড়ীয়ু ব্যানঃ(তৎসংজ্ঞকঃ প্রাণভেদঃ) চরতি ॥

এই জীবাত্মা হৃদয়ে[ বাস করে]। এই হৃদয়ে এক শত একটি নাড়ী আছে; তাহাদের এক একটিতে আবার এক শত এক শত[শাখা নাড়ী আছে]; সেই প্রত্যেক শাখানাড়ীতে আবার বায়াত্তর বায়াত্তর হাজার নাড়ী আছে; এই সকলের অভ্যন্তরে ব্যানবায়ু সঞ্চরণ করে ॥৩৫।৬॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

হৃদি হোষ ইতি। পুণ্ডরীকাকারমাংসপিণ্ডপরিচ্ছিন্নে হৃদয়াকাশে এষ আত্মা আত্মনা সংযুক্তো লিঙ্গাত্মা জীবাত্মেত্যর্থঃ। অত্র অস্মিন্ হৃদয়ে এতৎ একশতম্ একোত্তরশতং সংখ্যয়া প্রধাননাড়ীনাং ভবতি। তাসাং শতং শতম্ একৈকস্যাঃ প্রধাননাড্যা: ভেদাঃ। পুনরপি দ্বাসপ্ততির্দাসপ্ততিঃ দ্বে দ্বে সহস্রে অধিকে সপ্ততিশ্চ সহস্রাণি। সহস্রাণাং দ্বাসপ্ততিঃ প্রতিশাখানাড়ীসহস্রাণি প্রতি প্রতিনাড়ীশতং

৫৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

সংখ্যায়া প্রধাননাড়ীনাং সহস্রাণি ভবন্তি। আসু নাড়ীবু ব্যানো বায়ুশ্চরতি। ব্যানো ব্যাপনাৎ। আদিত্যাদিব রশ্ময়ো হৃদয়াৎ সর্ব্বতোগামিনীভিঃ নাড়ীতিঃ সর্বদেহং সংব্যাপ্য ব্যানো বর্ত্ততে। সন্ধিস্কন্ধমর্ম্মদেশেযু বিশেষেণ প্রাণাপান- বৃত্ত্যোশ্চ মধ্যে উদ্ভুতবৃত্তিঃ বীর্য্যবৎকর্মকর্তা ভবতি ॥৩৫৬৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

পদ্মের সদৃশ মাংসপিণ্ড দ্বারা পরিব্যাপ্ত হৃদয়াকাশে এই আত্মা অর্থাৎ আত্মসম্বদ্ধ লিঙ্গরূপী জীবাত্মা[আছেন]। এই হৃদয়ে একশত-এক-সংখ্যক প্রধান নাড়ী আছে; সেই এক একটি প্রধান নাড়ীতে একশত একশত বিভাগ আছে। পুনশ্চ, দ্বাসপ্ততি দ্বাসপ্ততি, অর্থাৎ দুই দুই হাজার অধিক সপ্ততি(সত্তর) হাজার। সহস্রসংখ্যক প্রত্যেক শাখানাড়ী আবার বায়াত্তর হাজার অর্থাৎ প্রত্যেক একশত শাখানাড়ীতে প্রধান নাড়ীর সহস্রসংখ্যা রহিয়াছে। এই সকল নাড়ীর মধ্যে ব্যানবায়ু বিচরণ করে।[সর্বশরীর] ব্যাপক বলিয়া(ইহার নাম) ব্যান। আদিত্যমণ্ডল হইতে নির্গত রশ্মিসমূহের ন্যায় হৃদয় হইতে সর্বাবয়বগামী নাড়ীসমূহ দ্বারা সমস্ত দেহ ব্যাপিয়া ব্যানবায়ু বর্তমান আছে।[শরীরের] সন্ধি, স্কন্ধদেশ ও মৰ্ম্মস্থান এবং প্রাণবৃত্তি ও অপানবৃত্তির মধ্যে অর্থাৎ প্রাণাপানের সন্ধিস্থলে এই ব্যানবায়ুর কার্য্য অভিব্যক্ত হইয়া থাকে,[এবং এই ব্যান- বায়ুই] বীর্য্য-সাধ্য কৰ্ম্ম সম্পাদন করিয়া থাকে ॥ ৩৫ ॥ ৬ ॥

অথৈকয়োদ্ধ উদানঃ পুণ্যেন পুণ্যং লোকং নয়তি, পাপেন পাপমুভ্যামেব মনুষ্যলোকম্ ॥৩৩॥৭॥

(ইদানীং “কেনোৎক্রমতে” ইত্যস্য প্রশ্নস্যোত্তরং বক্তুং উদানবায়োঃ সঞ্চরণ- স্থানমাহ-)অথেতি। অথ(অথেতি বৃত্ত্যন্তরসূচকং), উদানঃ(উদানাখ্যঃ প্রাণ-

প্রশ্নোপনিষৎ। ৫৭

ভেদঃ) একয়া(একশততময়া সুষুম্নানাড্যা) ঊর্দ্ধঃ(উর্দ্ধগামী সন্) পুণ্যেন (কর্মণা)[জীবং] পুণ্যং লোকং(স্বর্গাদিকং) নয়তি(প্রাপয়তি); পাপেন (কর্মণা) পাপং(লোকং নরকাদিকং)[নয়তি]। উভাভ্যাং(তুল্যবলাভ্যাং পুণ্য-পাপাভ্যাং) এব(নিশ্চয়ে) মনুষ্যলোকং(সুখ-দুঃখময়ং)[নয়তীতি শেষ:]।[এতাবতা পুণ্যাধিক্যে শুভলোকং পাপাধিক্যে চ নরকং নয়তীতি সূচিতম্]॥ উদানবায়ু একটি নাড়ী দ্বারা অর্থাৎ শতের অধিক যে একটি সুষুম্না নাড়ী আছে, তাহা দ্বারা ঊর্দ্ধগামী হইয়া(জীবকে) পুণ্যবশতঃ পুণ্যলোকে আর পাপবশতঃ পাপলোকে(নরকে) লইয়া যায়, আর উভয় দ্বারা অর্থাৎ সমবল পুণ্য ও পাপ-দ্বারা মনুষ্যলোকে লইয়া যায় ॥৩৬।৭৷৷

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

অথ যা তু তত্রৈকশতানাং নাড়ীনাং মধ্যে উর্দ্ধগা সুষুম্নাখ্যা নাড়ী, তয়া একয়া উদ্ধঃ সন্ উদানো বায়ুঃ আপাদতল-মস্তকবৃত্তিঃ সঞ্চরন্ পুণ্যেন কৰ্ম্মণা শাস্ত্র- বিহিতেন পুণ্যং লোকং দেবাদিস্থানলক্ষণং নয়তি প্রাপয়তি; পাপেন তদ্বি- পরীতেন পাপং নরকং তির্য্যগযোন্যাদিলক্ষণম্। উভাভ্যাং সমপ্রধানাভ্যাং পুণ্য- পাপাভ্যামেব মনুষ্যলোকং নয়তীত্যনুবর্ত্ততে ॥৩৬।৭৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

অনন্তর[উদানবায়ুর কার্য্য কথিত হইতেছে]—সেই যে একশত একটি নাড়ীর মধ্যে সুষুম্না নামক একটি ঊর্দ্ধগামিনী নাড়ী, তাহা দ্বারা উদানবায়ু ঊর্দ্ধগামী হইয়া পাদতল হইতে মস্তক পর্য্যন্ত সর্বত্র বিচরণ করতঃ পুণ্য অর্থাৎ শাস্ত্রবিহিত কৰ্ম্ম দ্বারা পুণ্যলোক অর্থাৎ দেবাদির বাসস্থান(স্বর্গাদিলোক) প্রাপ্ত করায়; আর তদ্বিপরীত পাপকর্ম্ম দ্বারা পাপলোক—নরক অর্থাৎ পশু-পক্ষী প্রভৃতি যোনি প্রাপ্ত করায়। উভয় দ্বারা অর্থাৎ পুণ্য ও পাপ উভয়ই সমানভাবে প্রধান হইলে, তদ্দ্বারা মনুষ্যলোক প্রাপ্ত করায়। “নয়তি”(প্রাপ্ত করায়) ক্রিয়াটি সর্ব্বত্র অনুবৃত্ত হইয়াছে ॥ ৩৬ ॥ ৭ ॥

৫৮ প্রশ্নোপনিষৎ।

আদিত্যো হ বৈ বাহ্যঃ প্রাণঃ, উদয়ত্যেষ হেনং চাক্ষুষং প্রাণমনুগৃহ্নানঃ। পৃথিব্যাং যা দেবতা, সৈষা পুরুষস্যাপানমবষ্ট- ভ্যান্তরা যদাকাশঃ স সমানো বায়ুর্ব্যানঃ ॥ ৩৭ ॥ ৮ ॥

[ “কথং বাহ্যমভিধত্তে, কথমধ্যাত্মম্” ইত্যেতয়োঃ প্রশ্নয়োরুত্তরমবশিষ্যতে। তত্র চ “এতদাত্মানং বা প্রবিভজ্য কথং প্রাতিষ্ঠতে,” ইত্যেতস্যোত্তরেণৈব অর্থাৎ প্রাণাদি-পঞ্চবৃত্তিভিরধ্যাত্মমভিধত্তে, ইত্যধ্যাত্মবিষয়কপ্রশ্নস্যোত্তরং সম্পন্নং; তদিদানীং “কথং বাহ্যমভিধত্তে” ইত্যস্যোত্তরমাহ]— “আদিত্যঃ” ইত্যাদিনা।

আদিত্যঃ(সূর্য্যমণ্ডলাভিমানী পুরুষঃ) হ বৈ(ইত্যবধারণে প্রসিদ্ধৌ চ) বাহ্যঃ (অধিদৈবতরূপঃ) প্রাণঃ; হি(যস্মাৎ) এষঃ(আদিত্যঃ) এনং(প্রত্যক্ষগ্রাহ্যম্ অধ্যাত্মং) চাক্ষুষং(চক্ষুষি ভবং) প্রাণম্ অনুগৃহ্নানঃ(আলোকপ্রদানেন অনুগ্রহং কুর্ব্বন্) উদয়তি(উদগচ্ছতি)।[তথা] পৃথিব্যাং(পৃথিব্যভিমানিনী) যা দেবতা, সা এষা(দেবতা) পুরুষস্য(শিরঃপাণ্যাদিমতঃ)অপানম্(অপানবৃত্তিম্) অবষ্টভ্য(স্বশক্ত্যা বশীকৃত্য)[অনুগ্রহং কুর্ব্বতী বর্ততে ইতি শেষঃ]। অন্তরা(দ্বাবা-পৃথিব্যোমধ্যে) যৎ(যঃ) আকাশঃ(আকাশস্থো বায়ুঃ), স সমানঃ(সমানবৃত্তেরনুগ্রাহকঃ),[যশ্চ সাধারণ:] বায়ুঃ,[সঃ ব্যাপকত্বাৎ] ব্যানঃ(ব্যানবৃত্তেরনুগ্রাহকঃ) ॥

প্রসিদ্ধ এই আদিত্যই বাহ্য প্রাণস্বরূপ; যেহেতু আদিত্য এই চাক্ষুষ প্রাণের প্রতি আলোক প্রদান দ্বারা অনুগ্রহ করিয়া উদিত হন। পৃথিবীর অভিমানিনী যে দেবতা,সেই এই দেবতা পুরুষের অপান বৃত্তিকে বশীকৃত করিয়া রহিয়াছেন; আর স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী যে, আকাশ অর্থাৎ আকাশস্থ বায়ু, তাহাই সমান বায়ুর অনুগ্রাহক,[ আর এই যে, সাধারণ] বায়ু,[ ব্যাপকত্ব নিবন্ধন, তাহাই] ব্যান অর্থাৎ ব্যানবায়ুর অনুগ্রহকারক ॥ ৩৭ ॥ ৮

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

আদিত্যো হ বৈ প্রসিদ্ধো হ্যধিদৈবতং বাহ্যঃ প্রাণঃ, স এষ উদয়তি উদ্গচ্ছতি। এষ হি এনম্ আধ্যাত্মিকং চক্ষুষি ভবং চাক্ষুষং প্রাণং প্রকাশেন অনুগৃহ্লানো রূপো- পলব্ধৌ চক্ষুষ আলোকং কুর্ব্বন্নিত্যর্থঃ। তথা পৃথিব্যাম্ অভিমানিনী যা দেবতা প্রসিদ্ধা, সৈষ! পুরুষস্য অপানম্ অপানবৃত্তিম্ অবষ্টভ্য আকৃষ্য বশীকৃত্যাধ এব অপকর্ষ- ণেন অনুগ্রহং কুর্ব্বতী বর্তত ইত্যর্থঃ। অন্যথা হি শরীরং গুরুত্বাৎ পতেৎ, সাবকাশে

প্রশ্নোপনিষৎ। ৫৯

বা উদগচ্ছেৎ। যদেতৎ অন্তরা মধ্যে দ্যাবাপৃথব্যোঃ য আকাশঃ, তৎস্থো বায়ু- রাকাশ উচ্যতে, মঞ্চস্থবৎ। স সমানঃ—সমানমনুগৃহ্বানো বর্ত্তত ইত্যর্থঃ; সমানস্য অন্তরাকাশস্থত্বসামান্যাৎ। ব্যানঃ—সামান্যেন চ যো বাহ্যো বায়ুঃ, স ব্যাপ্তিসামান্যাদ্ ব্যানমনুগৃহ্বানো বর্ত্তত ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৩৭ ॥ ৮ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

প্রসিদ্ধ আদিত্যই বাহ্য অর্থাৎ অবিদৈবত(দেবতাত্মক) প্রাণ; যেহেতু সেই এই(আদিত্য) এই আধ্যাত্মিক চাক্ষুষ অর্থাৎ চক্ষুতে অধিষ্ঠিত প্রাণকে প্রকাশ দ্বারা অনুগৃহীত করতঃ অর্থাৎ রূপদর্শনের নিমিত্ত চক্ষুর আলোক প্রদান করতঃ উদিত হন। সেইরূপ পৃথিবীর অভিমানিনী যে প্রসিদ্ধ দেবতা, সেই এই দেবতা পুরুষের (প্রাণিগণের) অপানবৃত্তিকে অবষ্টব্ধ বা আকৃষ্ট অর্থাৎ বশীকৃত করিয়া(স্ববশে রাখিয়া) অধোদিকেই আকর্ষণ দ্বারা অনুগ্রহ করিয়া বর্তমান আছেন; তাহা না হইলে, নিশ্চয়ই এই শরীর গুরুত্ব বশতঃ অধঃপতিত হইত, না হয় ঊর্দ্ধে উঠিয়া পড়িত,[কিছুতেই স্থির থাকিত না]। আর এই যে, স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী আকাশ; মঞ্চস্থ পুরুষ যেরূপ ‘মঞ্চ’ বলিয়া কথিত হয়, সেইরূপ আকাশস্থ বায়ু ও ‘আকাশ’ বলিয়া কথিত হইয়াছে। সমান বায়ু ও শরীরের মধ্যস্থলে আকাশ থাকে, তৎসাদৃশ্য বশতঃ সেই আকাশস্থ বায়ুই সমান বায়ু সম্বন্ধে অনুগ্রহ করতঃ অবস্থিত আছেন। আর এই যে, সাধারণ বহির্জগতের বায়ু, ব্যাপকত্ব সাদৃশ্য থাকায় তাহাই ব্যান অর্থাৎ ব্যান- বায়ুর প্রতি অনুগ্রহ করতঃ রহিয়াছে ॥ ৩৭ ॥ ৮ ॥

তেজো হ বা * উদানঃ, তস্মাদুপশান্ততেজাঃ, পুনর্ভবমিন্দি- য়ৈৰ্ম্মনসি সম্পদ্যমানৈঃ ॥ ৩৮ ॥ ৯ ॥

হ’ ইত্যবধারণে, ‘বৈ’ প্রসিদ্ধৌ। তেজঃ(লোকপ্রসিদ্ধং তেজঃ এব) উদানঃ(উদানবৃত্তেরনুগ্রাহকঃ); তস্মাৎ(হেতোঃ) উপশান্ততেজাঃ(উপশান্তং

৬০ প্রশ্নোপনিষৎ।

নিবৃত্তং স্বাভাবিকং তেজ উষ্মা যস্য, সঃ) মনসি(মনোবৃত্তৌ) সম্পদ্যমানৈঃ(তদধী- নতামাপদ্যমানৈঃ) ইন্দ্রিয়ৈ:(বাগাদিভিঃ সহ) পুনর্ভবং(পুনর্জন্ম, তৎকারণীভূতং মৃত্যুং[প্রাপ্নোতি, ইতি শেষঃ] ॥

লোকপ্রসিদ্ধ তেজই উদানবায়ু; এজন্য, উপশান্ততেজাঃ(যাহার শরীরগত উষ্ণতা বিলুপ্ত হইয়া যায়) সেই লোক মনেতে বিলীন বা মনোবৃত্তির অধীনতা- প্রাপ্ত ইন্দ্রিয় সমূহের সহিত পুনর্জন্ম বা তৎকারণীভূত মৃত্যু প্রাপ্ত হয় ॥ ৩৮ ॥ ৯॥ শাঙ্কর-ভাষ্যম।

যদ্বাহ্যং হ বৈ প্রসিদ্ধং সামান্যং তেজঃ, তচ্ছরীরে উদানঃ-উদানং বায়ুমনু- গৃহ্লাতি-স্বেন প্রকাশেনেত্যভিপ্রায়ঃ। যস্মাৎ তেজঃস্বভাবো বাহ্যতেজোহমু- গৃহীত উৎক্রান্তিকর্তা, তস্মাদ্যদা লৌকিকঃ পুরুষ উপশান্ততেজা ভবতি; উপ- শান্তং স্বাভাবিকং তেজো যস্য সঃ, তদা তং ক্ষীণায়ুষং মুমূর্ষুং বিদ্যাৎ। স পুনর্ভবং শরীরান্তরং প্রতিপদ্যতে। কথম্? সহেন্দ্রিয়ৈৰ্ম্মনসি সম্পদ্যমানৈঃ প্রবিশদ্ভি- র্ব্বাগাদিভিঃ ॥ ৩৮ ॥ ৯ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

জগতে লোকপ্রসিদ্ধ যে, সাধারণ তেজঃ, তাহাই শরীরমধ্যে উদান; অভিপ্রায় এই যে, স্বীয় প্রকাশ দ্বারা তাহাই শরীরস্থ উদানবায়ুকে অনুগৃহীত করে; যেহেতু উৎক্রমণের কর্তা * উদানবায়ু স্বভাবতই তেজঃস্বরূপ এবং বাহ্যতেজঃ দ্বারা অনুগৃহীত; সেই হেতু,সাধারণ লোক যখন উপশান্ততেজা হয়, অর্থাৎ তাহার স্বাভাবিক তেজঃ বা উষ্মা যখন নষ্ট হইয়া যায়; তখন তাহাকে ক্ষীণায়ু মুমুর্ষু বলিয়া বুঝিতে হয়। সে পুনর্ভব অর্থাৎ শরীরান্তর প্রাপ্ত হয়; কি প্রকারে?—মনে সম্পদ্য- মান—প্রবিষ্ট বাক্ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণের সহিত ণ ॥ ৩৮ ॥ ৯ ॥

প্রশ্নোপনিষৎ। ৬১

যচ্চিত্তস্তেনৈষ প্রাণমায়াতি প্রাণস্তেজসা যুক্তঃ। সহাত্মনা যথাসঙ্কল্পিতং লোকং নয়তি ॥ ৩৯ ॥ ১০ ॥

এষঃ(জীবঃ)[মরণকালে] যচ্চিত্তঃ(যস্মিন্ শুভে অশুভে বা বিষয়ে চিত্তং অন্তঃকরণং যস্য, স তথোক্তঃ) ভবতি; তেন চিত্তেন(চিত্তজাত-সংকল্পেন, তৎসাধনৈরিন্দ্রিয়ৈশ্চ সহিতঃ সন্) প্রাণং(মুখ্যপ্রাণং) আয়াতি;[তদা ইন্দ্রিয়বৃত্তি- শূন্যঃ সন্ তিষ্ঠতীত্যাশয়ঃ]। প্রাণঃ তেজসা(উদানবায়ুবৃত্ত্যা উষ্মণা) যুক্তঃ সন্ আত্মনা(ভোক্তা জীবেন) সহ যথাসংকল্পিতং(চিন্তানুরূপং) লোকং স্বর্গনরকাদি- রূপং স্থানং) নয়তি(জীবং প্রাপয়তীত্যর্থঃ)। যদ্বা, আত্মনা স্বেন প্রাণেন সহ [জীবং] নয়তি, জীবেন সহ স্বয়মপি গচ্ছতীত্যাশয়ঃ]।

মরণসময়ে জীবের চিত্ত যে বিষয়ে[আসক্ত] থাকে, এই জীব সেই চিত্তের সহিত মুখ্যপ্রাণকে প্রাপ্ত হয়; মুখ্যপ্রাণ আবার তেজোযুক্ত হইয়া অর্থাৎ উদানবৃত্তির সহিত সম্মিলিত হইয়া, জীবকে জীবাত্মার সহিত সংকল্পানুযায়ী লোকে অর্থাৎ অভীষ্ট লোকে লইয়া যায় ॥ ৩৯ ॥ ১০॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

মরণকালে যচ্চিত্তো ভবতি, তেনৈষ জীবঃ চিত্তেন সঙ্কল্পেন ইন্দ্রিয়ৈঃ সহ প্রাণং মুখ্যপ্রাণবৃত্তিমায়াতি। মরণকালে ক্ষীণেন্দ্রিয়বৃত্তিঃ সন্ মুখ্যয়া প্রাণবৃত্ত্যৈব অব- তিষ্ঠত ইত্যর্থঃ। তদা হি বদন্তি জ্ঞাতয়:-উচ্ছসিতি জীবতীতি। স চ প্রাণ- স্তেজসা উদানবৃত্ত্যা যুক্তঃ সন্ সহাত্মনা স্বামিনা ভোক্তা, স এবমুদানবৃত্ত্যৈব যুক্তঃ প্রাণস্তং ভোক্তারং পুণ্যপাপকৰ্ম্মবশাদ যথাসঙ্কল্লিতং যথাভিপ্রেতং লোকং নয়তি প্রাপয়তি ॥ ৩৯ ॥ ১০ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

[জীব] মৃত্যুসময়ে যেরূপ চিত্তযুক্ত হয়, এই জীব সেই চিত্তের সহিত অর্থাৎ(চিত্তজাত) সঙ্কল্প ও তৎসাধন ইন্দ্রিয়গণের সহিত প্রাণকে—মুখ্যপ্রাণের বৃত্তিকে প্রাপ্ত হয়; অর্থাৎ মরণকালে ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া ক্ষীণ হইয়া যায়, কেবল মুখ্যপ্রাণের বৃত্তিই বর্তমান থাকে। তখন জ্ঞাতিগণ বলিয়া থাকেন যে,[এখনও] উচ্ছ্বসিত—জীবিত আছে। সেই প্রাণ আবার তেজের সহিত—উদানবায়-বৃত্তির(উষ্মার)

৬২ প্রশ্নোপনিষৎ।

সহিত সংযুক্ত হইয়া, আত্মার সহিত ভোক্তা-প্রভুর সহিত[সম্মিলিত হয়], সেই প্রাণ এইরূপে উদানবৃত্তিযুক্ত হইয়া পুণ্য ও পাপ কর্মানু- সারে সেই ভোক্তার যথাসংকল্পিত অর্থাৎ জীবের অভিপ্রায়ানুযায়ী লোকে লইয়া যায় * ॥ ৩৯ ॥ ১০ ॥

য এবং বিদ্বান্ প্রাণং বেদ; ন হাস্য প্রজা হীয়তে; অমৃতো ভবতি। তদেষ শ্লোকঃ ॥ ৪০ ॥ ১১ ॥

[প্রাণ-বিজ্ঞানস্য ফলমাহ] -য এবমিতি। যঃ বিদ্বান্(জ্ঞানী) এবং(উক্ত- প্রকারেণ) প্রাণং বেদ(বিজানাতি); অন্য(প্রাণবিদুষঃ) প্রজা(সন্ততিঃ) নহ(নৈব) হীয়তে(বিচ্ছিন্যতে)।[মরণোত্তরং চ সঃ] অমৃতঃ(মরণরহিতঃ প্রাণসাধর্ম্মযুক্তঃ) ভবতি। তৎ(তস্মিন্ বিষয়ে) এষঃ(বক্ষ্যমাণপ্রকারঃ) শ্লোকঃ (সংক্ষিপ্তার্থং বাক্যম্)[অস্তীতি শেষঃ ॥]

যে বিদ্বান্ এই প্রকারে প্রাণকে জানে, তাহার প্রজা(সন্তান) কখনই বিচ্ছিন্ন হয় না, অর্থাৎ তাহার বংশলোপ হয় না। তিনি নিজে অমৃতত্ব লাভ করেন। এ বিষয়ে এই শ্লোক আছে ॥ ৪০ ॥ ১১ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

যঃ কশ্চিৎ এবং বিদ্বান্ যথোক্তবিশেষণৈর্বিশিষ্টমুৎপত্যাদিভিঃ প্রাণং বেদ জানাতি, তস্যেদং ফলমৈহিকমামুষ্মিকঞ্চ উচ্যতে—ন হ অস্য নৈবাস্য বিদুষঃ প্রজা পুত্রপৌত্রাদিলক্ষণা হীয়তে ছিদ্যতে। পতিতে চ শরীরে প্রাণসাজুষ্যতয়া অমৃতঃ অমরণধৰ্ম্মা ভবতি। তৎ এতস্মিন্নর্থে সঙ্ক্ষেপাভিধায়ক এষ শ্লোকো মন্ত্রো ভবতি ॥ ৪০ ॥ ১১ ॥

* ছান্দোগ্যোপনিষদে উপক্রমণ-প্রণালী এইরূপে বর্ণিত হইয়াছে- ‘অথাস্য প্রযতঃ পুরুষস্য বাক্ মনসি সম্পদ্যতে, মনঃ প্রাণে, প্রাণ স্তেজসি, তেজঃ পরস্যাং দেবতায়াম্।”[৬।৮।৬] অর্থাৎ মৃত্যুকাল উপস্থিত হইলে পুরুষের প্রথমতঃ বাগিন্দ্রিয় মনে, মনঃ প্রাণে, প্রাণ দৈহিক তেজে এবং সেই তেজঃ পরদেবতা আত্মাতে বিলয়প্রাপ্ত হয়। এখানে ইন্দ্রিয়-লয় অর্থে- ইন্দ্রিয়ের বৃত্তি লয় বুঝিতে হইবে। অভিপ্রায় এই যে, মুমূর্ষু ব্যক্তির প্রথমেই বাগিন্দ্রিয়ের ক্রিয়া বিলুপ্ত হইয়া যায়, তখন কথা বলিতে পারে না, কিন্তু মনঃ তখনও চিন্তা করিতে-নিজের সুখ দুঃখ অনুভব করিতে থাকে; পরে মনেরও ক্রিয়াশক্তি লুপ্ত হইয়া যায়, কিন্তু তখনও প্রাণের ক্রিয়া দেহস্পন্দন বর্তমান থাকে; তাহাও যখন বিলুপ্ত হইয়া যায়, তখনও দৈহিক তেজ উষ্মা বিদ্যমান থাকে; অবশেষে সেই তেজঃ আত্মাকে আশ্রয় করে, তখন আত্মা দেহ ত্যাগ করিয়া নির্গত হয়।

প্রশ্নোপনিষৎ। ৬৩

ভাষ্যানুবাদ।

যে কোনও বিদ্বান্ লোক পূর্ব্বোক্ত উৎপত্তিপ্রভৃতি বিশেষণ- বিশিষ্টরূপে প্রাণকে জানেন, তাঁহার ঐহিক ও আমুষ্মিক(পারলৌকিক) এইরূপ ফল কথিত হইতেছে—এই বিদ্বান্ ব্যক্তির প্রজা—পুত্র- পৌত্রাদি সন্তান নিশ্চয়ই হীন বা বিচ্ছিন্ন হয় না, এবং প্রাণ সাম্যলাভ করায় দেহপাতের পর[তিনি] অমৃত মরণরহিত হন। সেই এই বিষয়ে সংক্ষেপে অর্থপ্রকাশক এই শ্লোক বা মন্ত্র আছে—॥ ৪০ ॥ ১১ ॥

উৎপত্তিমায়তিং স্থানং বিভুত্বঞ্চৈব পঞ্চধা। অধ্যাত্মঞ্চৈব প্রাণস্য বিজ্ঞায়ামৃতমশ্নুতে ॥ বিজ্ঞায়ামৃতমশ্নুতইতি ॥ ৪১ ॥১২॥ ইত্যথর্ববেদীয়-প্রশ্নোপনিষদি তৃতীয়ঃ প্রশ্নঃ ॥ ৩ ॥

[তমেব শ্লোকমাহ]—উৎপত্তিমিত্যাদি। উৎপত্তিং(প্রাণস্য—আগমনং জন্ম), আয়তিং(আয়াতিম্ আগমনং), স্থানং(পায়ুপ্রভৃতিস্থানেষু স্থিতিং), বিভুত্বং, (ব্যাপকত্বং),[বাহ্যং সূর্য্যাদিরূপেণ] অধ্যাত্মং চ(চক্ষুরাদিরূপেণ) পঞ্চধা এব(পঞ্চপ্রকারৈরেব অবস্থানং) বিজ্ঞায়(বিশেষেণ জ্ঞাত্বা) অমৃতং(অমরণ- ভাবং) অশ্নুতে(লভতে)।[অধ্যায়সমাপ্তৌ দ্বিরুক্তিঃ]॥

ইতি প্রশ্নোপনিষদ্-ব্যাখ্যায়াং সরলায়াং তৃতীয়ঃ প্রশ্নঃ ॥

[উপাসক] প্রাণের উৎপত্তি, আগমন, স্থিতি, বিভুত্ব এবং বাহ্য ও অধ্যাত্ম- ভেদে পঞ্চপ্রকারে অবস্থিতি জানিয়া অমৃত ভোগ করেন॥ ইতি তৃতীয় প্রশ্ন॥ শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

উৎপত্তিং পরমাত্মনঃ প্রাণস্য আয়তিম্ আগমনং মনোকৃতেন অস্মিন্ শরীরে, স্থানং স্থিতিঞ্চ পায়ুপস্থাদিস্থানেষু, বিভুত্বং চ স্বাম্যমেব সম্রাডিব প্রাণবৃত্তিভেদানাং পঞ্চধা স্থাপনম্। বাহ্যামাদিত্যাদিরূপেণাধ্যাত্মঞ্চৈব চক্ষুরাদ্যাকারেণাবস্থানং, বিজ্ঞায় এবং প্রাণম্ অমৃতম্ অশ্বুতে ইতি। বিজ্ঞায়ামৃতমশ্নুত ইতি দ্বির্বচনং প্রশ্নার্থপরিসমাপ্ত্যর্থম্ ॥ ৪১ ॥ ১২ ॥

ইতি শ্রীমচ্ছঙ্কর-ভগবতঃ কৃতৌ প্রশ্নোপনিষদ্ভাষ্যে তৃতীয়ঃ প্রশ্নঃ ॥ ৩ ॥

৬৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

ভাষ্যানুবাদ।

উৎপত্তি অর্থাৎ পরমাত্মা হইতে প্রাণের জন্ম, আয়তি অর্থাৎ মনের দ্বারা সম্পাদিত(ধর্মাধৰ্ম্মফলে) এই শরীরে আগমন, স্থান— পায়ু ও উপস্থাদি স্থানে অবস্থান, এবং বিভুত্ব বা প্রভুত্ব, অর্থাৎ সম্রাটের ন্যায় প্রাণের বৃত্তিভেদরূপী অপানাদি বায়ুকে পাঁচপ্রকারে স্থাপন; আর বাহ্য আদিত্যাদিরূপে এবং অধ্যাত্ম-চক্ষুরাদি আকারে অবস্থান।[জীব] প্রাণকে এই প্রকারে জানিয়া অমৃত ভোগ করেন, ইতি। প্রশ্নার্থ পরিসমাপ্তিসূചനার্থ “বিজ্ঞায় অমৃতমশ্নুতে” এই দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে ॥ ৪১ ॥ ১২ ॥

ইতি তৃতীয় প্রশ্নের ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত।

প্রশ্নোপনিষৎ।

-

অথ চতুর্থঃ প্রশ্নঃ।

অথ হৈনঃ সৌৰ্য্যায়ণী গার্গ্যঃ পপ্রচ্ছ—ভগবন্নেতস্মিন্ পুরুষে কানি স্বপন্তি? কান্যস্মিন্ জাগ্রতি? কতর এষ দেবঃ স্বপ্নান্ পশ্যতি? কস্যৈতৎ সুখং ভবতি? কস্মিন্নু সর্ব্বে সংপ্রতিষ্ঠিতা ভবন্তীতি ॥ ৪২ ॥ ১ ॥

[ অতীতেন প্রশ্নত্রয়েণ অপরবিদ্যাবিষয়ং সংসারং নিরূপ্য সম্প্রতি পর- বিদ্যাধিগম্যং শিবং শান্তং পুরুষং বক্তুমুপক্রমতে অথেত্যাদিনা।]—অথ(অপর- বিদ্যাবিষয়ক-প্রশ্নসমাপ্ত্যনন্তরং) গার্গ্যঃ সৌৰ্য্যায়ণী হ(ঐতিহ্যসূচকং) এনং (পিপ্পলাদং) পপ্রচ্ছ—হে ভগবন্!(পূজ্য!) এতস্মিন্(প্রত্যক্ষগোচরে) পুরুষে(হস্ত-মস্তকাদি-সমন্বিতে দেহে) কানি(করণানি) স্বপন্তি(স্ব-স্ব- ব্যাপারেভ্য: বিরমন্তে? কানি(করণানি) জাগ্রতি?(অব্যাহতব্যাপারা- স্তিষ্ঠন্তি?) এষঃ[কার্য্য-করণয়োমধ্যে] কতরঃ(কো নাম) দেবঃ স্বপ্নান্ পশ্যতি? কস্য এতৎ লোকপ্রসিদ্ধং সুখং ভবতি? কস্মিন্ উ(অপি) সর্ব্বে সম্যক্ প্রতিষ্ঠিতাঃ(একীভূতাঃ) ভবন্তি ইত্যর্থঃ ॥

অনন্তর গর্গবংশীয় সৌৰ্য্যায়ণী ইঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—ভগবন্ এই[ হস্ত- পদাদিযুক্ত] পুরুষে(দেহের মধ্যে) কাহারা নিদ্রা যায়? এই পুরুষে কাহারা জাগ্রৎ থাকে? এবং কোন দেবতা স্বপ্ন দর্শন করে? এই সুখানুভূতিই বা কাহার হয়? এবং সকলে কাহার উপর প্রতিষ্ঠিত আছে? ॥ ৪২ ॥ ১ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

অথ হৈনং সৌৰ্য্যায়ণী গার্গ্যঃ পপ্রচ্ছ-প্রশ্নত্রয়েণ অপরবিদ্যাগোচরং সর্ব্বং পরিসমাপ্য সংসারং ব্যাকৃতবিষয়ং সাধ্য-সাধনলক্ষণম্ অনিত্যম্। অথেদানীম্ অসাধনলক্ষণম্ * অপ্রাণম্ অমনোগোচরম্ অতীন্দ্রিয়ম্ অবিষয়ং শিবং শান্তম্

* সাধ্যসাধনবিলক্ষণমিতি বা পাঠঃ

৬৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

অবিকৃতম্ অক্ষরং সত্যং পরবিদ্যাগম্যং পুরুষাখ্যং সবাহ্যাভ্যন্তরম্ অজং বক্তব্যম্, ইত্যুত্তরং প্রশ্নত্রয়মারভ্যতে।

তত্র সুদীপ্তাদিবাগ্নের্যস্মাৎ পরস্মাদক্ষরাৎ সর্ব্বে ভাবা বিস্ফুলিঙ্গা ইব জায়ন্তে, তত্রৈব অপিযন্তীত্যুক্তম্ দ্বিতীয়ে মুণ্ডকে। কে তে সর্ব্বে ভাবা অক্ষরাদ্বিস্ফুলিঙ্গা ইব বিভজ্যন্তে? কথং বা বিভক্তাঃ সন্তস্তত্রৈবাপিযন্তি? কিংলক্ষণং বা তদক্ষরম্? ইতি, এতদ্বিবক্ষয়া অধুনা প্রশ্নানুদ্ভাবয়তি—

ভগবন্! এতস্মিন্ পুরুষে শিরঃপাণ্যাদিমতি কানি করণানি স্বপন্তি স্বাপং কুর্ব্বন্তি স্বব্যাপারাদুপরমন্তে? কানি চাস্মিন্ জাগ্রতি জাগরণমনিদ্রাবস্থাব্যাপারং কুর্ব্বন্তি স্বব্যাপারান্ কুর্ব্বন্তীত্যর্থঃ। কতরঃ কার্য্য-করণলক্ষণয়োঃ এষ দেবঃ স্বপ্নান্ পশ্যতি? স্বপ্নো নাম জাগ্রদ্দর্শনান্নিবৃত্তস্য জাগ্রদৎ অন্তঃশরীরে যদর্শনম্। তৎ কিং কার্য্যলক্ষণেন দেবেন নির্বর্ত্যতে, কিংবা করণলক্ষণেন কেনচিৎ? ইত্যভিপ্রায়ঃ। উপরতে চ জাগ্রৎ-স্বপ্নব্যাপারে যৎ প্রসন্নং নিরায়াসলক্ষণম্ অনাবাধং সুখং, কস্য এতদ্ভবতি? তস্মিন্ কালে জাগ্রৎ-স্বপ্নব্যাপারাদুপরতাঃ সন্তঃ কস্মিন্ উ সর্ব্বে সম্যগেকীভূতাঃ সম্প্রতিষ্ঠিতাঃ। মধুনি রসবৎ, সমুদ্রপ্রবিষ্টনদ্যাদিবচ্চ বিবেকানহাঃ প্রতিষ্ঠিতা ভবন্তি, সঙ্গতাঃ সম্প্রতিষ্ঠিতা ভবন্তীত্যর্থঃ।

ননু ন্যস্তদাত্রাদিকরণবৎ স্বব্যাপারাদুপরতানি পৃথক্ পৃথগেব স্বাত্মন্যবতিষ্ঠন্ত- ইত্যেতদ্ যুক্তং, কুতঃ প্রাপ্তিঃ সুযুপ্তপুরুষাণাং করণানাং কস্মিংশ্চিদেকীভাবগমনা- শঙ্কায়াঃ প্রষ্টুঃ? যুক্তৈব তু আশঙ্কা; যতঃ সংহতানি করণানি স্বাম্যর্থানি পর- তন্ত্রাণি চ জাগ্রদ্বিষয়ে, তস্মাৎ স্বাপেহপি সংহতানাং পারতন্ত্র্যেণৈব কস্মিংশ্চিৎ সঙ্গতির্ন্যায্যেতি। তস্মাদাশঙ্কালুরূপ এব প্রশ্নোহয়ম্—অত্র তু কার্য্যকরণসঙ্ঘাতো যস্মিংশ্চ প্রলীনঃ সুষুপ্ত-প্রলয়কালয়োঃ, তদ্বিশেষং বুভুৎসোঃ স কো নু স্যাদিতি কস্মিন্ সর্ব্বে সম্প্রতিষ্ঠিতা ভবন্তীতি ॥ ৪২ ॥ ১॥

ভাষ্যানুবাদ।

অনন্তর গর্গবংশীয় সৌৰ্য্যায়ণী ইঁহাকে(পিপ্পলাদকে) প্রশ্ন করিলেন—প্রথম প্রশ্নত্রয়ে(অতীত তিন পরিচ্ছেদে) স্থূলবিষয়ক সাধ্য-সাধন লক্ষণান্বিত, অবিদ্যাধীন, অনিত্য সংসারের বিষয় সমস্ত পরি- সমাপ্ত করিয়া এখন অসাধনাত্মক, প্রাণ ও মনের অবিষয়—অতীন্দ্রিয়,

প্রশ্নোপনিষৎ। ৬৭

মঙ্গলময়, শান্ত, জন্মরহিত এবং পরবিদ্যাগম্য সত্যস্বরূপ অক্ষয় পুরুষকে বাহ্য ও আভ্যন্তর সর্ব্বপদার্থের সহিত বলা আবশ্যক; এই জন্য পরবর্তী প্রশ্নত্রয় আরব্ধ হইতেছে—

তন্মধ্যে, দ্বিতীয় মুণ্ডকে কথিত আছে যে, সুদীপ্ত অগ্নি হইতে যেমন স্ফুলিঙ্গসমূহ নিঃসৃত হয়, তেমনি যে পরম অক্ষর(পরমেশ্বর) হইতে সর্ব্বপদার্থ জন্মলাভ করে; সেই অক্ষর হইতে বিভক্ত পদার্থ- সমূহ কে কে? কিরূপেই বা বিভক্ত হইয়া তাহাতে বিলীন হয়? এবং সেই অক্ষরের লক্ষণই বা কিরূপ? এতৎ সমস্ত বিষয় বলিবার ইচ্ছায় প্রশ্নসমূহের উদ্ভাবন করিতেছেন,—

ভগবন্! এই হস্ত-মস্তকাদিযুক্ত পুরুষে কোন্ কোন্ করণ(ইন্দ্রি- য়াদি) শয়ন করে—নিদ্রা যায় অর্থাৎ স্বীয় ব্যাপার হইতে বিরত হয়? এবং কাহারাই বা ইহাতে জাগিয়া থাকে, অনিদ্রাবস্থায় নিজনিজ ব্যাপার- রূপ জাগরণ করে, অর্থাৎ স্বীয় কার্য্য সম্পাদন করিয়া থাকে? কার্য্য ও করণ, এতদুভয়ের মধ্যে কোন দেবতাটি স্বপ্ন দর্শন করে? অভিপ্রায় এই যে, স্বপ্ন অর্থ—জাগরণাবস্থা, ইহাতে বিরত হইয়া যে, জাগ্রদবস্থার ন্যায় শরীরাভ্যন্তরে দর্শন ন্যায়; সেই দর্শন কার্য্যটি কি কোনও কাৰ্য্যা- ত্মক দেবতাকর্তৃক সম্পাদিত হয়? কিংবা কোনও কারণাত্মক দেবতা- কর্তৃক? অর্থাৎ জাগ্রৎ ও স্বপ্নব্যাপার বিনিবৃত্ত হইলে পর যে, নির্ব্যা- পাররূপ বিমল অব্যাহত সুখানুভূতি, এই সুখ কাহার হয়? সেই সময়ে জাগ্রৎ ও স্বপ্নব্যাপার হইতে নিবৃত্ত হইয়া(করণবর্গ) সকলেই সম্পূর্ণ- রূপে একীভূত হইয়া কাহাতে অবস্থিতি করে? অর্থাৎ মধুতে[অন্যান্য] রসের ন্যায় এবং সমুদ্রে প্রবিষ্ট নদীসমূহের ন্যায় বিবেকের অযোগ্যভাবে (অপৃথক্ত্বাবে) প্রতিষ্ঠিত—সঙ্গত বা সম্যক্ অবস্থিত হয়?

এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, দাত্র(দা) প্রভৃতি করণ-বস্তু পরিত্যক্ত হইয়া যেরূপ পৃথক্ পৃথকভাবে অবস্থান করে, তদ্রূপ স্ব-স্ব ব্যাপার হইতে বিরত করণবর্গেরও ত পৃথকভাবে অবস্থিতিই যুক্তিসঙ্গত হয়,

৬৮ প্রশ্নোপনিষৎ।

সুতরাং সুষুপ্ত পুরুষের করণবর্গের কোনও পুরুষে একীভাব-প্রাপ্তি- সম্বন্ধে প্রশ্নকর্তার আশঙ্কার কারণ কি?[না-] আশঙ্কা যুক্তিসঙ্গতই হইয়াছে; কারণ, যেহেতু সংহত বা সম্মিলিত করণবর্গ(জাগ্রৎ-সময়ে স্বামীর প্রয়োজন-সাধনে তৎপর ও পরাধীন(স্বামীর অধীন) থাকে; সেই হেতু স্বপ্নসময়েও করণবর্গের পরাধীনভাবেই কোন স্থানে সম্মিলিত ভাবে থাকা ন্যায্য; অতএব, উক্ত প্রশ্নটি আশঙ্কার অনুরূপই হইয়াছে; অধিকন্তু, এখানে সুষুপ্তি ও প্রলয়সময়ে কার্য্য দেহ বা প্রাণ, এবং করণ মনঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয় যাঁহাতে বিলীন হয়, তদগত বিশেষ ভাব জিজ্ঞাসার অভিপ্রায়েই তিনি কে হন? কাহার মধ্যে সকলে একীভূত হইয়া অবস্থিত হয়?[এই প্রশ্ন হইয়াছে],[কিন্তু প্রতিষ্ঠাবিশিষ্ট আত্মার কথা জিজ্ঞাসিত হয় নাই] ॥ ৪২ ॥ ১ ॥

তস্মৈ স হোবাচ-যথা গার্গ্য! মরীচয়োহর্কস্যাস্তং গচ্ছতঃ সর্ব্বা এতস্মিংস্তেজোমণ্ডল একীভবন্তি। তাঃ পুনঃ পুনরুদয়তঃ প্রচরন্তি; এবং হ বৈ তৎ সর্ব্বং পরে দেবে মনস্যেকীভবতি। তেন তর্য্যেষ পুরুষো ন শূণোতি, ন পশ্যতি, ন জিঘ্রতি, ন রসয়তে, ন স্পৃশতে, নাভিবদতে, নাদত্তে, নানন্দয়তে, ন বিসৃজতে, নেয়ায়তে, স্বপিতীত্যাচক্ষতে ॥৪৩৷৷২৷৷ [মনঃপ্রাণতিরিক্তানি, সর্ব্বানি করণানি স্বপন্তি, ইত্যাখ্যাতুং দৃষ্টান্তপুরঃসমমাহ]- তস্মৈ ইতি। সঃ(আচার্য্যঃ) তস্মৈ(গার্গ্যায়) উবাচ(উক্তবান্)-হ(পুরা- বৃত্তত্বসূচকং); হে গার্গ্য! যথা অস্তং গচ্ছতঃ(লোক-লোচনপথম্ অতিক্রামতঃ) অর্কস্য(সূর্য্যস্য):সর্ব্বা মরীচয়ঃ(কিরণাঃ) এতস্মিন্(প্রত্যক্ষার্হে) তেজো- মণ্ডলে একীভবন্তি; পুনঃ উদয়তঃ(উদগচ্ছতঃ সতঃ)[অর্কস্য] তাঃ(মরীচয়ঃ) [অপি] পুনঃ প্রচরন্তি(সর্বত্র প্রসরন্তি)। এবং(দৃষ্টান্তানুরূপং) হ(এব) তৎ বৈ(প্রসিদ্ধৌ) তং(বাগাদিকং) সর্ব্বং(করণং) পরে(উৎকৃষ্টে) দেবে (দ্যোতমানে) মনসি(অন্তঃকরণে অর্কস্থানীয়ে) একীভবতি। তেন(একী- ভাবগমনেন হেতুনা) তর্হি(তদা) এষঃ(প্রত্যক্ষঃ) পুরুষঃ(প্রাণী) ন

প্রশ্নোপনিষৎ। ৬৯

শৃণোতি[শব্দং], ন পশ্যতি,[রূপং], ন জিঘ্রতি(গন্ধগ্রহণং ন করোতি) ন রসয়তে(রসং ন গৃহ্লাতি), ন স্পৃশতে(স্পর্শং নানুভবতি), ন অভিবদতে (বাচং উচ্চারয়তি), ন আদত্তে(বস্তুগ্রহণং ন করোতি), ন আনন্দয়তে (আনন্দং নানুভবতি), ন বিসৃজতে(ন ত্যজতি পুরীষাদিকং), ন ইয়ায়তে(ন চলতি),[অপিতু] স্বপিতি(শয়নং করোতি) ইতি আচক্ষতে(কথয়ন্তি) [লোকাইতি শেষঃ]। স্বাপসময়ে শ্রোত্র-চক্ষুর্ঘাণরসনত্বগ্ বাগ্-হস্তোপস্থপায়ু- পাদাখ্যানি দশ ইন্দ্রিয়াণি স্ব-স্ব-ব্যাপারেভ’ উপরতানি ভবন্তীত্যাশয়ঃ] ॥

তিনি(পিপ্পলাদ) তাহার উদ্দেশে বলিলেন—হে গার্গ্য! সূর্য্য অস্তগমন করিবার সময়ে সূর্য্য-কিরণসমূহ যেরূপ এই তেজোমণ্ডলে(সূর্য্যমণ্ডলে) একীভূত হয়, [এবং] পুনশ্চ সূর্য্য উদিত হইলে তাহারাও পুনর্ব্বার চতুর্দ্দকে প্রসূত হয়; তদ্রূপ সেই সমস্ত বাগাদি করণও শ্রেষ্ঠ দেবতা মনে একীভাব প্রাপ্ত হয়; সেই কারণেই তখন এই পুরুষ(প্রাণী) শ্রবণ করে না, দর্শন করে না, ঘ্রাণ করে না, রসাস্বাদন করে না, স্পর্শানুভব করে না, কথা বলে না, গ্রহণ করে না, আনন্দানুভব করে না, পুরীষ ত্যাগ করে না, গমন করে না;[পরন্তু][তখন তাহাকে লোকে] ‘স্বপিতি’ অর্থাৎ নিদ্রা যাইতেছে, বলিয়া থাকে ॥ ৪৩॥ ২॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

তস্মৈ স হ উবাচ আচার্য্যঃ,-শৃণু হে গার্গ্য যৎ ত্বয়া পৃষ্টম্। যথা মরীচয়ঃ রশ্ময়ঃ অর্কস্য আদিত্যস্য অস্তম্ অদর্শনং গচ্ছতঃ সর্ব্বা অশেষত এতস্মিন্ তেজো- মণ্ডলে তেজোরাশিরূপে একীভবন্তি বিবেকানহত্বম্ অবিশেষতাংগচ্ছন্তি; তা মরীচয়- স্তস্যৈব অর্কস্য পুনঃপুনঃ উদয়ত উদ্গচ্ছতঃ প্রচরন্তি বিকীর্যন্তে। যথাহয়ং দৃষ্টান্তঃ, এবং হ বৈ তৎ সর্ব্বং বিষয়েন্দ্রিয়াদিজাতং পরে প্রকৃষ্টে দেবে দ্যোতনবতি মনসি চক্ষুরাদিদেবানাং মনস্তন্ত্রত্বাৎ পরো দেবো মনঃ, তস্মিন্ স্বপ্নকালে একীভবতি- মণ্ডলে মরীচিবৎ অবিশেষতাং গচ্ছতি। জিজাগরিযোশ্চ রশ্মিবন্মণ্ডলাৎ মনস এব প্রচরন্তি স্বব্যাপারায় প্রতিষ্ঠন্তে। যস্মাৎ স্বপ্নকালে শ্রোত্রাদীনি শব্দাদ্যপলব্ধি- করণানি মনসি একীভূতানীব করণব্যাপারাদুপরতানি, তেন তস্মাৎ তর্হি তস্মিন্ স্বাপকালে এষ দেবদত্তাদিলক্ষণঃ পুরুষো ন শৃণোতি ন পশ্যতি ন জিঘ্রতি ন রসয়তে ন স্পৃশতে নাভিবদতে নাদত্তে নানন্দয়তে ন বিসৃজতে ন ইয়ায়তে, স্বপিতি ইত্যাচক্ষতে লৌকিকাঃ ॥ ৪৩ ॥ ২॥

৭০ প্রশ্নোপনিষৎ।

ভাষ্যানুবাদ।

সেই আচার্য্য তাহার উদ্দেশে বলিলেন,-হে গার্গ্য! তুমি যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছ, তাহা শ্রবণ কর। যেরূপ অস্ত-অদর্শনগামী আদিত্যের সমস্ত মরীচি অর্থাৎ রশ্মিসমূহ এই তেজোমণ্ডলে- তেজোরাশিতে একীভূত হয়, অর্থাৎ বিবেকের(পৃথক্ করিবার) অযোগ্যতা বা অবিশেষভাব প্রাপ্ত হয়; সেই সূর্য্যেরই বারংবার উদয়- কালে আবার সেই কিরণসমূহ প্রচারিত হয়-বিকীর্ণ হয়। এই দৃষ্টান্তটি যেরূপ, ঠিক এইরূপই স্বপ্নসময়ে সেই সমস্ত বিষয়গ্রাহী ইন্দ্রিয়নিচয়ও পর-উৎকৃষ্ট, দেব-দ্যোতমান মনে একীভাব লাভ করে,-তেজোমণ্ডলে মরীচির ন্যায় অবিশেষভাব প্রাপ্ত হয়[পরস্পরের মধ্যে কিছুমাত্র পার্থক্য থাকে না]। চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণ মনের অধীন; এই কারণে মন ‘পর দেবতা’ পদবাচ্য। জাগরণেচ্ছু পুরুষের অর্থাৎ পুরুষের জাগ্রৎ হইবার সময়ে, করণসমূহ তেজোমণ্ডল হইতে রশ্মির ন্যায় মন হইতেই আবার নিজ নিজ ব্যাপারের উদ্দেশে বহির্গত হয়। যেহেতু স্বপ্নসময়ে শব্দাদি বিষয়ের উপলব্ধি-সাধন শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়সমূহ মনে একীভাব প্রাপ্ত হইয়াই যেন করণোচিত ব্যাপার হইতে বিরত হইয়া থাকে; সেই হেতুই সেই স্বপ্নসময়ে এই দেবদত্তাদি নামক পুরুষ শ্রবণ করে না, দর্শন করে না, আঘ্রাণ করে না, রসানু- ভব করে না, স্পর্শানুভব করে না, কথা বলে না, গ্রহণ করে না, আনন্দলাভ করে না,[পুরীষ] ত্যাগ করে না এবং গমন করে না। সাধারণ লোকে[ইহাকে] ‘স্বপিতি’ ‘নিদ্রা যাইতেছে’ এইরূপ বলিয়া থাকে ॥ * ॥ ৪৩ ॥ ২ ॥

প্রশ্নোপনিষৎ। ৭১

প্রাণাগ্নয় এবৈতস্মিন্ পুরে জাগ্রতি। গার্হপত্যো হ বা এষোহপানো ব্যানোহন্বাহার্য্যপচনঃ, যদগার্হপত্যাৎ প্রণীয়তে প্রণয়নাদাহবনীয়ঃ প্রাণঃ ॥৪৪৷৷৩৷৷

[“কানি অস্মিন্ শরীরে জাগ্রতি” ইত্যস্য প্রশ্নস্যোত্তর প্রসঙ্গেন প্রাণেষু অগ্নিত্রয়-দৃষ্টিমাহ]—‘প্রাণাগ্নয়ঃ’ ইত্যাদিনা। এতস্মিন্ পুরে(নবদ্বারে দেহে) প্রাণাগ্নয়ঃ(প্রাণরূপা অগ্নয়ঃ) এব জাগ্রতি(সর্বদা জাগরণং কুর্ব্বন্তি)। এষঃ (অনুভূয়মানঃ) হ(প্রসিদ্ধঃ) অপানঃ(প্রাণবৃত্তিবিশেষঃ) বৈ(এব) গার্হপতাঃ (তদাখ্যঃ অগ্নিঃ,) ব্যানঃ(তদাখ্যঃ প্রাণবৃত্তিভেদঃ) অন্বাহার্য্যপচনঃ(দক্ষিণাগ্নিঃ) [ভবতি]। যৎ(যস্মাৎ) গার্হপত্যাৎ(গৃহপতিসম্বন্ধিনঃ অগ্নেঃ) প্রণীয়তে— প্রণয়নাৎ আনয়নাৎ(হেতোঃ) প্রাণ এব আহবনীয়ঃ(তৎস্থলবর্তী) ॥

‘এই শরীরে কাহারা জাগ্রৎ থাকে?’ এই প্রশ্নের উত্তরপ্রসঙ্গে প্রাণে অগ্নি- দৃষ্টির উপদেশ করিতেছেন। এই পুরে(দেহে) প্রাণরূপী অগ্নিত্রয়ই সর্ব্বদা জাগরিত থাকে।[ তন্মধ্যে] এই অপান বায়ুই প্রসিদ্ধ গার্হপত্য অগ্নি, ব্যান বায়ু অন্বাহার্য্য পচন(দক্ষিণাগ্নি),[ এবং] যেহেতু গার্হপত্য অগ্নিরূপী অপান হইতে প্রণীত বা পৃথকৃত হয়, সেই প্রণয়ন হেতুই প্রাণবায়ু আহবনীয় স্থানীয় ॥ ৪৪ ॥ ৩ ॥ শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

সুপ্তবৎসু শ্রোত্রাদিষু করণেষু এতস্মিন্ পুরে নবদ্বারে দেহে প্রাণাগ্নয়ঃ প্রাণাদি- পঞ্চবায়বঃ অগ্নয় ইব অগ্নয়ো জাগ্রতি। অগ্নিসামান্যং হি আহ—গার্হপত্যো হ বা এযোহপানঃ। কথং? ইত্যাহ—যস্মাৎ গার্হপত্যাৎ অগ্নেঃ অগ্নিহোত্রকালে ইতরোহগ্নিঃ আহবনীয়ঃ প্রণীয়তে, প্রণয়নাৎ—প্রণীয়ত অস্মাদিতি প্রণয়নো গার্হপত্যোহগ্নিঃ যথা, তথা সুপ্তস্যাপানবৃত্তেঃ প্রণীয়তে ইব প্রাণো মুখনাসিকাভ্যাং সঞ্চরতি, অত আহবনীয়স্থানীয়ঃ প্রাণঃ। ব্যানস্তু হৃদয়াৎ দক্ষিণসুষিরদ্বারেণ নির্গমাৎ দক্ষিণদিক্সম্বন্ধাৎ অন্বাহার্য্যপচনো দক্ষিণাগ্নিঃ ॥ ৪৪ ॥ ৩ ॥

৭২ প্রশ্নোপনিষৎ।

, ভাষ্যানুবাদ।

প্রাণাদি পাঁচটি বায়ু অগ্নির সদৃশ বলিয়া ‘অগ্নি’-পদবাচ্য, সেই প্রাণাগ্নিসমূহ এই পুরে অর্থাৎ নবদ্বারবিশিষ্ট দেহে শ্রোত্র প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণ প্রসুপ্ত হইলে পর, জাগরিত থাকে। অগ্নির সহিত প্রাণের সাদৃশ্য বলিতেছেন-এই অপানই প্রসিদ্ধ গার্হপত্য অগ্নি; কিপ্রকারে? তাহা বলা হইতেছে-যেহেতু[লোকপ্রসিদ্ধ] অগ্নিহোত্র যজ্ঞসময়ে ‘আহবনীয়’ নামক অপর অগ্নি(যাহাতে হোম করিতে হয়), সেই অগ্নিটি গার্হপত্য অগ্নি হইতে প্রণীত(আহত) হয়, সেই প্রণয়ন হেতু-অর্থাৎ ইহা হইতে প্রণয়ন করা হয়(আহবনীয় অগ্নি আহরণ করা হয়), এই জন্য গার্হপত্য অগ্নি যেমন প্রণয়ন-পদবাচ্য; তেমনি সুপ্ত ব্যক্তির প্রাণও যেন অপানবৃত্তি হইতেই প্রণীত বা আহত হইয়া মুখ ও নাসারন্ধে সঞ্চরণ করে; এই জন্য প্রাণবায়ুটি ‘আহবনীয়’-স্থলবর্তী, [ এবং অপানবায়ু ‘গার্হপত্য-স্থানপাতী]। আর হৃদয় হইতে দক্ষিণ রন্ধ্র দ্বারা নির্গত হয় বলিয়া-দক্ষিণ ভাগের সহিত সম্বন্ধ থাকায় ব্যানবায়ুটি ‘অন্বাহার্য্য-পচন’-নামক দক্ষিণাগ্নি-স্থানীয় * ॥ ৪৪ ॥৩॥

প্রশ্নোপনিষৎ। ৭৩

‘যদুচ্ছ্বাস-নিশ্বাসাবেতাবাহুতী সমং নয়তীতি স সমানঃ। মনো হ বাব যজমান ইষ্টফলমেবোদানঃ, স এনং যজমানমহ- রহব্রহ্ম গময়তি ॥ ৪৫ ॥ ৪ ॥

[ইদানীমুচ্ছাস-নিশ্বাস-সমান-মন উদানেষু ক্রমেণ আহুতি-অদৃষ্ট-যজমানেষ্ট- ফলদৃষ্টি-বিধানার্থমাহ]-‘যং’ ইত্যাদি। যৎ(যস্মাৎ)[যো বায়ুরূপোহগ্নিঃ], এতৌ উচ্ছ্বাস-নিশ্বাসৌ(প্রাণস্য শরীরাদ্ বহির্গমনম্ উচ্ছ্বাসঃ, পুনঃ প্রবেশঃ প্রশ্বাসঃ, তৌ) আহুতী(আহুতিদ্বয়ং)[অগ্নিহোত্রাহুতিবৎ] সমং(শরীর ধারণোপযোগিতয়া যথাবস্থং) নয়তি(প্রাপয়তি), ইতি(তস্মাৎ হেতোঃ) স সমানঃ (অদৃষ্টস্থানীয়ঃ, হোতৃস্থানীয়ো বা)। বাব(প্রসিদ্ধং) মনঃ হ(এব) যজমানঃ (আহুতিপ্রদাতা), উদানঃ(ঊর্দ্ধগামী বায়ুঃ) এব ইষ্টফলং(যজ্ঞফলং),[যতঃ] সঃ(উদানঃ)[সুষুপ্তিসময়ে] এনং(মনোনামকং) যজমানং অহরহঃ (প্রত্যহং) ব্রহ্ম গময়তি(স্বপ্নাবস্থায়া অপসার্য্য স্বর্গমিব ব্রহ্মস্বভাবং পরমানন্দং প্রাপয়তীত্যর্থঃ) ॥

যেহেতু উচ্ছ্বাস ও নিশ্বাসরূপ এই আহুতিদ্বয়কে সমতা প্রাপ্ত করায়, এই কারণে, সেই সমান বায়ু[অদৃষ্টস্থানীয়], প্রসিদ্ধ মনই যজমানস্থানীয়, উদান বায়ুই যজ্ঞের ফলস্বরূপ,[কারণ,] সেই উদানই মনোরূপী যজমানকে প্রত্যহ[সুযুপ্তিকালে স্বপ্ন দর্শন হইতে বিরত করিয়া] ব্রহ্ম প্রাপ্ত করাইয়া থাকে ॥ ৪৫ ॥ ৪

শাঙ্করভাষ্যম্।

অত্র চ হোতা অগ্নিহোত্রস্য যদ্ যস্মাদুচ্ছ্বাস-নিশ্বাসৌ অগ্নিহোত্রাহুতী ইব নিত্যং দ্বিত্বসামান্যাদেব তু এতৌ আহুতী সমং সাম্যেন শরীরস্থিতিভাবায় নয়তি যো বায়ুঃ অগ্নিস্থানীয়োহপি হোতা চাহুত্যোর্নে তৃত্বাৎ। কোহসোঁ? স সমানঃ। অতশ্চ বিদুষঃ স্বাপোহপি অগ্নিহোত্রহবনমেব। তস্মাদবিদ্বান্ ন ‘অকর্মী’ ইত্যেবং মন্তব্য ইত্যভিপ্রায়ঃ।’ ‘সর্ব্বদা সর্ব্বাণি চ ভূতানি বিচিন্বন্ত্যপি স্বপতে,“ইতি হি বাজস- নেয়কে। অত্র হি জাগ্রৎসু প্রাণাগ্নিষু উপসংহৃত্য বাহ্যকরণানি বিষয়াংশ অগ্ন- হোত্রফলমিব স্বর্গং ব্রহ্ম জিগমিযুঃ মনো হ বাব যজমানো জাগত্তি। যজমানবৎ কার্য্যকরণেষু প্রাধান্যেন সংব্যবহারাৎ স্বর্গমিব ব্রহ্ম প্রতি প্রস্থিতত্বাদ

৭৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

যজমানো মনঃ কল্প্যতে। ইষ্টফলং যাগফলমেব উদানো বায়ুঃ। উদাননিমি কত্বাৎ ইষ্টফলপ্রাপ্তেঃ। কথম্? স উদানঃ এনং মন-আখ্যং যজমানং স্বপ্নবৃত্তিরূপাদপি প্রচ্যাব্য অহরহঃ সুযুপ্তিকালে স্বর্গমিব ব্রহ্মাক্ষরং গময়তি। অতো যাগফলস্থানীয় উদানঃ ॥৪৫॥৪ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

যে হেতু অগ্নিহোত্রীয় হোতার ন্যায় যে বায়ু অগ্নিহোত্রীয় আহুতি- দ্বয়ের মত উচ্ছ্বাস ও নিশ্বাসকে শরীর-রক্ষার নিমিত্ত সর্ব্বদা সমতাপ্রাপ্ত করায়; এই বায়ু কে?[উত্তর] সেই প্রসিদ্ধ সমান অর্থাৎ সমান- সংজ্ঞক বায়ু।[অগ্নিহোত্রাহুতির ন্যায় দ্বিত্বসংখ্যার সাম্য থাকায়, এখানে [উচ্ছ্বাস ও নিশ্বাসকে] আহুতি দ্বয়[বলা হইয়াছে], এবং সমান বায়ু অগ্নিস্থানীয় হইলেও আহুতিনেতা বলিয়া ‘হোতা’[শব্দে অভিহিত হইয়াছে]। অতএব, জ্ঞানীর স্বপ্নাবস্থাও অগ্নিহোত্রহোমের স্থলবর্তী। অভিপ্রায় এই যে, অতএব বিদ্বান্ ব্যক্তি কৰ্ম্ম-রহিত, এরূপ মনে করিতে নাই। বাজসনেয়কে(যজুর্বেদে) আছে, ‘স্বপ্নসময়েও সমস্ত প্রাণিগণ অগ্নিচয়ন করিয়া থাকে, অর্থাৎ সে সময়েও হোম-ক্রিয়া সম্পন্ন হইয়া থাকে।’ এই প্রাণাগ্নির জাগরণসময়ে মনোরূপী যজমান বাহ্য ইন্দ্রিয়বর্গ ও শব্দাদি বিষয়সমূহ উপসংহৃত করিয়া, অগ্নিহোত্র যজ্ঞীয়-- স্বর্গ-ফলের ন্যায় ব্রহ্মপ্রাপ্তির ইচ্ছায় জাগরিত থাকে, দেহেন্দ্রিয়াদি- গত ব্যবহারে যজমানের ন্যায় মনেরই প্রাধান্য; এই কারণে স্বর্গতুল্য ব্রহ্মাভিমুখে প্রস্থান করায় মনের যজমানত্ব কল্পনা করা হয়। উদান বায়ুই যাগের ফলস্বরূপ; কারণ, যজ্ঞফল প্রাপ্তির পক্ষেও উদান বায়ুই নিমিত্ত; কি প্রকারে? যে হেতু সেই উদান বায়ুই মনো-নামক যজ- মানকে প্রত্যহ স্বপ্নাবস্থা হইতে অপসারিত করিয়া, সুষুপ্তিসময়ে স্বর্গ- সদৃশ অক্ষর ব্রহ্ম প্রাপিত করিয়া থাকে; এই কারণে উদান বায়ু যাগ-ফলস্থানীয় ॥ ৪৫ ॥ ৪ ॥

প্রশ্নোপনিষৎ। ৭৫

অত্রৈষ দেবঃ স্বপ্নে মহিমানমনুভবতি। যদ্ দৃষ্টং দৃষ্ট- মনুপশ্যতি, শ্রুতং শ্রুতমেবার্থমনুশৃণোতি, দেশদিগন্তরৈশ্চ প্রত্যনুভূতং পুনঃপুনঃ প্রত্যনুভবতি, দৃষ্টঞ্চাদৃষ্টঞ্চ শ্রুতঞ্চাশ্রুত- ঞ্চানুভূতঞ্চাননুভূতঞ্চ * সর্ব্বং পশ্যতি, সর্ব্বঃ পশ্যতি ॥৪৬ ॥৫॥

[ইদানীং “কতর এষ দেবঃ স্বপ্নান্ পশ্যতি” ইত্যস্য প্রশ্নস্তোত্তরমাহ]- অত্রেত্যাদিনা। এষঃ(সাক্ষিরূপঃ) দেবঃ(মনউপাধিক আত্মা) অত্র স্বপ্নে (স্বপ্নাবস্থায়াং) মহিমানং(মহত্ত্বং স্ববিভূতিং বা) অনুভবতি।[অনুভবপ্রকার- মেবাহ]—যৎ দৃষ্টংদৃষ্টং(জাগরণে যদ্যৎ প্রত্যক্ষীকৃতং, তৎ) অনু(পশ্চাৎ, বাসনাবলেন স্বপ্নাবস্থায়াং) পশ্যতি(সাক্ষাৎ করোতি)। শ্রুতংশ্রুতমেব (জাগ্রৎকালীনং শ্রুতমেব সর্ব্বং)[পূর্ব্ববৎ] অনুশৃণোতি, দেশ-দিগন্তরৈঃ (দেশান্তরৈঃ দিগন্তরৈঃ) চ(অপি) প্রত্যনুভূতং(প্রকর্ষেণ অধিগতং বস্তু) পুনঃ পুনঃ(ভূয়োভূয়ঃ) প্রত্যনুভবতি(স্বপ্নে প্রত্যক্ষীকরোতি)।[কিং বহুনা,] দৃষ্টং(চক্ষুষো বিষয়ীভূতং) চ, অদৃষ্টং চ(চক্ষুরবিষয়ীভূতং, জন্মান্তর-দৃষ্টমিতি ভাবঃ),[তথা] শ্রুতম্(ইহৈব শ্রবণেন্দ্রিয়বিষয়ীভূতম্) অশ্রুতম্ অনুভূতং (ঐহিকং) অননুভূতং(জন্মান্তরীণং) চ সর্ব্বং পশ্যতি(অবগচ্ছতি)।[স্বয়মপি] সর্ব্বঃ(দেবাসুর-নরাদিরূপঃ সন্) পশ্যতি ॥

এই দেবতা অর্থাৎ মন উপাধিযুক্ত আত্মা এই স্বপ্নে মহিমা বা স্বীয় বিভূতি অনুভব করিয়া থাকে;[জাগ্রৎ সময়ে] যাহা যাহা দৃষ্ট,[তাহা] পশ্চাৎ দর্শন করে, সমস্ত শ্রুতই পশ্চাৎ শ্রবণ করে, দেশান্তরে ও দিগন্তরে সম্যক্ অনুভূত বিষয় বারংবার অনুভব করে।[অধিক কি,] ঐহিক দৃষ্ট ও অদৃষ্ট, শ্রুত ও অশ্রুত, অনুভূত ও অননুভূত, সমস্তই দর্শন করে, এবং নিজেও সর্ব্বাত্মক হইয়া দর্শন করে ॥ ৪৬ ॥ ৫ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

এবং বিদুষঃ শ্রোত্রাদ্যপরমকালাদারভ্য যাবৎ সুপ্তোত্থিতো ভবতি, তাবৎ সর্ব্বযাগফলানুভব এব, নাবিদুষামিব অনর্থায়েতি বিদ্বত্তা স্তূয়তে। ন হি বিদুষ এব শ্রোত্রাদীনি স্বপন্তি, প্রাণাগ্নয়ো বা জাগ্রতি; জাগ্রৎ-স্বপ্নয়োৰ্ম্মনঃ স্বাতন্ত্র্য-

৭৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

মনুভবৎ অহরহঃ সুষুপ্তং বা প্রতিপদ্যতে। সমানং হি সর্ব্বপ্রাণিনাং পর্যায়েণ জাগ্রং স্বপ্ন-সুষুপ্তিগমনং; অতো বিদ্বত্তা-স্তুতিরেবেয়ম্ উপপদ্যতে। যৎ পৃষ্টং “কতর এষ দেবঃ স্বপ্নান্ পশ্যতি ইতি; তদাহ—

অত্র উপরতেষু শ্রোত্রাদিযু দেহরক্ষায়ৈ জাগ্রৎসু প্রাণাদিবায়ুষু ‘প্রাক্ সুষুপ্তি- প্রতিপত্তেঃ, এতস্মিন্ অন্তরালে এষ দেবঃ অর্করশ্মিবৎ স্বাত্মনি সংহৃতশ্রোত্রাদি- করণঃ স্বপ্নে মহিমানং বিভূতিং বিষয়-বিষয়িলক্ষণম্ অনেকাত্মভাবগমনম্ অনুভবতি প্রতিপদ্যতে।

ননু মহিমানুভবনে করণং মনোহনুভবিতুঃ, তৎ কথং স্বাতন্ত্র্যেণ অনুবর্তী- ত্যুচ্যতে? স্বতন্ত্রো হি ক্ষেত্রজ্ঞঃ। নৈষ দোষঃ; ক্ষেত্রজ্ঞস্য স্বাতন্ত্র্যস্য মন-উপাধি- কৃতত্বাৎ। নহি ক্ষেত্রজ্ঞঃ পরমার্থতঃ স্বতঃ স্বপিতি জাগর্ত্তি বা। মন-উপাধিকৃতমেব তস্য জাগরণং স্বপ্নশ্চ ইত্যুক্তং বাজসনেয়কে-“সধীঃ স্বপ্নোভূত্বা ধ্যায়তীব, লেলায়- তীব” ইত্যাদি। তস্মাৎ মনসো বিভৃত্যনুভবে স্বাতন্ত্র্যবচনং ন্যায্যমেব। মন- উপাধিসহিতত্বে স্বপ্নকালে ক্ষেত্রজ্ঞস্য স্বয়ংজ্যোতিষ্টং বাধ্যেত ইতি কেচিৎ। তন্ন, শ্রুত্যর্থাপরিজ্ঞানকৃতা ভ্রান্তিস্তেষাম্। যস্মাৎ স্বয়ংজ্যোতিষ্টাদি-ব্যবহারোহপি আমোক্ষান্তঃ সর্ব্বোহপি অবিদ্যাবিষয় এব মন-আদ্যপাধিজনিতঃ। “যত্র বা অন্যদিব স্যাৎ, তত্রান্যোহন্যৎ পশ্যেৎ, মাত্রাসংসর্গত্ত্বস্থ্য ভবতি।” “যত্র ত্বস্য সর্ব্বমাত্মৈবাভূৎ, তৎ কেন কং পশ্যেৎ,” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ। অতো মন্দব্রহ্মবিদামের ইয়মাশঙ্কা ন তু একাত্মবিদাম্।

নম্নেবং সতি “অত্রায়ং পুরুষঃ স্বয়ংজ্যোতিঃ” ইতি বিশেষণমনর্থকং ভবতি? অত্রোচ্যতে-অত্যল্পমিদমুচ্যতে, “য এষোহস্তহৃদয় আকাশস্তস্মিন্ শেতে” ইতি অন্তহৃদয়পরিচ্ছেদকরণে সুতরাং স্বয়ংজ্যোতিষ্টুং বাধ্যেত; সত্যমেবম্; অয়ং দোষো যদ্যপি স্যাৎ, স্বপ্নে কেবলতয়া স্বয়ংজ্যোতিষ্টেন অর্দ্ধং তাবদপনীতং ভারস্যেতি চেৎ, ন; “তত্রাপি পুরীততি নাড়ীষু শেতে” ইতি শ্রুতেঃ পুরীততি নাড়ীসম্বন্ধাৎ তত্রাপি পুরুষস্থ্য স্বয়ংজ্যোতিষ্টেন অর্দ্ধভারাপনয়াভিপ্রায়ো মৃষৈব। কথং তর্হি “অত্রায়ং পুরুষঃ স্বয়ং-জ্যোতিঃ” ইতি? অন্যশাখাত্বাৎ অনপেক্ষা সা শ্রুতিরিতি চেৎ, ন; অর্থৈকত্বস্য ইষ্টত্বাৎ। একো হ্যাত্মা সর্ববেদান্তানামর্থো বিজিজ্ঞাপ- য়িষিতো বুভুৎসিতশ্চ। তস্মাদ যুক্তা স্বপ্নে আত্মনঃ স্বয়ংজ্যোতিষ্টোপ- পত্তিৰ্বক্তুম্; শ্রুতের্যথার্থতত্ত্ব প্রকাশকত্বাৎ। এবং তর্হি শৃণু শ্রুত্যর্থং, হিত্বা

প্রশ্নোপনিষৎ। ৭৭

সর্ব্বমভিমানং; ন ত্বভিমানেন বর্ষশতেনাপি শ্রুত্যর্থো জ্ঞাতুং শক্যতে সর্ব্বৈঃ পণ্ডিতস্মন্যৈঃ।

যথা হৃদয়াকাশে পুরীততি নাড়ীষু চ স্বপতস্তৎসম্বন্ধাভাবাৎ ততো বিবিচ্য দর্শয়িতুং শক্যতে, ইতি আত্মনঃ স্বয়ংজ্যোতিষ্টুং ন বাধ্যতে। এবং মনসি অবিদ্যা- কামকর্মনিমিত্তোদ্ভূতবাসনাবতি কর্মনিমিত্তা বাসনা অবিদ্যয়া অন্যদ্বস্তন্তরমিব পশ্যতঃ সর্ব্বকার্য্যকরণেভ্যঃ প্রবিবিক্তস্য দ্রষ্টুর্ব্বাসনাভ্যো দৃশ্যরূপাভ্যোহন্যত্বেন স্বয়ং- জ্যোতিষ্টুং সুদপিতেনাপি তার্কিকেণ ন নারয়িতুং শক্যতে। তস্মাৎ সাধুক্তং— মনসি প্রলীনেষু করণেষ প্রলীনে চ মনসি মনোময়ঃ স্বপ্নান্ পশ্যতীতি।

কথং মহিমানমনুভবতীতি? উচ্যতে-যন্মিত্রং পুত্রাদি বা পূর্ব্বং দৃষ্টং, তদ্বাসনাবাসিতঃ পুত্রমিত্রাদিবাসনাসম্ভূতং পুত্রং মিত্রমিব বা অবিদ্যয়া পশ্যতী- ত্যেবং মন্যতে। শৃণোতি তথা শ্রুতমর্থং তদ্বাসনয়া অনুশৃণোটীব। দেশদিগন্ত- রৈশ্চ দেশান্তরৈদ্দিগন্তরৈশ্চ প্রত্যনুভূতং পুনঃপুনস্তৎ প্রত্যনুভবতীব অবিদ্যয়া। তথা দৃষ্টঞ্চাস্মিন্ জন্মনি অদৃষ্টঞ্চ জন্মান্তরদৃষ্টমিত্যর্থঃ। অত্যন্তাদৃষ্টে বাসনানুপপত্তেঃ। এবং শ্রুতঞ্চাশ্রুতঞ্চানুভূতঞ্চ অস্মিন্ জন্মনি কেবলেন মনসা, অননুভূতঞ্চ মনসৈব জন্মান্তরেহনুভূতমিত্যর্থঃ। সচ্চ পরমার্থোদকাদি। অসচ্চ মরীচ্যুদকাদি। কিং বহুনা, উক্তানুক্তং সর্ব্বং পশ্যতি, সর্ব্বঃ পশ্যতি সর্ব্বমনোবাসনোপাধিঃ সন্, এবং সর্ব্বকরণাত্মা মনোদেবঃ স্বপ্নান্ পশ্যতি ॥ ৪৬॥ ৫॥

ভাষ্যানুবাদ।

এইরূপে শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়বর্গের উপরতি বা ব্যাপার-নিবৃত্তির সময় হইতে আরম্ভ করিয়া, জ্ঞানী পুরুষ যাবৎ, সুপ্তোত্থিত(জাগ্রৎ) হন, তাবৎ কাল(স্বপ্নসময়ে) নিশ্চয়ই তাঁহার যাগ-ফলানুভূতি হইয়া থাকে, অজ্ঞদিগের ন্যায় বিফলে যায় না; এইরূপে বিদ্যার স্তুতি করা হইতেছে। কারণ, কেবল জ্ঞানিগণেরই যে, শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়নিচয় নিদ্রিত হয়, অথবা প্রাণাগ্নিসমূহ জাগ্রৎ থাকে, কিংবা প্রত্যহ জাগ্রৎ ও স্বপ্নাবস্থায় মনঃ স্বাধীনতা অনুভব করতঃ সুষুপ্তি প্রাপ্ত হয়, তাহা নহে; কেননা পর্যায়ক্রমে যে, জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি অবস্থালাভ, তাহা সর্বপ্রাণীর পক্ষেই সমান; অতএব ইহা বিদ্যা-স্তুতি হওয়াই সঙ্গত। কোন্

৭৮ প্রশ্নোপনিষৎ।

দেবতা স্বপ্ন দর্শন করেন? পূর্ব্বজিজ্ঞাসিত এই প্রশ্নের উত্তরে বলিতেছেন—

এই দেহে সুষুপ্তি অবস্থা উপস্থিত হইবার পূর্ব্বে শ্রোত্রাদি(ইন্দ্রিয়- সমূহ) উপরত হয় এবং দেহ রক্ষার জন্য প্রাণাদি বায়ুসমূহ যখন জাগ- রিত থাকে, সুযুপ্তি ও জাগরণের মধ্যবর্তী সেই স্বপ্ন সময়ে সূর্য্য যেরূপ রশ্মিসমূহ সংকোচিত করেন, সেইরূপ এই দেবতাও(মন-উপাধিক জীবও) আপনাতে শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়সমূহকে সমাহৃত করিয়া গ্রহণ- বিষয়-বিষয়িভাবাত্মক(যাহা গ্রহণ করা হয়, তাহা বিষয় আর যিনি করেন, তিনি বিষয়ী, তদ্ভাবাপন্ন) মহিমা—অনেক ভাবপ্রাপ্তিরূপ বিভূতি অনুভব করে—প্রাপ্ত হয়।

এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, অনুভবকর্তার মহিমানুভবে মন হইতেছে সাধন; ক্ষেত্রজ্ঞই(জীবই) একমাত্র স্বতন্ত্র; অতএব(মন যে) স্বতন্ত্র- ভাবে অর্থাৎ জীবের সাহায্য ব্যতীত অনুভব করে, ইহা বলা হইল কিরূপে? না—ইহা দোষ নহে; কারণ; ক্ষেত্রজ্ঞের যে স্বাতন্ত্র্য, তাহাও মনোরূপ উপাধিকৃত; কেননা, বাস্তবিক পক্ষে ক্ষেত্রজ্ঞের স্বপ্ন বা জাগরণ কিছুই নাই; মনোরূপ উপাধি দ্বারাই তাহার স্বপ্ন ও জাগরণ সম্পাদিত হয়; একথা যজুর্বেদেও উক্ত আছে—‘ধী বা মনের সহিত মিলিত হইয়া স্বপ্নাবস্থাপ্রাপ্ত হয় এবং যেন ধ্যানই করে, যেন স্পন্দমানই’ হয়, ইত্যাদি। অতএব বিভূতির অনুভবে যে, মনের স্বাতন্ত্র্যকথন, তাহা ন্যায়সঙ্গতই বটে। কেহ কেহ বলেন যে,স্বপ্নসময়ে মনোরূপ উপাধির সহিত সম্বদ্ধ থাকায়, ক্ষেত্রজ্ঞের স্বয়ংজ্যোতিৰ্ম্ময়ভাব বা স্বপ্রকাশত্বের বাধা হয়; বস্তুতঃ তাহা ঠিক নহে, কারণ, শ্রুতির অর্থ না জানায়, তাহাদের ঐরূপ ভ্রম হয় মাত্র। যে হেতু, মোক্ষ না হওয়া পর্যন্ত স্বয়ং-জ্যোতিষ্ট, বা স্বপ্রকাশত্ব প্রভৃতি যে সমস্ত ধর্ম্মের

প্রশ্নোপনিষৎ। ৭৯

ব্যবহার হয়, তৎসমস্তই অবিদ্যার বিষয়ীভূত এবং মনঃপ্রভৃতি উপাধি দ্বারা সমুৎপাদিত। ‘যখন অন্যেরই মত হয় অর্থাৎ ভেদদর্শন হয়, তখনই একে অপরকে দর্শন করে, তখনই ইহার দৃশ্য সম্বন্ধ হয়, আর যখন ইহার(জ্ঞানীর) সমস্তই আত্মস্বরূপ হইয়া যায়, তখন কে কিসের দ্বারা কি দর্শন করিবে!’ ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য হইতেও[ঐ কথা প্রমাণিত হয়]। অতএব, ব্রহ্মজ্ঞানে যাহার। অপটু, তাহাদের পক্ষেই উক্ত আশঙ্কা, কিন্তু আত্মৈকত্বজ্ঞদিগের পক্ষে নহে।

ভাল, এরূপ হইলে ত ‘এ সময়(স্বপ্নকালে) এই পুরুষ(জীব) স্বয়ংজ্যোতিঃ হয়’ এইরূপে বিশেষিত করা বিফল হয়! ইহার উত্তরে বলা হইতেছে যে, এ অতি সামান্য কথা বলা হইতেছে; কারণ; ‘এই হৃদয়াভ্যন্তরস্থ যে আকাশ,[জীব] তাহাতে শয়ন করে’, এই শ্রুতিতে যখন তাহার হৃদয়মধ্যে পরিচ্ছদের কথা উক্ত হইয়াছে, তখন সেই হৃদয়-পরিচ্ছদ দ্বারা তাহার স্বয়ংজ্যোতির্ভাব ত আপনা হইতেই বাধিত হইতে পারে? যদি বল, হাঁ, যদিও এই দোষ হইতে পারে সত্য, তথাপি স্বপ্নে(সুযুপ্তিকালে) যখন কেবল বা অসম্বদ্ধভাবে থাকে, তখনই তাহার স্বয়ংজ্যোতিঃ-স্বভাব সিদ্ধ হইতে পারে; সুতরাং ইহাতে আরোপিত দোষের অর্দ্ধেক(কতকটা) অপনীত হইতে পারে। না, তাহাও বলিতে পার না; কারণ, সে সময়ও(জীব) পুরীতৎ-নামক নাড়ীতে শয়ন করে; এই শ্রুতিতে জীবের পুরীতৎ নাড়ীর সহিত সম্বন্ধ সম্ভাবের কথা উক্ত থাকায়[জীবের কেবলত্ব না থাকায়] স্বয়ং- জ্যেতিৰ্ম্ময়ত্ব হেতু দ্বারা যে, অর্দ্ধেক দোষ-ভারাপনয়নের অভিলাষ, তাহা নিশ্চয়ই বৃথা। ভাল, তাহা হইলে এ সময় পুরুষ স্বয়ংজ্যোতিঃ হয়; এ কথা হয় কিরূপে? যদি বল যে, জীবের যে স্বয়ংজ্যোতির্ময়ত্ব, তাহা অপর শাখার(যজুর্বেদীয় কাণশাখার) কথা; সুতরাং অথর্ব- বেদীয় এই উপনিষদ্ব্যাখায় উহার কিছুমাত্র অপেক্ষা নাই; না, তাহাও

৮০ প্রশ্নোপনিষৎ।

বলা যায় না; কারণ,[সকল উপনিষদের] অর্থগত ঐক্য সম্পাদনই অভিপ্রেত,(বিভিন্নার্থত্ব নহে)। আত্মার একত্বই সমস্ত বেদান্তশাস্ত্রের বিজ্ঞাপনীয় অর্থ এবং ঐ অর্থই বভুৎসিতও(জানিবার অভিলষিতও) বটে; অতএব স্বপ্নসময়ে আত্মার স্বয়ং জ্যোতিৰ্ম্ময়তার উপপাদন করা যুক্তিসঙ্গতই বটে; কেননা, যথার্থ তত্ত্ব প্রকাশ করাই শ্রুতির একমাত্র কার্য্য; এইরূপ হইলে, অর্থাৎ শ্রুতির যথার্থ তত্ত্ব-প্রকাশকতা স্বীকার করিলে, অভিমান পরিত্যাগপূর্ব্বক শ্রুতির অর্থ শ্রবণ কর; কারণ, যাহারা আপনাকে পণ্ডিত বলিয়া মনে করে; তাহারা সকলে শত- বর্ষেও অভিমান দ্বারা শ্রুতির অর্থ অবগত হইতে সমর্থ হয় না। যেমন সুষুপ্ত ব্যক্তির হৃদয়াকাশে এবং পুরীতৎ নাড়ীতে জীবের সম্বন্ধ না থাকায় ঐ স্থানে পৃথক্ করিয়া দেখাইতে পারা যায় বলিয়া আত্মার স্বয়ংজ্যোতিঃস্বভাব বাধিত হয় না, তেমনি মনেতে অবিদ্যা, কাম (কামনা) ও তজ্জনিত কর্মসমুদ্ভূত বাসনা অভিব্যক্ত হইলে পর, অবিদ্যা বা অজ্ঞান বশতঃ যে লোক কৰ্ম্মজনিত বাসনাকে অন্য বস্তুর ন্যায় দর্শন করেন, দেহেন্দ্রিয়াদি সমস্ত বস্তু হইতে বিবিক্ত বা পৃথভূত সেই দ্রষ্টা দৃশ্য বাসনারাশি হইতেও পার্থক্য লাভ করেন; কাজেই তাঁহার সেই পার্থক্যনিবন্ধন যে স্বয়ংজ্যোতিঃ-স্বরূপতা, অতিশয় গর্বান্বিত তার্কিকও তাহা নিবারণ করিতে সমর্থ হন না। অতএব করণসমূহ মনে বিলীন হইলে এবং মন কোথাও বিলীন না হইলে অর্থাৎ প্রকৃত অবস্থাপন্ন হইলে, মনোময়(জীব) যে, স্বপ্নদর্শন করে, বলা হইয়াছে; তাহা উত্তম কথাই হইয়াছে।

(ভাল, এ অবস্থায় মহিমানুভব করে কি প্রকারে?) ইহার উত্তর বলা হইতেছে—পূর্ব্বে(জাগরণসময়ে) যে মিত্র ও পুত্রাদি বস্তু দৃষ্ট হইয়াছে, তদ্বাসনায় বাসিত-চিত্ত ব্যক্তি অবিদ্যাবশতঃ সেই পুত্রমিত্রাদি বাসনা-বলে সমুদ্ভূত বা অভিব্যক্ত পুত্র মিত্রকেই যেন

প্রশ্নোপনিষৎ। ৮১

দর্শন করিয়া থাকে বলিয়া মনে করে-সেইরূপ দৃষ্টাদৃষ্ট বিষয়ও। দৃষ্ট অর্থে, ইহজন্মে দৃষ্ট, আর অদৃষ্ট অর্থে-জন্মান্তরে দৃষ্ট; কারণ, একে- বারেই অদৃষ্ট পদার্থে বাসনা সমুৎপত্তি হইতে পারে না। এইরূপ শ্রুত ও অশ্রুত আর ইহজন্মে কেবল মনের দ্বারা অনুভূত ও অননুভূত অর্থাৎ জন্মান্তরে কেবল মনের দ্বারা অনুভূত। ‘সৎ’ অর্থে-যথার্থ জল প্রভৃতি, আর ‘অসৎ’ অর্থে মরীচি-জল প্রভৃতি(মৃগতৃষ্ণাদি। অধিকে প্রয়োজন কি, উক্ত ও অনুক্ত সমস্তই দর্শন করে, এবং নিজেও সর্ব্ব হইয়া অর্থাৎ মনোগত সমস্ত বাসনা দ্বারা উপহিত হইয়া দর্শন করে। এইরূপে সমস্ত ইন্দ্রিয়াশ্রয় জীব মনঃপরিচালিত হইয়া স্বপ্নসমূহ সন্দর্শন করিয়া থাকে ॥ ৪৬ ॥ ৫ ॥

স যদা তেজসাহভিভূতো ভবতি। অত্রৈষ দেবঃ স্বপ্নান্ন পশ্যতি তদৈতস্মিঞ্ছরীরে * এতৎ সুখং ভবতি ॥৪৭।৬৷৷

[ইদানীং সুষুপ্তিদশাং বক্তুং ‘কস্মৈতং সুখং ভবতি’ ইতি চতুর্থপ্রশ্নস্যোত্তর- মাহ]—স ইত্যাদি সঃ(মনউপাধিকঃ) যদা(যস্মিন্ কালে) তেজসা(সৌরেণ জ্যোতিষা) অভিভূতঃ(আক্রান্তঃ) ভবতি। অত্র(অস্যামবস্থায়াং) এষঃ দেবঃ(জীবঃ) স্বপ্নান্(স্বপ্নদৃশ্যান্) ন পশ্যতি। অথ(কিন্তু) তদা(তস্মিন্ সুষুপ্তিসময়ে) এতস্মিন্ শরীরে এতৎ(অনির্বচনীয়রূপং) সুখং(ব্রহ্মানন্দঃ) ভবতি (প্রকাশতে)[তস্যেতি শেষঃ]॥

সেই জীব যখন চিত্তগত সৌরতেজে অভিভূত হয়, তখন এই অবস্থায় ইনি দ্যোতমান আত্মা স্বপ্ন দর্শন করেন না; পরন্তু, তখন[তাঁহার] এই শরীরে এইরূপ ব্রহ্মসুখ প্রকাশ পায় ॥ ৪৭ ॥ ৬ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

সঃ যদা মনোরূপো দেবো যস্মিন্ কালে সৌরেণ চিত্তাখ্যেন তেজসা নাড়ীশয়েন সর্ব্বতোহভিভূতো ভবতি—তিরস্কৃতবাসনাদ্বারো ভবতি; তদা সহ করণৈৰ্ম্মনসো রশ্ময়ো হৃদ্যপসংহৃতা ভবন্তি। যদা মনো দার্ব্বগ্নিবৎ অবিশেষ- বিজ্ঞানরূপেণ কৃৎস্নং শরীরং ব্যাপ্য অবতিষ্ঠতে, তদা সুষুপ্তো ভবতি। অত্র

৮২ প্রশ্নোপনিষৎ।

এতস্মিন্ কালে এষ মনআখ্যো দেবঃ স্বপ্নান্ ন পশ্যতি, দর্শনদ্বারস্য নিরুদ্ধত্বা- ত্তেজসা। অথ তদা এতস্মিন্ শরীরে এতৎ সুখং ভবতি, যদ্বিজ্ঞানং নিরাবাধম- বিশেষেণ শরীরব্যাপকং প্রসন্নং ভবতীত্যর্থঃ ॥ ৪৭ ॥ ৬ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

যে সময় সেই মনোরূপী দেবতা(প্রকাশশীল) নাড়ীগত চিত্ত- সংজ্ঞক সৌর তেজঃ দ্বারা সর্বতোভাবে অভিভূত হয়, অর্থাৎ তাহার পূর্বতন সংস্কার-উদ্বোধের দ্বার নিরুদ্ধ হইয়া যায়, তখন ইন্দ্রিয়গণের সহিত মনের রশ্মি বা প্রকাশন-শক্তি সমূহও উপসংহৃত হইয়া পড়ে। মন যে সময় কাষ্ঠগত অগ্নির ন্যায় বিশেষবিজ্ঞানরহিত বা সামান্য চেতনাশক্তিরূপে সমস্ত শরীর ব্যাপিয়া অবস্থান করে, সেই সময় [জীব] সুযুপ্ত হইয়া থাকে। তেজঃ দ্বারা দর্শনপথ রুদ্ধ হওয়ায় এই মনোনামক দেবতা সেই সময় কোনও স্বপ্ন দর্শন করে না; পরন্তু তখন এই শরীরে এইরূপ সুখ বা আনন্দ হইয়া থাকে, যাহার অনুভূতি শরীর-ব্যাপক নির্বিশেষও অবাধ প্রসন্নতাময় হইয়া থাকে *॥৪৭৷৬৷৷

স যথা সৌখ্যং বয়ান্সি বাসেবুকং সম্প্রতিষ্ঠন্তে।

এবং হ বৈ তৎসর্ব্বং পর আজ্ঞা সম্প্রতিতে ॥৪৮॥৭॥

[ ইদানীং দৃষ্টান্তেন সুষুপ্ত্যবস্থাং বিশদয়ন ‘কস্মিনু এতে সম্প্রতিষ্ঠিতাঃ’ ইত্যস্য পঞ্চমপ্রশ্নস্যোত্তরমাহ]—‘স যথা’ ইত্যাদিনা। হে সৌম্য, বয়াংসি(পক্ষিণঃ) যথা(যদ্বৎ) বাসোবৃক্ষং(আবাসবৃক্ষং প্রতি) সম্প্রতিষ্ঠন্তে(সম্যক্ ধাবন্তি), এবং হ(তদ্বদেব) তৎ(বক্ষমাণং) সর্ব্বং বৈ(প্রসিদ্ধং করণজাতং) পরে (শ্রেষ্ঠে) আত্মনি সম্প্রতিষ্ঠন্তে(বিলয়ার্থং ধাবন্তি)।

হে সৌম্য, পক্ষিগণ যেরূপ[যথাকালে] আবাস-বৃক্ষাভিমুখে প্রস্থান করে,

প্রশ্নোপনিষৎ। ৮৩

ঠিক সেইরূপ বক্ষ্যমাণ সকলেই পরমাত্মার অভিমুখে ধাবিত হয়, অর্থাৎ আত্মাতে বিলীন হয় ॥ ৪৮ ॥ ৭ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

এতস্মিন্ কালে অবিদ্যা-কামকৰ্ম্মনিবন্ধনানি কার্য্য-করণানি শান্তানি ভবন্তি। ভেষু শান্তেষু আত্মস্বরূপম্ উপাধিভিরন্যথা বিভাব্যমানম্ অদ্বয়ম্ একং শিবং শান্তং ভবতীতি; এতামেবাবস্থাং পৃথিব্যাদ্যবিদ্যাকৃতমাত্রানুপ্রবেশেন দর্শয়িতুং দৃষ্টান্তমাহ—

স দৃষ্টান্তো যথা যেন প্রকারেণ সৌম্য প্রিয়দর্শন, বয়াংসি পক্ষিণো বাসার্থং বৃক্ষং সম্প্রতিষ্ঠন্তে গচ্ছন্তি; এবং যথা দৃষ্টান্তো হ বৈ তদ্বক্ষ্যমাণং সর্ব্বং পরে আত্মনি অক্ষরে সম্প্রতিষ্ঠতে ॥ ৪৮ ॥ ৭ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

এই সময়(সুষুপ্তিকালে) অবিদ্যা ও তদধীন কাম ও কর্ম্মের বশ- বর্তী দেহ ও ইন্দ্রিয় প্রভৃতি সকলেই শান্ত বা ক্রিয়াবিরত হইয়া থাকে। সেই দেহেন্দ্রিয়াদি কার্য্য-করণসমূহ প্রশান্ত হইলে পর[পূর্ব্বে] উপাধি সমূহ দ্বারা যে আত্মস্বরূপ অন্যথা প্রতীত হইত,[তখন] তাহাই এক, অদ্বিতীয়, শিব ও শান্তস্বরূপ হইয়া থাকে। অবিদ্যাকৃত পৃথিবী প্রভৃতি ভূত ও ইন্দ্রিয়ের সম্বন্ধ দ্বারা সেই শিব ও শান্তস্বরূপ প্রদর্শনার্থ দৃষ্টান্ত বলিতেছেন—

সেই দৃষ্টান্ত এইরূপ,—হে সৌম্য প্রিয়দর্শন, বয়স্—পক্ষিগণ যে প্রকার বাসের জন্য বৃক্ষাভিমুখে প্রস্থান বা গমন করিয়া থাকে, এই দৃষ্টান্ত যেরূপ, ঠিক তদ্রূপ বক্ষ্যমাণ(যাহা পারে বলা হইবে) সমস্তই পর আত্মায়(অক্ষর পুরুষে) অর্থাৎ তদভিমুখে প্রস্থান করে ॥৪৮॥৭॥

পৃথিবী চ পৃথিবীমাত্রা চ, আপশ্চাপোমাত্রা চ, তেজশ তেজোমাত্রা চ, বায়ুশ বায়ুমাত্রা চ, আকাশশ্চাকাশমাত্রা চ, চক্ষুশ দ্রষ্টব্যঞ্চ, শ্রোত্রঞ্চ শ্রোতব্যঞ্চ, ঘ্রাণঞ্চ ঘ্ৰাতব্যঞ্চ, রসশ্চ

৮৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

রসয়িতব্যঞ্চ, ত্বক্ চ স্পর্শয়িতব্যঞ্চ, বাক্ চ বক্তব্যঞ্চ, হস্তৌ চাদাতব্যঞ্চ, উপস্থশ্চানন্দয়িতব্যঞ্চ, পায়ুশ বিসর্জ্জয়িতব্যঞ্চ, পাদৌ চ গন্তব্যঞ্চ, মনশ্চ মন্তব্যঞ্চ বুদ্ধিশ্চ বোদ্ধব্যঞ্চ, অহঙ্কারশ্চাহঙ্কর্ত্তব্যঞ্চ, চিত্তঞ্চ চেতয়িতব্যঞ্চ, তেজশ বিদ্যো- তয়িতব্যঞ্চ, প্রাণশ্চ বিধারয়িতব্যঞ্চ ॥৪৯৷৷৮৷৷

[পূর্ব্বশ্লোকোক্ত “তৎ সর্ব্বং” বিবৃথন্ আহ]-“পৃথিবী” ইত্যাদি। পৃথিবী চ (স্থূলা পৃথিবী) পৃথিবীমাত্রা(সূক্ষ্মা গন্ধতন্মাত্রা) চ(অপি); আপঃ(স্কুলানি জলানি), আপোমাত্রা(রসতন্মাত্রা) চ, তেজঃ(স্থলং) চ, তেজোমাত্রা(রূপ- তন্মাত্রা) চ, বায়ুঃ(স্থূলঃ) চ, বায়ুমাত্রা(বায়ুতন্মাত্রা) চ, আকাশঃ(স্থূলঃ) চ, আকাশমাত্রা(শব্দতন্মাত্রা) চ, চক্ষুঃ চ দ্রষ্টব্যং(রূপং) চ, শ্রোত্রং চ, শ্রোতব্যং (শব্দঃ) চ, ঘ্রাণং(ঘ্রাণেন্দ্রিয়ং) চ, ঘ্রাতব্যং(গন্ধঃ) চ, রসঃ(রসনেন্দ্রিয়ং) চ, রসরিতব্যং(রসঃ) চ, ত্বক্(স্পর্শগ্রাহকমিন্দ্রিয়ং) চ, স্পর্শরিতব্যং(তদ্‌- গ্রাহ্যং) চ, বাক্(বাগিন্দ্রিয়ং) চ, বক্তব্যং(তদ্বিষয়ঃ) চ, হস্তৌ চ, আদাতব্যং (গ্রহণীয়ং) চ, উপস্থঃ(তদাখ্যমিন্দ্রিয়ং) চ, আনন্দয়িতব্যং(তদ্বিষয়ঃ) চ, পায়ুঃ (তদাখ্যমিন্দ্রিয়ং) চ, বিসর্জয়িতব্যং(বিষ্ঠাদি) চ, পাদৌ চ গন্তব্যং(স্থানং) চ, মনঃ চ মন্তব্যং চ, বুদ্ধিঃ চ, বোদ্ধব্যং চ, অহঙ্কারঃ চ, অহংকার্তব্যং চ, চিত্তং চ, চেতয়িতব্যং চ, তেজঃ(প্রকাশবিশিষ্টা ত্বগিন্দ্রিয়াতিরিক্তা যা ত্বক্, সা) চ, বিদ্যো- তয়িতব্যং(তৎপ্রকাশ্যং) চ, প্রাণঃ(ক্রিয়াশক্তি: সূত্রাত্মা) চ, বিধারয়িতব্যং (তস্মিন্ ওত-প্রোতভাবেন স্থিতং) চ,[এতৎ সর্ব্বম্ ইত্যভিপ্রায়ঃ]॥

পৃথিবী এবং পৃথিবীমাত্রা(গন্ধতন্মাত্র), জলও রসতন্মাত্র, তেজঃ ও রূপ- তন্মাত্র, বায়ুও স্পর্শতন্মাত্র, আকাশ ও শব্দতন্মাত্র, চক্ষুঃ ও দ্রষ্টব্য(রূপ), শ্রোত্র ও শ্রবণযোগ্য বস্তু, ঘ্রাণেন্দ্রিয় ও আগ্নেয়, রসনেন্দ্রিয় ও আস্বাদ্য, ত্বক্ ও স্পর্শযোগ্য বস্তু, বাগিন্দ্রিয় ও বক্তব্য বিষয়, হস্তদ্বয় ও তদ্‌গ্রাহ্য বস্তু, উপস্থ ও আনন্দের বিষয়, পায়ু ও পরিত্যাজ্য(বিষ্টাদি), পাদদ্বয় ও গন্তব্য স্থান, মনঃ ও মন্তব্য বিষয়, বুদ্ধি ও বোদ্ধব্য বিষয়, অহঙ্কার ও অহঙ্কারের বিষয়, চিত্ত ও তাহার বিষয়, তেজঃ ও তাহার প্রকাশ্য এবং প্রাণ(ক্রিয়াশক্তি) ও ধারণীয় বিষয়,[এই সমস্তই আত্মাতে লীন হইয়া থাকে]॥ ৪৯ ॥৮॥

প্রশ্নোপনিষৎ। ৮৫

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কিং তৎ সর্ব্বম্?—পৃথিবী চ স্থূলা পঞ্চগুণা, তৎকারণা চ, পৃথিবীমাত্রা চ গন্ধ- তন্মাত্রা। তথা আপশ্চ আপোমাত্রা চ। তেজশচ তেজোমাত্রা চ। বায়ুশ বায়ুমাত্রা চ। আকাশশ্চাকাশমাত্রা চ। স্থূলানি সুক্ষ্মাণি চ ভূতানীত্যর্থঃ। তথা চক্ষুশ ইন্দ্রিয়ং রূপঞ্চ দ্রষ্টব্যঞ্চ। শ্রোত্রঞ্চ শ্রোতব্যঞ্চ। ঘ্রাণঞ্চ ঘ্রাতব্যঞ্চ। রসশ্চ রসয়িতব্যঞ্চ। ত্বক্ চ স্পর্শয়িতব্যঞ্চ। বাক্ চ বক্তব্যঞ্চ। হস্তৌ চাদাতব্যঞ্চ। উপস্থশ্চ আনন্দয়িতব্যঞ্চ। পায়ুশ বিসর্জয়িতব্যঞ্চ। পাদৌ চ গন্তব্যঞ্চ। বুদ্ধীন্দ্রিয়াণি কর্মেন্দ্রিয়াণি তদর্থাশ্চোক্তাঃ। মনশ্চ পূর্ব্বোক্তম্। মন্তব্যঞ্চ তদ্বিষয়ঃ। বুদ্ধিশ্চ নিশ্চয়াত্মিকা, বোদ্ধব্যঞ্চ তদ্বিষয়ঃ। অহঙ্কারশ্চ আভিমানলক্ষণমন্তঃকরণং, অহঙ্কর্ত্ত- ব্যঞ্চ তদ্বিষয়ঃ। চিত্তঞ্চ চেতনাবদন্তঃকরণম্, চেতয়িতব্যঞ্চ তদ্বিষয়ঃ। তেজশ ত্বগিন্দ্রিয়ব্যতিরেকেণ প্রকাশবিশিষ্টা যা ত্বক্, তয়াচ নির্ভাস্যো বিষয়ো বিদ্যোতয়ি- তব্যম্। প্রাণশ্চ সূত্রং যদাচক্ষতে, তেন বিধারয়িতব্যং সংগ্রথনীয়ং, সর্ব্বং হি কার্য্যকরণজাতং পারার্থ্যেন সংহতং নামরূপাত্মকমেতাবদেব ॥ ৪৯ ॥ ৮ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

সেই সমস্ত কি?[তাহা বলা হইতেছে,] পৃথিবী অর্থ—[শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ এই] পঞ্চগুণবিশিষ্ট স্থূল ও তদুৎপন্ন পার্থিব বস্তু, এবং পৃথিবীমাত্রা অর্থ—গন্ধতন্মাত্র। সেইরূপ, জল ও জলমাত্রা, বায়ু ও বায়ুমাত্রা আকাশ ও আকাশমাত্রা, অর্থাৎ স্থূল ও সূক্ষ্ম ভূত- নিচয়। সেইরূপ চক্ষুরিন্দ্রিয় ও দ্রষ্টব্য বিষয়। শ্রবণেন্দ্রিয় ও শ্রোতব্য, ঘ্রাণেন্দ্রিয় ও ঘ্রাতব্য(ঘ্রাণেন্দ্রিয়গ্রাহ্য), রস(রসনেন্দ্রিয়) ও রসয়িতব্য(আস্বাদ্য বিষয়), ত্বগিন্দ্রিয় ও স্প্রষ্টব্য, বাগিন্দ্রিয় ও বক্তব্য বিষয়, হস্তদ্বয় ও গ্রহণীয়, উপস্থ ও আনন্দয়িতব্য, পায়ু ও পরি- ত্যাজ্য, পাদদ্বয় ও গন্তব্য।[ইহা দ্বারা] জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্ম্মেন্দ্রিয় ও তদুভয়ের বিষয় উক্ত হইল।(১) পূর্ব্বোক্ত মন ও তাহার বিষয়—

৮৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

মন্তব্য। বুদ্ধি অর্থে নিশ্চয়াত্মিকা অন্তঃকরণবৃত্তি, এবং বোধব্য অর্থে বুদ্ধির বিষয়, অভিমানবৃত্তিরূপ অহঙ্কার ও তদ্বিষয় অহঙ্কর্ত্তব্য, চিত্ত অর্থে চেতনা বা বোধশক্তিসম্পন্ন অন্তঃকরণ, এবং চেতয়িতব্য(চিত্তের বিষয়), ত্বক্ অর্থে—ত্বগিন্দ্রিয় ভিন্ন অথচ প্রকাশবিশিষ্ট যে ত্বক্, তাহা এবং তাহার প্রকাশ্য, যাহাকে সূত্র(হিরণ্যগর্ভ) বলিয়া নির্দেশ করা হয়, তাহাই এখানে ‘প্রাণ’ পদবাচ্য, সেই প্রাণ এবং তাঁহার বিধারণীয়; কারণ পরার্থত্ব বা পরোদ্দেশ-প্রযুক্তত্ব হেতু সংহতভাবে মিলিত নামরূপা- ত্মক সমস্ত কার্য্য-করণ-রাশি এই পর্য্যন্তই,[আর অধিক নাই] ॥৪৯৷৷৮

এষ হি দ্রষ্টা স্প্রষ্টা শ্রোতা ঘ্রাতা রসয়িতা মন্তা বোদ্ধা কর্তা বিজ্ঞানাত্মা পুরুষঃ। স পরেহক্ষরে আত্মনি সম্প্রতিষ্ঠতে ॥৫০॥৯৷৷

[অথ আত্মনঃ স্বরূপপ্রতিষ্ঠামাহ]—এষ ইত্যাদিনা। এষঃ(উপাধিযুক্তঃ) হি (নিশ্চয়ে) দ্রষ্টা(চক্ষুরিন্দ্রিয়-জন্য-জ্ঞানকর্ত্তা) স্রষ্টা(স্পর্শকর্ত্তা), শ্রোতা (শ্রবণকর্ত্তা), ঘ্রাতা(গন্ধগ্রাহী), রসয়িতা(রসাস্বাদকর্ত্তা), মন্তা(মননকর্ত্তা) বোদ্ধা(অনুভবিতা) কর্তা(ক্রিয়াসম্পাদকঃ) বিজ্ঞানাত্মা(ইন্দ্রিয়াদি-পরি- চালকঃ), পুরুষঃ(উপাধিপূণত্বাৎ ‘পুরুষ’-পদবাচ্যশ্চ)। সঃ(উপাধিযুক্তঃ পুরুষঃ) পরে(সর্ব্বোত্তমে) অক্ষরে(কূটস্থে) আত্মনি সম্প্রতিষ্ঠতে(সম্যক্ প্রতিষ্ঠাং লভতে)॥

ইনিই দ্রষ্টা, স্পর্শকর্তা, শ্রোতা, আঘ্রাণকর্তা, রসাস্বাদক, চিন্তাকারী, বোদ্ধা, কার্য্যকারী, ইন্দ্রিয়-পরিচালক ও পুরুষ পদবাচ্য। সেই পুরুষ সর্ব্বোৎকৃষ্ট, অক্ষর, আত্মাতে সম্যক্ প্রতিষ্ঠালাভ করেন ॥ ৫০ ॥ ৯॥]

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

অতঃ পরং যদাত্মস্বরূপং জলসূর্য্যকাদিবৎ ভোজ্যত্ব-কর্তৃত্বেন ইহ অনুপ্রবিষ্টম্।

প্রশ্নোপনিষৎ। ৮৭

এষঃ হি দ্রষ্টা স্প্রষ্টা শ্রোতা ঘ্রাতা রসয়িতা মন্তা বোদ্ধা কর্তা বিজ্ঞানাত্মা, বিজ্ঞানং বিজ্ঞায়তেহনেনেতি করণভূতং বুদ্ধ্যাদি, ইদন্তু বিজানাতীতি বিজ্ঞানং কর্তৃকারক- রূপং, তদাত্মা তৎস্বভাবো বিজ্ঞাতৃস্বভাব ইত্যর্থঃ। পুরুষ: কার্য্যকরণসঙ্ঘাতোক্তো- পাধিপূর্ণত্বাৎ পুরুষঃ। স চ জলসূর্য্যকাদি প্রতিবিম্বস্য সূর্য্যাদি প্রবেশবজ্জগদা- ধারশোষে পরেহক্ষরে আত্মনি সম্প্রতিষ্ঠতে ॥ ৫০ ॥ ৯ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

এই কারণে, যে পরমাত্মা জলমধ্য-প্রবিষ্ট সূর্য্যপ্রতিবিম্বের ন্যায় ‘কর্তা ভোক্তা’রূপে[ উপাধিমধ্যে] প্রবিষ্ট হন, তিনিই দ্রষ্টা, শ্রোতা, ঘ্রাণকর্তা, রসাস্বাদক, মননকর্তা, বোদ্ধা(নিশ্চয়াত্মক জ্ঞানসম্পন্ন), কর্তা(ক্রিয়া-সম্পাদক), এবং বিজ্ঞানাত্ম-স্বরূপ;[সাধারণতঃ] ‘বিজ্ঞান’ অর্থ জ্ঞান-সাধন বুদ্ধি প্রভৃতি করণবর্গ; কিন্তু, ইনি জ্ঞানকর্তা —জ্ঞানের কর্ত্তৃকারক; তদাত্মক বা তৎস্বভাবসম্পন্ন অর্থাৎ বিজ্ঞাতৃ- স্বভাব। এবং পূর্ব্বোক্ত দেহেন্দ্রিয়াদিরূপ উপাধিপূর্ণ বলিয়া ‘পুরুষ’ পদবাচ্য। জলমধ্যে প্রতিবিম্বিত সূর্য্যের যেমন[জলাবসানে প্রকৃতসূর্য্যে প্রবেশ হয়] তেমনি সেই পুরুষও জগদাধার পর অক্ষরে অর্থাৎ কূটস্থ আত্মাতে সম্পূর্ণরূপে অবস্থিতি লাভ করে না,[উপাধি মধ্যে আর থাকে না, তখন স্বরূপপ্রতিষ্ঠ হয়] ॥৫০॥৯৷৷

পরমেবাক্ষরং প্রতিপদ্যতে, স যো হ বৈ তদচ্ছায়মশরীর- মলোহিতং শুভ্রমক্ষরং বেদয়তে যস্তু সৌম্য। স সর্বজ্ঞঃ সর্ব্বো ভবতি। তদেষ শ্লোকঃ ॥৫১।১০৷৷

[ ইদানী’ তদ্বিজ্ঞানফলমাহ]-যঃ(কশ্চিৎ) হ(এব) বৈ(প্রসিদ্ধং) তৎ (পূর্ব্বোক্তং) অচ্ছায়ং(অজ্ঞানরহিতং), অশরীরম্(স্থূল-সূক্ষ্মশরীররহিতম্), অলোহিতং(লোহিতাদিবর্ণরহিতং) শুভ্রম্(নিৰ্ম্মলম্) অক্ষরং(কূটস্থং পুরুষং) বেদয়তে(বেত্তি, জানাতি); সঃ পরং অক্ষরং(পুরুষম্) এব প্রতিপদ্যতে (লভতে), হে সৌম্য! যঃ তু(পুনঃ)[এবং বিদ্বান্] সঃ(বিদ্বান্) সর্ব্বজ্ঞঃ

৮৮ প্রশ্নোপনিষৎ।

(সর্ব্ববিষয়কজ্ঞানবান্) সর্ব্বঃ(সর্ব্বাত্মকঃ)[চ] ভবতি। তৎ(তস্মিন্ বিষয়ে) এষঃ(বক্ষ্যমাণঃ) শ্লোকঃ(সংক্ষিপ্তার্থং বাক্যং)। অস্তীতি শেষঃ] ॥

যে কোন লোক সেই অবস্থায়(অজ্ঞানরহিত) স্থূলসূক্ষ্মশরীররহিত এবং লোহিতাদি গুণহীন, বিশুদ্ধ অক্ষরকে অবগত হয়, সে লোক সেই পরম অक्षरকেই লাভ করে। পুনশ্চ, হে সৌম্য, যে লোক[এইরূপ জ্ঞানসম্পন্ন], তিনি সর্ব্বজ্ঞ ও সর্ব্বাত্মক হন। এ বিষয়ে সংক্ষিপ্তার্থক এই বাক্য আছে ॥৫১॥১০।]

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

তদেকত্ববিদঃ ফলমাহ-পরমেবাক্ষরং বক্ষ্যমাণবিশেষণং প্রতিপদ্যত ইতি। এতদুচ্যতে-স যো হ বৈ তৎ সর্ব্বৈষণা বিনির্মুক্তোহচ্ছায়ং তমোবজ্জিতম্, অশরীরং নামরূপসর্ব্বোপাধি-শরীরবর্জিতম্, অলোহিতং লোহিতাদি-সর্ব্বগুণ- বর্জিতম্, যত এবম্ অতঃ শুভ্রম্ শুদ্ধং, সর্ব্ববিশেষণরহিতত্বাৎ অক্ষরং সত্যং পুরুষা- খ্যম্। অপ্রাণমমনোগোচরম্, শিবং শান্তং সবাহ্যাভ্যন্তরমজং বেদয়তে বিজানাতি। যস্তু সর্ব্বত্যাগী হে সৌম্য, সঃ সর্বজ্ঞো ন তেনাবিদিতং কিঞ্চিৎ সম্ভবতি। পূর্ব্বম- বিদ্যয়াহসর্ব্বজ্ঞ আসীৎ, পুনর্বিদ্যয়া অবিদ্যাপনয়ে সর্ব্বো ভবতি তদা। তৎ তস্মিন্নর্থে এষঃ শ্লোকো মন্ত্রো ভবতি উক্তার্থসংগ্রাহকঃ ॥ ৫১ ॥ ১০ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

সেই পুরুষবিষয়ে একত্বজ্ঞানের ফল বলিতেছেন-বক্ষ্যমাণ বিশেষণ- বিশিষ্ট পরম অক্ষরকেই প্রাপ্ত হইয়া থাকে; ইহাই বলা হইতেছে- সর্ববিধ কামনাবিহীন সেই যে লোক সেই অচ্ছায় অর্থাৎ তমঃ বা অজ্ঞানসম্বন্ধ-বর্জিত, অশরীর-নাম-রূপাত্মক সমস্ত উপাধিময় শরীর- রহিত, লোহিত প্রভৃতি সমস্ত গুণবজ্জিত; যে হেতু এই প্রকার, সেই হেতুই শুভ্র(নির্দোষ), কোনপ্রকার বিশেষণ না থাকায় অক্ষর [কোন গুণের অপচয়ে তাহার স্বরূপচ্যুতির সম্ভাবনা নাই], প্রাণ- রহিত, মনের অগোচর, শিব, শান্ত, বাহ্য ও অভ্যন্তররহিত এবং অজ সত্য পুরুষকে বিশেষভাবে জানেন। পুনশ্চ হে সৌম্য, সর্বত্যাগী তিনি সর্বজ্ঞ হন, তাঁহার অবিদিত কিছুই সম্ভবপর হয় না; পূর্ব্বে অবিদ্যাবশতঃ অসর্বজ্ঞ ছিলেন; বিদ্যা বলে অবিদ্যা অপনীত হওয়ায়

প্রশ্নোপনিষৎ। ৮৯

তখন পুনশ্চ সর্ব্বাত্মক হন। এই বিষয়ে অর্থাৎ কথিতার্থ-সংগ্রহ বিষয়ে এইরূপ শ্লোক আছে ॥ ৫১॥১০ ॥

বিজ্ঞানাত্মা সহ দেবৈশ্চ সর্ব্বৈঃ প্রাণা ভূতানি সম্প্রতিষ্ঠন্তি যত্র।

তদক্ষরং বেদয়তে যস্তু সৌম্য

স সর্ব্বজ্ঞঃ সর্ব্বমেবাবিবেশেতি ॥৫২।১১॥

ইত্যর্থবেদীয়-প্রশ্নোপনিষদি চতুর্থঃ প্রশ্নঃ ॥৪॥

[ তমেব শ্লোকমাহ]—‘বিজ্ঞানাত্মা’ ইত্যাদি। বিজ্ঞানাত্মা(অন্তঃকরণোপ- লক্ষিতঃ) সর্ব্বৈঃ দেবৈঃ(চক্ষুরাদ্যধিষ্ঠাতৃভিরগ্যাদিভিঃ) সহ, প্রাণাঃ(চক্ষুরাদীনি ইন্দ্রিয়াণি), ভূতানি(পৃথিব্যাদীনি)[ চ] যত্র(যস্মিন্ অক্ষরে) সম্প্রতিষ্ঠন্তি; হে সৌম্য! যঃ তু(পুনঃ) তৎ অক্ষরং(আত্মানং) বেদয়তে(জানাতি), সঃ সর্ব্বজ্ঞঃ সন্ সর্ব্বম্ এব আবিবেশ(আত্মত্বেন বিশতীত্যর্থঃ)। ‘ইতি’-শব্দো মন্ত্র-সমাপ্তৌ ॥

বিজ্ঞানাত্মা(অন্তঃকরণ বা তদুপলক্ষিত চৈতন্য), সমস্ত দেবতার সহিত এবং চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়গণ ও পৃথিব্যাদি ভূতসমূহ যাঁহাতে সম্যরূপে প্রতিষ্ঠালাভ করে; হে সৌম্য, যিনি সেই অক্ষরকে(পুরুষকে) জানেন, তিনি সর্ব্ব বস্তুতে প্রবেশ লাভ করেন, অর্থাৎ সর্বাত্মকভাব প্রাপ্ত হন ॥ ৫২ ॥ ১১ ॥

প্রশ্নোপনিষদে চতুর্থ প্রশ্ন সমাপ্ত ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

বিজ্ঞানাত্মা সহ দেবৈশ অগ্ন্যাদিভিঃ প্রাণাশ্চক্ষুরাদয়ঃ, ভূতানি পৃথিব্যাদীনি, সম্প্রতিষ্ঠন্তি প্রবিশন্তি যত্র যস্মিন্নক্ষরে; তদক্ষরং বেদয়তে যস্তু হে সৌম্য, প্রিয়- দর্শন, স সর্বজ্ঞ: সর্ব্বমেব আবিবেশ আবিশতীত্যর্থঃ ॥ ৫২॥ ১১ ॥

ইতি শ্রীমচ্ছকরভগবতঃ কৃতৌ প্রশ্নোপনিষদ্ভাষ্যে চতুর্থঃ প্রশ্নঃ ॥ ৪

ভাষ্যানুবাদ।

বিজ্ঞানাত্মা(অন্তঃকরণ) অগ্নি প্রভৃতি দেবগণের সহিত, প্রাণসমূহ

৯০ প্রশ্নোপনিষৎ।

অর্থাৎ চক্ষুঃ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়নিচয়, এবং পৃথিবী প্রভৃতি ভূতসমূহ যে অক্ষরে সম্যক্ প্রতিষ্ঠা লাভ করে অর্থাৎ প্রবেশ করে; হে সৌম্য প্রিয়দর্শন, সেই অক্ষরকে যিনি জানেন, সেই সর্বজ্ঞ পুরুষ সমস্ত বস্তুতে প্রবেশ করেন, অর্থাৎ সর্বময় হন ॥ ৫২৷৷১১ ॥

প্রশ্নোপনিষদ্ভাষ্যানুবাদে চতুর্থ প্রশ্ন সমাপ্ত ॥

প্রশ্নোপনিষৎ।

অথ পঞ্চমঃ প্রশ্নঃ।

অথ হৈনং শৈব্যঃ সত্যকামঃ পপ্রচ্ছ।—স যোহবৈ তদ্ভগবন্মনুষ্যেষু প্রায়ণান্তমোঙ্কারমভিধ্যায়ীত। কতমং বাব স তেন লোকং জয়তীতি, তস্মৈ স হোবাচ ॥৫৩।১॥

[ অথেদানীং পরাপর-ব্রহ্ম প্রাপ্তি-সাধনত্বেন প্রণবোপাসনবিধানায় পঞ্চমঃ প্রশ্নঃ প্রারভ্যতে]—অথেত্যাদি। অথ(গার্গ্য প্রশ্নোত্তরানন্তরং) সত্যকামঃ (সত্যাভিসন্ধঃ) শৈব্যঃ এনং(পিপ্পলাদং) পপ্রচ্ছ, হ(কিল)—ভগবন্(পূজ্য!) মনুষ্যেষু মধ্যে সঃ(প্রসিদ্ধঃ) যঃ(কশ্চিৎ বিদ্বান্) হ বৈ(অবধারণ প্রসিদ্ধি- দ্যোতকৌ নিপাতৌ), প্রায়ণান্তং(মরণপর্য্যন্তং) তৎ(প্রসিদ্ধং) ওঙ্কারং (প্রণবাক্ষরং) অভিধ্যায়ীত(সর্ব্বতোভাবেন উপাসীত)। সঃ(উপাসকঃ) তেন(ওঙ্কারধ্যানেন) কতমং(বহুযু গন্তব্যস্থানেষু মধ্যে কং) লোকং(স্থান- বিশেষং) বাব(প্রসিদ্ধৌ) জয়তি(অধিকরোতি); ইতি(ইত্থং পৃষ্টবতে) তস্মৈ(শৈব্যায়) সঃ(পিপ্পলাদঃ) উবাচ(উক্তবান্)॥

গার্গ্য প্রশ্নের উত্তর শেষ হইলে, সত্যকাম শৈব্য ইহাঁকে জিজ্ঞাসা করিলেন— হে ভগবন্! মনুষ্যমধ্যে সেই যে ব্যক্তি মরণকাল পর্য্যন্ত সেই প্রসিদ্ধ প্রণবের সর্ব্বতোভাবে উপাসনা করেন, তিনি তাহাদ্বারা কোন্ প্রসিদ্ধ লোকটি জয় করেন, অর্থাৎ প্রাপ্ত হন? তিনি তাঁহাকে বলিয়াছিলেন॥৫৩।১৷৷

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

অথ হ এনং শৈব্যঃ সত্যকামঃ পপ্রচ্ছ। অথেদানীং পরাপরব্রহ্মপ্রাপ্তি- সাধনত্বেন ওঙ্কারস্য উপাসনবিধিৎসয়া প্রশ্ন আরভ্যতে—

সঃ যঃ কশ্চিৎ হ বৈ ভগবন্ মনুষ্যেষু মনুষ্যাণাং মধ্যে তৎ অদ্ভুতমিব প্রায়ণান্তং মরণান্তং যাবজ্জীবমিত্যেতৎ, ওঙ্কারম্ অভিধ্যায়ীত আভিমুখ্যেন চিন্তয়েৎ। বাহ্য-

৯২ প্রশ্নোপনিষৎ।

বিষয়েভ্য উপসংহৃতকরণঃ সমাহিতচিত্তো ভক্ত্যাবেশিতব্রহ্মভাব ওঁকারে। আত্ম- প্রত্যয়সন্তানাবিচ্ছেদো ভিন্নজাতীয়-প্রত্যয়ান্তরাখিলীকৃতো নির্ব্বাতস্থদীপশিখাসমো- হভিধ্যানশব্দার্থঃ। সত্য-ব্রহ্মচর্য্যহিংসা-পরিগ্রহত্যাগ-সন্ন্যাস-শৌচ-সন্তোষামায়া- বিত্বাদ্যনেক-যম-নিয়মানুগৃহীতঃ স এবং যাবজ্জীবব্রতধারণঃ। কতমং বাব, অনেকে হি জ্ঞান-কর্মভিজেতব্যা লোকাস্তিষ্ঠন্তি; তেষু তেন ওঙ্কারাভিধ্যানেন কতমং সঃ লোকং জয়তি? ইতি পৃষ্টবতে তস্মৈ স হোবাচ পিপ্পলাদঃ ॥৫৩।১৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

অনন্তর সত্যকাম শৈব্য ইহাঁকে প্রশ্ন করিলেন-ইতঃপর পর ও অপর ব্রহ্মের প্রাপ্তিসাধনরূপে ওঙ্কারের উপাসনা-বিধানেচ্ছায় প্রশ্ন আরব্ধ হইতেছে-হে ভগবন্! মনুষ্যগণের মধ্যে যে কোনও লোক, আশ্চর্য্য ভাবে প্রায়ণান্ত-মরণ পর্য্যন্ত অর্থাৎ যাবজ্জীবন তৎপর হইয়া, ওঙ্কারের ধ্যান বা চিন্তা করেন। বাহ্য বিষয় সমূহ হইতে ইন্দ্রিয়- সমূহকে প্রত্যাহৃত করিয়া এবং ভক্তি দ্বারা ব্রহ্মভাব আরোপ করিয়া ওঙ্কারে সমাহিতচিত্ত(একাগ্রতাসম্পন্ন) হন; ধ্যান শব্দের অর্থ এই যে, ভিন্নজাতীয় অপর কোনও জ্ঞান দ্বারা অন্তরিত বা বিচ্ছেদপ্রাপ্ত নহে, এরূপ বাতহীন স্থানে অবস্থিত দীপশিখার ন্যায়(নিস্পন্দ) ও অবি- চ্ছেদে প্রবাহিত আত্মজ্ঞানের প্রবাহ। সত্যনিষ্ঠা, ব্রহ্মচর্য্য, অহিংসা, প্রতিগ্রহ বা পরকীয় দানগ্রহণ ত্যাগ, সংন্যাস, শৌচ(বাহ্য ও আন্তর শুদ্ধি), সন্তোষ ও মায়া বা অকপটতা প্রভৃতি বহুবিধ যম ও নিয়ম- সম্পন্ন * ও উক্তপ্রকার যাবজ্জীবন-ব্রতধারী সেই ব্যক্তি কোন্ প্রসিদ্ধ লোকটি লাভ করে? জ্ঞান ও কৰ্ম্ম দ্বারা জয় করিবার(পাই- বার) যোগ্য লোক ত বহুতরই আছে, তন্মধ্যে সেই ওঙ্কারের

প্রশ্নোপনিষৎ। ৯৩

অভিধ্যান দ্বারা সেই ব্যক্তি কোন লোকটিকে জয় করে অর্থাৎ নিজের আয়ত্ত বা প্রাপ্তিযোগ্য করিয়া লয়? এইরূপ প্রশ্নকারী সেই শৈব্যকে সেই পিপ্পলাদ বলিয়াছিলেন ॥ ৫৩॥ ১॥

এতদ্বৈ সত্যকাম পরঞ্চাপরঞ্চ ব্রহ্ম, যদোঙ্কারঃ।

তস্মাদ্বিদ্বাননেতৈনবায়তনেনকতরমন্বেতি ॥৫৪।২॥

[কিমুবাচ? ইত্যাহ]—এতদিতি। হে সত্যকাম, এতৎ বৈ(এব) পরং চ অপরং চ,(ব্রহ্ম, অক্ষরং পুরুষরূপং ব্রহ্ম পরং, প্রাণাখ্যং চ ব্রহ্ম অপরং, তদুভয়রূপং)[কিং তৎ?] যৎ ওঙ্কারঃ(প্রণবঃ)। তস্মাৎ(ওঙ্কারস্য পরাপর-ব্রহ্মস্বরূপত্বাৎ) বিদ্বান্(এবং জানন্ জনঃ) এতেন(ওঙ্কাররূপেণ) এব আয়তনেন(আশ্রয়েণ, ওঙ্কারাভিধ্যানেন ইত্যর্থঃ।) একতরং উভয়োমধ্যে পরম্ অপরং বা ব্রহ্ম) অন্বেতি(প্রাপ্নোতি),[পরাভিধ্যানেন পরম্, অপরাভি- ধ্যানেন চ অপরং ব্রহ্ম প্রাপ্নোতীত্যাশয়:]॥

[ কি বলিয়াছিলেন? তাহা কথিত হইতেছে]—হে সত্যকাম। যাহা ‘ওঙ্কার’ বলিয়া প্রসিদ্ধ, তাহাই পর ও অপর ব্রহ্মস্বরূপ। সেই হেতু বিদ্বান্ লোক এই আশ্রয়াবলম্বনেই উভয়ের মধ্যে একটি ব্রহ্ম প্রাপ্ত হন ॥ ৫৪।২ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

এতদ্বৈ সত্যকাম, এতদ্ ব্রহ্ম বৈ পরঞ্চ অপরঞ্চ ব্রহ্ম পরং সত্যমক্ষরং পুরুষা- খ্যম্, অপরঞ্চ প্রাণাখ্যং প্রথমজং যৎ তদোঙ্কার এব ওঙ্কারাত্মকম্ ওঙ্কারপ্রতীকত্বাৎ পরং হি ব্রহ্ম শব্দাদ্যপলক্ষণানইং সর্ব্বধর্মবিশেষবজ্জিতম্, অতো ন শক্যম্ অতী- ন্দ্রিয়গোচরত্বাৎ কেবলেন মনসা অবগাহিতুম্; ওঙ্কারে তু বিষ্ণুাদিপ্রতিমাস্থানীয়ে ভক্ত্যাবেশিতব্রহ্মভাবে ধ্যায়িনাং তৎ প্রসীদতি ইত্যবগম্যতে শাস্ত্রপ্রামাণ্যাৎ; তথা অপরঞ্চ ব্রহ্ম। তস্মাৎ পরঞ্চাপরঞ্চ ব্রহ্ম—যদোঙ্কার ইত্যুপচর্য্যতে। তস্মাদেবং বিদ্বান্ এতেনৈব আত্মপ্রাপ্তিসাধনেনৈব ওঁকারাভিধ্যানেন একতরং—পরমপরং বা অন্বেতি ব্রহ্মানুগচ্ছতি; নেদিষ্ঠং হ্যালম্বনমোঙ্কারো ব্রহ্মণঃ ॥৫৪।২৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

হে সত্যকাম, এই ব্রহ্ম পরও বটে, অপরও বটে। ‘পুরুষ-

৯৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

সংজ্ঞক সত্য অক্ষরস্বরূপ যে, পর ব্রহ্ম, আর প্রথমোৎপন্ন প্রাণসংজ্ঞক যে অপর ব্রহ্ম, তদুভয় ওঙ্কারস্বরূপই ওঙ্কারাত্মকই বটে,(ওঙ্কার হইতে অতিরিক্ত নহে); কারণ, ওঙ্কারই তদুভয়ের প্রতীক বা আলম্বন(*) সর্বপ্রকার বিশেষ ধর্ম্মবিবর্জিত পরব্রহ্ম শব্দাদি প্রমাণ-গম্য হন না; এই কারণেই ইন্দ্রিয়ের অগোচর বলিয়া, কেবল মনের দ্বারাও তাঁহাকে গ্রহণ করিতে পারা যায় না; কিন্তু বিষ্ণুপ্রভৃতির প্রতিমাস্থানীয় ওঙ্কারে যদি ভক্তিযোগে ব্রহ্মভাব স্থাপন করা যায়, তাহা হইলে, ধ্যানকারী উপাসকগণের সম্বন্ধে তিনি(পরব্রহ্ম) প্রসন্ন হন এবং সেইরূপ অপর ব্রহ্মও[প্রসন্ন হন], ইহা শাস্ত্রপ্রামাণ্য হইতে জানা যায়। সেই হেতুই ওঙ্কারে পর ও অপর ব্রহ্মভাবের উপচার বা আরোপ করা হয়। অতএব, এইপ্রকার জ্ঞানবান্ পুরুষ আত্মলাভের উপায়স্বরূপ এই ওঙ্কারের চিন্তা দ্বারাই একতর অর্থাৎ পর কিংবা অপর ব্রহ্ম প্রাপ্ত হন; কারণ ওঙ্কারই ব্রহ্মের অতিশয় সন্নিহিত বা অন্তরঙ্গ আলম্বন ॥৫৪॥২৷৷

স যদ্যেকমাত্রমভিধ্যায়ীত, স তেনৈব সংবেদিতস্তূর্ণমেব জগত্যামভিসম্পদ্যতে। তমৃচো মনুষ্যলোকমুপনয়ন্তে, স তত্র তপসা ব্রহ্মচর্য্যেণ শ্রদ্ধয়া সম্পন্নো মহিমানমনুভবতি ॥৫৫;৩৷৷

[ইদানীম্ ওঙ্কারাভিধ্যান প্রকারমাহ]—স যদীত্যাদিনা। সঃ(ধ্যাতা) একমাত্রং (একা মাত্রা হ্রস্বরূপা যস্য, তং তথোক্তম্ ওঙ্কারং) অভিধ্যায়ীত(উপাস্তে);

প্রশ্নোপনিষৎ। ৯৫

সঃ(উপাসকঃ) তেন(একমাত্রোঙ্কারাভিধ্যানেন) এব সংবেদিতঃ(লব্ধবোধঃ সন্) তূর্ণং(শীঘ্রং) এব জগত্যাং(পৃথিব্যাং) অভিসম্পদ্যতে(আগচ্ছতি)। ঋচঃ(ঋগ্বেদরূপা প্রথমমাত্রা) তং(উপাসকং) মনুষ্যলোকং উপনয়ন্তে(প্রাপ- য়ন্তি)। সঃ(উপাসকঃ) তত্র(মনুষ্যলোকে) তপসা, ব্রহ্মচর্য্যেণ, শ্রদ্ধয়া (আস্তিকবুদ্ধ্যা)[চ] সম্পন্নঃ(যুক্তঃ সন্) মহিমানম্(বিভূতিম্) অনুভবতি; [ন কদাপি দুর্গতিং লভতে ইত্যভিপ্রায়ঃ]।

সেই উপাসক যদি[ওঙ্কারকে] একমাত্রাযুক্তরূপে ধ্যান করেন,[তাহা হইলে] তিনি তাহা দ্বারাই সম্যক্ জ্ঞান লাভ করতঃ অবিলম্বে পৃথিবীতে আইসেন; ঋক্সমূহ অর্থাৎ ঋগ্বেদরূপা সেই একমাত্রাই তাহাকে মনুষ্যলোকে গমন করায়; তিনি সেখানে তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য ও শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়া মহিমা অনুভব করেন;(কখনও দুৰ্দ্দশাগ্রস্ত হন না) ॥ ৫৪ ॥ ৩ ॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

স যদ্যপি ওঙ্কারস্য সকলমাত্রাবিভাগজ্ঞো ন ভবতি, তথাপি ওঙ্কারাভিধ্যান- প্রভাবাৎ বিশিষ্টামের গতিং গচ্ছতি। এতদেকদেশজ্ঞানবৈগুণ্যতয়া ওঙ্কারশরণঃ কর্মজ্ঞানোভয়ভ্রষ্টো ন দুর্গতিং গচ্ছতি; কিন্তুহি? যদ্যপি এবমোঙ্কারমেব একমাত্রা- বিভাগজ্ঞ এব কেবলঃ অভিধ্যায়ীত-একমাত্রং সদা ধ্যায়ীত; স তেনৈব একমাত্রা- বিশিষ্টোঙ্কারাভিধ্যানেনৈব সংবেদিতঃ সম্বোধিতঃ ভূর্ণং ক্ষিপ্রমেব জগত্যাং পৃথিব্যাম্ অভিসম্পদ্যতে। কিং?-মনুষ্যলোকম্। অনেকানি হি জন্মানি জগত্যাং সংভবন্তি, তত্র তং সাধকং জগত্যাং মনুষ্যলোকমের ঋচ উপনয়ন্তে উপনি- গময়ন্তি। ঋচ ঋগ্বেদরূপা হোঙ্কারস্য প্রথমা একমাত্রা অভিধ্যাতা, তেন স তত্র মনুষ্যজন্মনি দ্বিজাগ্যঃ সন্ তপসা ব্রহ্মচর্য্যেণ শ্রদ্ধয়া চ সম্পন্ন মহিমানং বিভূতিম্ অনুভবতি, ন বীতশ্রদ্ধো যথেষ্টচেষ্টো ভবতি। যোগভ্রষ্টঃ কদাচিদপি ন দুর্গতিং গচ্ছতি ॥ ৫৫ ॥ ৩॥

ভাষ্যানুবাদ।

যদিও সে লোক ওঙ্কারের সমস্ত মাত্রায় অভিজ্ঞ নহে, তথাপি ওঙ্কারের অভিধ্যান-প্রভাবে বিশিষ্ট গতিই প্রাপ্ত হয়; অর্থাৎ ইহার একাংশ মাত্র-জ্ঞানরূপ অঙ্গহানি বশতঃ ওঙ্কার-শরণাপন্ন ব্যক্তি কৰ্ম্ম

৯৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

ও জ্ঞান হইতে বিচ্যুত হইয়া দুর্গতি লাভ করে না। তবে কি হয়? —যদিও সে ওঙ্কারের কেবল একটিমাত্র মাত্রাভিজ্ঞ হইয়া কেবলই ওঙ্কারের উপাসনা করুক, অর্থাৎ একমাত্রাত্মক প্রণবেরই অভিধ্যান করুক;[তথাপি] সে তাহা দ্বারাই—একমাত্রাবিশিষ্ট ওঙ্কারের অভিধ্যান-বলেই সংবেদিত অর্থাৎ সম্যক্ বোধ প্রাপ্ত হইয়া, অবিলম্বেই জগতে—পৃথিবীতে সমাগত হয়। কি[প্রাপ্ত হয়]? মনুষ্যলোক [প্রাপ্ত হয়]। জগতে বহুবিধ জন্মই সম্ভবপর হয়, তন্মধ্যে ঋকসমূহ, সেই সাধককে জগতে মনুষ্যলোকই প্রাপ্ত করায়। ঋক্ অর্থ ওঙ্কারের ঋগ্বেদরূপা প্রথম একটি মাত্রা। তাহা দ্বারা সেই লোক সেই মনুষ্য- জন্মে শ্রেষ্ঠ দ্বিজত্ব লাভ করতঃ তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য ও শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়া, মহিমা ঐশ্বর্য্য অনুভব করিয়া থাকে।[সেই লোক] শ্রদ্ধাহীন ও স্বেচ্ছাচারী হয় না; এবং যোগভ্রষ্ট(একদেশমাত্রজ্ঞ) ব্যক্তি কখনও দুর্গতি লাভ করে না ॥৫৫৷৩৷৷

অথ যদি দ্বিমাত্রেণ মনসি সম্পদ্যতে, সোহন্তরিক্ষং যজুর্ভি- রুম্নীয়তে সোমলোকম্।

স সোমলোকে বিভূতিমনুভূয় পুনরাবর্ত্ততে ॥৫৬।৪॥

অথ(পক্ষান্তরে)[ধ্যাতা] যদি দ্বিমাত্রেণ(দ্বিমাত্রাবিশিষ্টং)[ওঙ্কারং অভিধ্যায়ীত, তদা] মনসি(সোমদৈবতে অন্তঃকরণে) সম্পদ্যতে। সঃ(ধ্যাতা) [মরণানন্তরং] যজুর্ভিঃ(দ্বিমাত্রাত্মকৈঃ) অন্তরিক্ষং(অন্তরিক্ষস্থং) সোমলোকং (চন্দ্রলোকং) উন্নীয়তে। সঃ সোমলোকে বিভূতিং(ভোগসম্পদং) অনুভূয় (ভুক্ত্বা) পুনঃ(ভূয়ঃ) আবর্ত্ততে(মনুষ্যলোকং পুনরাগচ্ছতীত্যর্থঃ) ॥

[ ধ্যানকারী] যদি দ্বিমাত্রাবিশিষ্টরূপে ওঙ্কারের ধ্যান করে, তাহা হইলে মনে সম্পন্ন হয়, অর্থাৎ যজুর্ব্বেদময় অন্তঃকরণ প্রাপ্ত হয়। সে[মৃত্যুর পর] [ দ্বিতীয় মাত্রাত্মক] যজুর্ব্বেদকর্তৃক অন্তরিক্ষস্থ সোমলোকে নীত হয়; সে সোম- লোকে সম্পদ ভোগ করিয়া পুনর্ব্বার[ মনুষ্যলোকে] ফিরিয়া আইসে ॥ ৫৬ ॥৪॥

প্রশ্নোপনিষৎ। ৯৭

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

অথ পুনর্যদি দ্বিমাত্রাবিভাগজ্ঞো দ্বিমাত্রেণ বিশিষ্টমোঙ্কারম্ অভিধ্যায়ীত, স্বপ্না- ত্মকে মনসি মননীয়ে যজুৰ্ম্ময়ে সোমদৈবত্যে সম্পদ্যতে—একাগ্রতয়া আত্মভাবং গচ্ছতি। স এবং সম্পন্নো মৃতঃ অন্তরিক্ষম্ অন্তরিক্ষাধারং দ্বিতীয়মাত্রারূপং দ্বিতীয়- মাত্রারূপৈরেব যজুর্ভিঃ উন্নীয়তে সোমলোকং, সৌম্যং জন্ম প্রাপয়ন্তি তং যজূং- যীত্যর্থঃ। স তত্র বিভৃতিমনুভূয় সোমলোকে মনুষ্যলোকং প্রতি পুনরাবর্ত্ততে ॥৫৬৷৪॥ ভাষ্যানুবাদ।

পক্ষান্তরে[ধ্যাতা] যদি দ্বিতীয় মাত্রা-বিভাগজ্ঞ হইয়া দ্বিতীয় মাত্রাবিশিষ্ট ওঙ্কারের ধ্যান করে,[তাহা হইলে] সে লোক মনেতে সম্পন্ন হয়। এখানে মন অর্থ—মননীয়(চিন্তার বিষয়ীভূত) চন্দ্র- দৈবতক স্বপ্নশীল যজুর্ব্বেদ; একাগ্রতার ফলে তাহাতেই আত্মভাব লাভ করে। এইরূপ মনঃসম্পন্ন সেই লোক মৃত্যুর পর দ্বিতীয়মাত্রা- রূপীযজুর্ব্বেদকর্তৃকই অন্তরিক্ষ অর্থাৎ অন্তরিক্ষস্থ দ্বিতীয় চন্দ্রলোকে নীত হয়, অর্থাৎ যজুঃসমূহ তাহাকে সোম-লোকানুরূপ জন্ম প্রাপ্ত করায়। সে সেখানে বিভূতি অনুভব করিয়া, মনুষ্য-লোকাভিমুখে পুনশ্চ ফিরিয়া আইসে ॥৫৬৷৷৪৷৷

যঃ পুনরেতং ত্রিমাত্রেণৈবোমিত্যেতেনৈবাক্ষরেণ * পরং পুরুষমভিধ্যায়ীত; স তেজসি সূর্য্যে সম্পন্নঃ। যথা পাদো- দরস্তুচা বিনিৰ্ম্মচ্যতে, এবং হ বৈস পাপ্যনা বিনির্ম্মুক্তঃ, স সামভিরুন্নীয়তে ব্রহ্মলোকম্। স এতস্মাজ্জীবঘনাৎ পরাৎ- পরং পুরিশয়ং পুরুষমীক্ষতে। তদেতৌ শ্লোকৌ ভবতঃ ॥৫৭॥৫

যঃ পুনঃ এতং(ওঙ্কারং) ত্রিমাত্রেণ(মাত্রাত্রয়বিশিষ্টেন) এব ‘ওম্’ ইত্যেতেন এব অক্ষরেণ পরং(সূর্য্যান্তর্গতং) পুরুষং অভিধ্যায়ীত; সঃ তেজসি (তেজোময়ে) সূর্য্যে সম্পন্নঃ(তদ্ভাবমাপন্নঃ)[ভবতি]। পাদোদরঃ(সর্পঃ) যথা(যদ্বৎ) ত্বচা(নির্ম্মোকেণ) বিনির্মুচ্যতে(পরিত্যজ্যতে), এবং হ(এবমেব)

৯৮ প্রশ্নোপনিষৎ।

বৈ সঃ(সূর্যাভিসম্পন্নঃ পুরুষঃ) পাপনা(পাপেন)(বিনির্ম্মুক্তঃ সন্) সামভিঃ (ত্রিমাত্রাত্মকৈ:) ব্রহ্মলোকং(ব্রহ্মণঃ হিরণ্যগর্ভস্য সত্যনামকং লোকং) উন্নীয়তে। স এতস্মাৎ জীবঘনাৎ(জীবসমষ্টিরূপাৎ হিরণ্যগর্ভাৎ) পরং (উৎকৃষ্টং) পুরিশয়ং(হৃদয়পুণ্ডরীকস্থং) পুরুষং(পরমাত্মানং) ঈক্ষতে(ধ্যানেন পশ্যতীত্যর্থঃ)। তং(তস্মিন্ বিষয়ে) এতৌ(বক্ষ্যমাণৌ) শ্লোকৌ(সং- ক্ষেপার্থকৌ মন্ত্রৌ) ভবতঃ ॥ ৫৭ ॥ ৫ ॥

কিন্তু, যে লোক ত্রিমাত্রাযুক্ত ‘ওম্’ এই অক্ষর দ্বারাই পরম পুরুষের উপাসনা করে, সেই লোক তেজোময় সূর্য্যে অভেদভাব প্রাপ্ত হয়। পাদোদর (সর্প) যেরূপ ত্বক্ কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়, ঠিক এইরূপ সেই লোকও পাপবিনি- মুক্ত হয়। সেই লোক সামবেদকর্তৃক ব্রহ্মলোকে উন্নীত হয়, সে এই শ্রেষ্ঠ জীবসমষ্টিময়(হিরণ্যগর্ভ) অপেক্ষাও উত্তম হৃদয়স্থ পুরুষকে(পরমাত্মাকে) দর্শন করে। এবিষয়ে এই দুইটি শ্লোক আছে ॥ ৫৭ ॥ ৫ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

যঃ পুনঃ এতম্ ওঁঙ্কারং ত্রিমাত্রেণ ত্রিমাত্রাবিষয়বিজ্ঞানবিশিষ্টেন ওমিত্যে- তেনৈব অক্ষরেণ প্রতীকত্বেন পরং সূর্য্যান্তর্গতং পুরুষম্ অভিধ্যায়ীত; তেন অভি- ধ্যানেন প্রতীকত্বেন হ্যালম্বনত্বং প্রকৃতমোঙ্কারস্য, “পরঞ্চাপরঞ্চ ব্রহ্ম” ইত্যভেদ- শ্রুতেঃ, ওঙ্কারমিতি চ দ্বিতীয়া অনেকশঃ শ্রুতা বধ্যেত অন্যথা। যদ্যপি তৃতীয়া- ভিধানত্বেন করণত্বম্ উপপদ্যতে, তথাপি প্রকৃতানুরোধাৎ ‘ত্রিমাত্রং পরং পুরুষম্’ ইতি দ্বিতীয়ৈব পরিণেয়া “ত্যজেদেকং কুলস্যার্থে” ইতি ন্যায়েন।

স তৃতীয়মাত্রারূপে তেজসি সূর্য্যে সম্পন্নো ভবতি ধ্যায়মানঃ, মৃতোহপি সূৰ্য্যাৎ সোমলোকাদিবৎ ন পুনরাবর্ততে, কিন্তু সূর্য্যে সম্পন্নমাত্র এব। যথা পাদোদরঃ সর্পঃ ত্বগ বিনিৰ্ম্মচ্যতে জীর্ণত্বগিনিৰ্ম্মুক্তঃ স পুনর্নবো ভবতি, এবং হ বৈ এষ যথা দৃষ্টান্তঃ, স পাপ্মনা সর্পত্বস্থানীয়েন অশুদ্ধিরূপেণ বিনিৰ্ম্মক্তঃ সামভিঃ তৃতীয়মাত্রা- রূপৈঃ উরূর্দ্ধমুন্নীয়তে ব্রহ্মলোকং-হিরণ্যগর্ভস্য ব্রহ্মণো লোকং সত্যাখ্যম্। স হিরণ্যগর্ভঃ সর্ব্বেষাং সংসারিণাং জীবানাম্ আত্মভূতঃ। স হন্তরাত্মা লিঙ্গরূপেণ সর্ব্বভূতানাং, তস্মিন্ হি লিঙ্গাত্মনি সংহতাঃ সর্ব্বে জীবাঃ, তস্মাৎ স জীবঘনঃ; স বিদ্বান্ ত্রিমাত্রৌঙ্কারাভিজ্ঞ এতস্মাজ্জীবঘনাৎ হিরণ্যগর্ভাৎ পরাৎপরং পরমাত্মাখ্যং

প্রশ্নোপনিষৎ। ৯৯

পুরুষমীক্ষতে, পুরিশয়ং সর্ব্বশরীরানুপ্রবিষ্টং পশ্যতি ধ্যায়মানঃ। তৎ এতৌ অস্মিন্ যথোক্তার্থপ্রকাশকৌ শ্লোকো মন্ত্রো ভবতঃ ॥৫৭৷৷৫৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

পরন্তু যে লোক মাত্রাত্রয়বিষয়ক বিজ্ঞানের বিষয়ীভূত ‘ওম্’ এই অক্ষরাত্মক প্রতীকভাবে ওঙ্কাররূপী সূর্য্যান্তর্গত পুরুষকে ধ্যান করে, সেই অভিধ্যানের ফলে ধ্যায়মান(ধ্যানের বিষয়ীভূত) তৃতীয়- মাত্রারূপী সেই সাধক মৃত্যুর পরও তেজোময় সূর্য্যে মিলিত হয়, চন্দ্র- লোকাদির ন্যায় সূর্য্য হইতে আর প্রত্যাবৃত্ত হয় না; পরন্তু সূর্য্য রূপেই থাকে। “পরঞ্চ অপরঞ্চ ব্রহ্ম” এই অভেদবোধক শ্রুতি হইতে [জানা যায় যে,] ব্রহ্মপ্রতীকরূপে ওঙ্কারের অবলম্বনত্ব প্রতিপাদন করাই এখানে প্রস্তাবিত বা অভিপ্রেত,[কিন্তু ওঙ্কারে সাধনত্ব প্রতি- পাদন করা নহে]। ইহা না হইলে ‘বহুস্থলে ওঙ্কার শ্রুত সম্বন্ধে দ্বিতীয়া বিভক্তি বাধিত হইয়া যায়। যদিও[‘ওম্’ ইত্যেতেন”, এই তৃতীয়া বিভক্তি অনুসারে ওঙ্কারের করণত্বও উপপন্ন হইতে পারে বটে, তথাপি, প্রস্তাবানুরোধে ‘বংশের কল্যাণার্থ একজনকে ত্যাগ করিবে,’ এই নিয়মানুসারে[তৃতীয়াকেই] দ্বিতীয়া বিভক্তিতে বিপরিণত করিয়া ‘ত্রিমাত্রং পরং পুরুষং’ এইরূপ করিতে হইবে।

পাদোদর—সর্প যেরূপ ত্বক্কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়, অর্থাৎ জীর্ণ ত্বক্ ত্যাগ করিয়া, পুনশ্চ সে নূতনত্ব প্রাপ্ত হয়। এইরূপই—ঠিক এই দৃষ্টান্তটি যেরূপ, সেইরূপই—সর্পত্বস্থানীয় অশুদ্ধিরূপ পাপ হইতে বিনির্ম্মুক্ত হইয়া, তৃতীয়-মাত্রারূপ সামবেদ সমূহকর্তৃক উর্দ্ধে ব্রহ্মলোকে, অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভের সত্য-লোকে উন্নীত হয়, সেই হিরণ্য- গর্ভই সমস্ত সংসারী জীবনিবহের আত্মস্বরূপ। কারণ, তিনিই লিঙ্গ- দেহরূপে সর্বভূতের অন্তরাত্মা; সমস্ত জীবই সেই লিঙ্গরূপী হিরণ্য- গর্ভে রাশীকৃত হইয়া রহিয়াছে; সুতরাং তিনি ‘জীবঘন’ শব্দ বাচ্য।

১০০ প্রশ্নোপনিষৎ।

মাত্রাত্রয়াত্মক ওঙ্কারাভিজ্ঞ সেই ধ্যানকারী পুরুষ, এই হিরণ্যগর্ভরূপী উত্তম জীবঘন অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ ও পুরিশয় অর্থাৎ সর্বশরাভাভ্যন্তরে প্রবিষ্ট সেই ‘পরমাত্ম’-সংজ্ঞক পুরুষকে দর্শন করিয়া থাকে। এ বিষয়ে উক্তার্থ-প্রকাশক দুইটি মন্ত্র আছে ॥৫৭৷৫॥

তিস্রো মাত্রা মৃত্যুমত্যঃ প্রযুক্তা অন্যোন্যসক্তা অনবিপ্রযুক্তাঃ। ক্রিয়াসু বাহ্যাভ্যন্তরমধ্যমাসু সম্যক্ প্রযুক্তাসু ন কম্পতে জ্ঞঃ ॥৫৮৷৷৬৷৷

[ প্রথম মন্ত্রমাহ]—তিস্রঃ(ত্রিসংখ্যাকাঃ) মাত্রাঃ(মীয়ন্তে জ্ঞায়ন্তে অধ্যাত্মা- ধিভূতাধিদৈববিষয়া যাভিঃ, তাঃ অকারোকারমকাররূপাঃ)[একৈকশঃ] প্রযুক্তাঃ (চেৎ) মৃত্যুমত্যঃ(ন তদুপাসনয়া মৃত্যুভয়ম্ অভিক্রামতি ইতিভাবঃ); অন্যোন্য- সক্তাঃ(পরস্পরসম্বন্ধাঃ)[চেৎ] অনবিপ্রযুক্তাঃ(ধ্যানকালে একস্মিন্ বিষয়ে প্রযুক্তাঃ বিপ্রযুক্তাঃ বিশেষেণ প্রযুক্তা ইত্যর্থঃ, ন বিপ্রযুক্তাঃ অবিপ্রযুক্তাঃ, ন অবিপ্রযুক্তাঃ—অনবিপ্রযুক্তাঃ, বিপ্রযুক্তা এবেত্যর্থঃ)। বাহ্যাভ্যন্তর-মধ্যমাসু (জাগ্রৎ-স্বপ্ন-সুষুপ্তিপুরুষবিষয়াসু) ক্রিয়াসু(ব্যাপারেষু) সম্যক্(যথাযথং) প্রযুক্তাসু(সতীষু) জ্ঞঃ(ওঙ্কার-ব্রহ্মবিৎ পুরুষঃ) ন কম্পতে(ন চলতি), [ন কুতশ্চিৎ বিভেতীত্যাশয়ঃ] ॥

ওঙ্কারের তিনটি মাত্রা(উপাসনাকালে) পৃথক্ পৃথক্ প্রযুক্ত হইলে, মৃত্যুর অধিকার অতিক্রম করিতে পারে না—মৃত্যুমতীই থাকে; আর পরস্পরে সম্বদ্ধ করিলেই উহারা যথাযথভাবে প্রযুক্ত হয়, অবিপ্রযুক্ত হয় না। যথোপযুক্ত- রূপে সম্পাদিত বাহ্য, আভ্যন্তর ও তন্মধ্যপাতী জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি অবস্থা- প্রাপ্তিরূপ ক্রিয়াতে জ্ঞানী পুরুষ আর বিচলিত হন না ॥৫৮৷৷৬৷৷

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

তিস্রঃ ত্রিসংখ্যাকা অকারোকার-মকারাখ্যা: ওঁকারস্য মাত্রাঃ, মৃত্যুমত্যঃ— মৃত্যুর্যাসাং বিদ্যতে, তা মৃত্যুমত্যঃ, মৃত্যুগোচরাদনতিক্রান্তা মৃত্যুগোচরা এবে- ত্যর্থঃ। তা আত্মনো ধ্যানক্রিয়াসু প্রযুক্তাঃ। কিঞ্চ অন্যোন্যসক্তাঃ ইতরে-

প্রশ্নোপনিষৎ। ১০১

তরসম্বদ্ধাঃ, অনবিপ্রযুক্তা বিশেষেণ একৈকবিষয় এব প্রযুক্তা বিপ্রযুক্তাঃ, ন তথা বিপ্রযুক্তা অবিপ্রযুক্তাঃ, ন অবিপ্রযুক্তা অনবিপ্রযুক্তাঃ, কিং তর্হি? বিশেষেণ একস্মিন্ ধ্যানকালে তিসৃষু ক্রিয়াসু বাহ্যাভ্যন্তরমধ্যমাসু জাগ্রৎ-স্বপ্ন-সুষুপ্তস্থান- পুরুষাভিধ্যানলক্ষণাসু যোগক্রিয়াসু যুক্তাসু সম্যক্ প্রযুক্তাসু সম্যগ্ ধ্যানকালে প্রযোজিতাসু ন কম্পতে ন চলতি জ্ঞো যোগী যথোক্তবিভাগজ্ঞঃ ওঙ্কারস্যেত্যর্থঃ। ন তস্যৈবংবিদশ্চলনমুপপদ্যতে। যম্মাজ্জাগ্রৎ-স্বপ্ন-সুষুপ্তপুরুষাঃ সহ স্থানৈর্মাত্রা- এয়রূপেণ ওঙ্কারাত্মরূপেণ দৃষ্টাঃ, স হ্যেবং বিদ্বান্ সর্ব্বাত্মভূত ওঙ্কারময়ঃ কুতো বা চলেৎ কস্মিন্ বা ॥৫৮৷৷৬৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

ওঙ্কারের অকার, উকার ও মকারনামক মাত্রা ত্রয়(এই তিনটি মাত্রা) আত্মার ধ্যানকার্য্যে প্রযুক্ত বা ব্যবহৃত[হইলেও উহারা] মৃত্যুমতী—মৃত্যুর অধিকার অতিক্রম করিতে পারে না, অর্থাৎ নিশ্চয়ই ইহারা মৃত্যুর(বিনাশের) অধীন থাকে। পরন্তু সম্যক্ প্রযুক্ত অর্থাৎ যথাযথভাবে আরব্ধ বাহ্য, আভ্যন্তর ও মধ্যম অর্থাৎ জাগ্রৎ স্বপ্ন ও সুষুপ্তি অবস্থা, তাহাদের স্থান(আশ্রয়) ও তৎকালীন পুরু- ষের ধ্যানরূপ, যোগ ক্রিয়ায়[যদি সেই মাত্রাত্রয়] অন্যোন্য-সক্ত অর্থাৎ পরস্পর সম্বদ্ধভাবে অনবিপ্রযুক্ত হয়, অর্থাৎ বিশেষভাবে একই বিষয়ের ধ্যানে প্রযুক্ত হয়,[তাহা হইলে] জ্ঞানী—ওঙ্কারের উক্ত বিভাগজ্ঞ যোগী কম্পিত অর্থাৎ ভয়ে বিচলিত হন না।(১) উক্ত-

১০২ প্রশ্নোপনিষৎ।

প্রকার বিদ্বান্ ব্যক্তির বিচলিত হওয়া সম্ভবপর হয় না; যেহেতু জাগ্রৎ স্বপ্ন ও সুষুপ্ত পুরুষগণ(জীবগণ) স্বস্ব স্থান সহ এক যোগে মাত্রাত্রয়রূপ ওঙ্কার স্বরূপে পরিদৃষ্ট হইয়াছে; সর্বভূতে আত্মভাবাপন্ন ও ওঙ্কারময় উক্ত বিদ্বান্ কি হেতুতে কোথায় বা বিচলিত হইবে? “অনবিপ্রযুক্ত” কথার অর্থ এইরূপ—একই বিষয়ে বিশেষভাবে যাহা প্রযুক্ত হয়, তাহা বিপ্রযুক্ত; যাহা যেরূপ নহে—একই বিষয়ে প্রযুক্ত না হইয়া পৃথক্ পৃথক্ বিষয়ে প্রযুক্ত হয়, তাহা অবি-প্রযুক্ত; যাহা অবিপ্রযুক্ত নহে, তাহাই অনবিপ্রযুক্ত, অর্থাৎ ধ্যানসময়ে একই বিষয়ে প্রযুক্ত ॥৪৮৷৬৷৷

ঋগ্‌ভিরেতং যজুভিরন্তরিক্ষং(১) সামভির্য্যৎ কবয়ো বেদয়ন্তে। তমোঙ্কারেণৈবায়তনেনান্বেতি বিদ্বান্, যত্তচ্ছান্তমজরমমৃত মভয়ং পরঞ্চেতি ॥৫৯৷৭৷ ইত্যথর্ব্ববেদীয়-প্রশ্নোপনিষদি পঞ্চমঃ প্রশ্নঃ ॥৫॥

[ইদানীং দ্বিতীয়ং মন্ত্রমাহ]—ঋগ্‌ভিরিত্যাদি। ঋগ্‌ভিঃ(প্রথমমাত্রারূপৈঃ) এতং লোকং(মনুষ্যলোকং), যজুর্ভিঃ(দ্বিতীয়মাত্রারূপৈঃ) অন্তরিক্ষং(অন্তরিক্ষস্থং সোমলোকমিত্যর্থঃ) কবয়ঃ(ক্রান্তদর্শিনঃ) যৎ(স্থানং) বেদয়ন্তে(জানন্তি)। সামভিঃ(তৃতীয়মাত্রারূপৈঃ) তৎ(ব্রহ্মলোকাখ্যং স্থানং) অন্বেতি(প্রাপ্নোতি) [ বিদ্বানিতি শেষঃ],[ কিং বহুনা] বিদ্বান্(ওঙ্কারস্য মাত্রাবিভাগজ্ঞঃ) ওঙ্কারেণ আয়তনেন(আলম্বনেন) যৎ তৎ(বেদান্ত প্রসিদ্ধং) শান্তম্(রাগাদিদোষ- রহিতম্) অজরম্(জরারহিতম্) অমৃতম্(মরণাদিদোষরহিতম্), অভয়ং(দ্বৈতা-

প্রশ্নোপনিষৎ। ১০৩

ভাবাৎ ভয়বজ্জিতং) পরং(সর্ব্বোৎকৃষ্টং ব্রহ্ম), তং চ(তদপি)[ অন্বেতীতি শেষঃ],[ অপি শব্দাৎ অপরং ব্রহ্মাপি অন্বেতীত্যাশয়ঃ]।

ঋগ্বেদ দ্বারা এই মনুষ্যলোক, যজুর্ব্বেদ দ্বারা অন্তরিক্ষস্থ চন্দ্রলোক এবং সামবেদ দ্বারা সেই স্থান(ব্রহ্মলোক) প্রাপ্ত হয়, যাহা কবিগণ(পণ্ডিতগণ) অবগত আছেন।[অধিক কি,] বিদ্বান্ পুরুষ এই ওঙ্কারালম্বন দ্বারাই সেই যে, শান্ত, অজর, অমৃত ও অভয় পরব্রহ্ম, তাঁহাকে প্রাপ্ত হইয়া থাকেন ॥৫৯৷৭॥]

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

ইতি পঞ্চম প্রশ্ন সমাপ্ত।

সর্ব্বার্থসংগ্রহার্থো দ্বিতীয়ো মন্ত্রঃ-ঋভিঃ এতং লোকং মনুষ্যোপলক্ষিতম্। যজুভিরন্তরিক্ষং সোমাধিষ্ঠিতম্। সামভিঃ যৎ তদ্‌ব্রহ্মলোকমিতি তৃতীয়ং কবয়ো মেধাবিনো বিদ্যাবন্ত এব নাবিদ্বাংসো বেদয়ন্তে। তং ত্রিবিধং লোকম্ ওঙ্কারেণ সাধনেন অপরব্রহ্মলক্ষণম্ অন্বেতি অনুগচ্ছতি বিদ্বান্। তেনৈব ওঙ্কারেণ যত্তৎ পরং ব্রহ্মাক্ষরং সত্যং পুরুষাখ্যং শান্তং বিমুক্ত জাগ্রৎস্বপ্নসুষুপ্ত্যাদিবিশেষং সর্ব্বপ্রপঞ্চ- বিবর্জিতম্; অতএব অজরং জরাবর্জিতম্ অমৃতং মৃত্যুবর্জিতমেব। যস্মাৎ জরাদি- বিক্রিয়ারহিতম্ অতঃ অভয়ম্, যস্মাদেবাভয়ং, তস্মাৎ পরং নিরতিশয়ম্। তদপি ওঙ্কারেণৈব আয়তনেন গমনসাধনেন অন্বেতীত্যর্থঃ। ইতি শব্দো বাক্যপরি- সমাপ্ত্যর্থঃ ॥ ৫৯ ॥ ৭ ॥

ইতি শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ প্রশ্নোপনিষদভাষ্যে

পঞ্চমঃ প্রশ্নঃ সমাপ্তঃ ॥৫॥

ভাষ্যানুবাদ।

উক্ত সর্ব্বার্থপ্রকাশক দ্বিতীয় মন্ত্র এই—ঋক্ সমূহ দ্বারা মনুষ্যযুক্ত এই লোক, যজুঃসমূহ দ্বারা চন্দ্রাধিষ্ঠিত অন্তরিক্ষ লোক এবং সামসমূহ দ্বারা সেই স্থান[প্রাপ্ত হন], যাহা কেবল কবি অর্থাৎ মেধাবী পণ্ডিত- গণ ভিন্ন অপণ্ডিতগণ জানে না। বিদ্বান্ পুরুষ সেই ওঙ্কার সাধন দ্বারা অপর ব্রহ্মরূপ ত্রিবিধ স্থান প্রাপ্ত হন, সেই ওঙ্কার সাধন দ্বারাই সেই

১০৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

যে অক্ষর, সত্যস্বরূপ, শান্ত অর্থাৎ জাগ্রৎ-স্বপ্নাদি সর্বপ্রকার বিশেষ অবস্থাবর্জিত, এই কারণেই অজর জরাবর্জিত এবং নিশ্চয়ই অমৃত— মৃত্যু রহিত, এবং যে হেতু জরা ও বিকারাদিরহিত, সেই হেতুই অভয়; যেহেতু অভয়, সেই হেতুই পর অর্থাৎ যদপেক্ষা অতিশয় কিছু নাই, সেই পুরুষসংজ্ঞক পর ব্রহ্মকে ও ওঙ্কাররূপ আয়তন বা গমন-সাধন দ্বারাই লাভ করেন। ‘ইতি’ শব্দটি বাক্য পরিসমাপ্তি জ্ঞাপক ॥৫৯৷৭৷৷

ইতি প্রশ্নোপনিষদ্ ভাষ্যানুবাদে পঞ্চম প্রশ্ন সমাপ্ত ॥৫॥

প্রশ্নোপনিষদ্।

অথ ষষ্ঠঃ প্রশ্নঃ।

অথ হৈনং সুকেশা ভারদ্বাজঃ পপ্রচ্ছ—ভগবন্ হিরণ্যনাভঃ কৌসল্যো রাজপুত্রো মামুপেত্যৈতং প্রশ্নমপৃচ্ছত,—ষোড়শ- কলং ভারদ্বাজ পুরুষং বেথ? তমহং কুমারমব্রুবং, নাহমিমং বেদ, যদ্যহমিমমবেদিষং, কথং তে নাবক্ষ্যমিতি। সমূলো বা এষ পরিশুয্যতি; যোহনৃতমভিবদতি, তস্মান্নাহাম্যনৃতং বক্তুম্। স তৃষ্ণীং রথমারুহ্য প্রবব্রাজ। তং ত্বা পৃচ্ছামি—কাসৌ পুরুষ ইতি ॥ ৫০ ॥ ১ ॥

[ইদানীং মুণ্ডকোপনিষদুক্তয়োঃ “গতাঃ কলাঃ পঞ্চদশ প্রতিষ্ঠাঃ” ইতি, “যথা নদ্যঃ স্যন্দমানাঃ সমুদ্রে” ইত্যেতয়োর্মন্ত্রয়োর্বিস্তরার্থং ষষ্ঠঃ প্রশ্ন: আরভ্যতে।]- অথ(শৈব্যপ্রশ্নানন্তরং) সুকেশা নাম ভারদ্বাজঃ(ভরদ্বাজতনয়ঃ) হ(কিল) এনং(পিপ্পলাদং) পপ্রচ্ছ,-ভগবন্ কৌসল্যঃ(কোসলাধিপতিঃ) হিরণ্যনাভঃ (তন্নামকঃ) রাজপুত্রঃ(ক্ষত্রিয়কুমারঃ) মাং(ভারদ্বাজং) উপেত্য(অভ্যাগত্য) এতং(বক্ষ্যমাণং) প্রশ্নং পপ্রচ্ছ(পৃষ্টবান্),-হে ভারদ্বাজ,[ত্বং] ষোড়শকলং (ষোড়শসংখ্যাকাঃ কলা অবয়বা যস্য; তং) পুরুষং বেখ(জানাসি?) [ইতি]। অহং তং কুমারম্(রাজপুত্রম্) অক্রবং(উক্তবান্)-অহম্ ইমং (ত্বদুক্তং পুরুষং) ন বেদ(জানামি), অহং যদি ইমম্ অবেদি(জ্ঞাতবান্ স্যাম,) [তর্হি] তে(তুভ্যং) কথং ন অবক্ষ্যম্(ন কথয়েরম্)? ইতি। যঃ(পুরুষঃ) অনৃতং(অসত্যং) বদতি(জ্ঞাতমপি গোপায়তি), এষঃ বৈ(নিশ্চয়ে) সমূলঃ (মূলেন শুভকর্ম-জ্ঞানাদিনা সহ বর্ততে যঃ, সঃ সমূলঃ বৈ(এব) পরিশুয্যতি (ইহলোক-পরলোকাভ্যাং বিচ্ছিদ্যতে), তস্মাৎ(হেতোঃ) অনৃতং(অসত্যং) বক্তুং ন অর্হামি(শক্লোমি)। সঃ(রাজকুমারঃ) তৃষ্ণীং(অসম্ভাষ্য কিঞ্চিৎ)

১০৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

রথম্ আরুহ্য প্রবব্রাজ(প্রস্থিতঃ)।[অহমপি] ত্বা(ত্বাং) তং(প্রশ্নং) পৃচ্ছামি যৎ, অসৌ(কথিতঃ) পুরুষঃ ক(কুত্র)[বর্ত্ততে] ইতি ॥

শৈব্য-প্রশ্নের অনন্তর সুকেশানামক ভারদ্বাজ ইঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন— ভগবন্! কোসলাধিপতি হিরণ্যনাভনামক রাজকুমার আমার সমীপে সমাগত হইয়া এই প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন যে, ‘হে ভারদ্বাজ![আপনি] ষোড়শ.. কলা(অবয়ব)-বিশিষ্ট পুরুষকে জানেন?’ আমি সেই কুমারকে বলিয়াছিলাম যে, ‘না—আমি ইঁহাকে(পুরুষকে) জানি না; আমি যদি ইহাকে জানিতাম, [তাহা হইলে] কেন তোমাকে বলিতাম না, অর্থাৎ যদি জানিতাম, তবে নিশ্চয়ই বলিতাম। যে লোক অসত্য বলে, সে সমূলে শুষ্ক হইয়া যায়, সেই হেতু আমি অসত্য বলিতে পারি না। তিনি চুপ করিয়া রথে আরোহণ করিয়া প্রস্থান করিল।[এখন]: আপনাকে তাহা জিজ্ঞাসা করিতেছি—‘সেই পুরুষ কোথায় থাকেন?’ ইতি॥ ৫০॥ ১॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

অথ হ এনং সুকেশা ভারদ্বাজঃ পপ্রচ্ছ—সমস্তং জগৎ কার্য্যকারণলক্ষণং সহ বিজ্ঞানাত্মনা পরস্মিন্ অক্ষরে সুষুপ্তিকালে সম্প্রতিষ্ঠিত ইত্যুক্তম্। তৎসামর্থ্যাৎ প্রলয়েহপি তস্মিন্নেবাক্ষরে সম্প্রতিষ্ঠতে। জগৎ তত এবোৎপদ্যত ইতি চ সিদ্ধং ভবতি; ন হ্যকারণে কার্য্যস্য সম্প্রতিষ্ঠানমুপপদ্যতে। উক্তঞ্চ ‘আত্মন.এষ প্রাণো জায়তে’ ইতি। জগতশ্চ যন্মূলং, তৎ-পরিজ্ঞানাৎ পরং শ্রেয় ইতি সর্ব্বোপনিষদাং নিশ্চিতোহর্থঃ। অনন্তরঞ্চ উক্তং “স সর্ব্বজ্ঞঃ সর্ব্বো ভবতি” ইতি। বক্তব্যঞ্চ ক তর্হি তদক্ষরং সত্যং পুরুষাখ্যং বিজ্ঞেয়মিতি। তদর্থোহয়ং প্রশ্ন আরভ্যতে।

বৃত্তান্তাখ্যানঞ্চ বিজ্ঞানস্য দুর্লভত্বখ্যাপনেন * তল্লব্ধ্যর্থং মুমুক্ষূণাং যত্নবিশেষোৎ- পাদনার্থম্। হে ভগবন্ হিরণ্যনাভঃ নামতঃ কোসলায়াং ভবঃ কৌসল্য: রাজপুত্রঃ জাতিতঃ ক্ষত্রিয়ঃ মাম্ উপেত্য উপগম্য এতম্ উচ্যমানং প্রশ্নম্ অপৃচ্ছত। ষোড়শ- কলং ষোড়শসংখ্যাকাঃ কলা অবয়বা ইব আত্মনি অবিদ্যাধ্যারোপিতরূপা যস্মিন্ পুরুষে, সোহয়ং ষোড়শকলঃ, তং ষোড়শকলং হে ভারদ্বাজ পুরুষং বেথ বিজানাসি? তমহং রাজপুত্রং কুমারং পৃষ্টবন্তম্ অক্রবম্ উক্তবানস্মি নাহমিমং বেদ যৎ ত্বং পৃচ্ছ- সীতি। এবমুক্তবত্যপি ময়ি অজ্ঞানমসম্ভাবয়ন্তং তমজ্ঞানে কারণমবাদিষম্। যদি

* জ্ঞাপনেনোতি বা পাঠঃ।

প্রশ্নোপনিষৎ। ১০৭

কথঞ্চিৎ অহম্ ইমং ত্বয়া পৃষ্টং পুরুষম্ অবেদিষং বিদিতবানস্মি, কথম্ অত্যন্ত- শিষ্যগুণবতেহর্থিনে তে তুভ্যং নাবক্ষ্যং নোক্তবানস্মি ন ক্রয়ামিত্যর্থঃ। ভূয়োহপি অপ্রত্যয়মেবালক্ষ্য প্রত্যায়য়িতুম্ অব্রবম্—সমূলঃ সহ মূলেন বৈ, এযোহন্যথা সন্তমাত্মানম্ অন্যথা কুর্ব্বন্ যঃ অনৃতম্ অযথাভূতার্থম্ অভিবদতি, স পরিশুষ্যতি শোষমুপৈতি ইহলোকপরলোকাভ্যাং বিচ্ছিদ্যতে বিনশ্যতি। যত এবং জানে তস্মাৎ নার্মামি অহমনৃতং বক্তুং মুঢ়বৎ। স রাজপুত্রঃ এবং প্রত্যায়িতঃ তৃষ্ণীং ব্রীড়িতঃ রথমারুহ্য প্রবব্রাজ প্রগতবান্ যথা গতমেব। অতো ন্যায়ত উপসন্নায় যোগ্যায় জানতা বিদ্যা বক্তব্যৈব, অনৃতঞ্চ ন বক্তব্যং সর্ব্বাস্বপি অবস্থাসু ইত্যেতৎ সিদ্ধং ভবতি। তং পুরুষং ত্বা ত্বাং পৃচ্ছামি, মম হৃদি বিজ্ঞেয়ত্বেন শল্যমিব মে হৃদি স্থিতং, কাসৌ বর্ত্ততে বিজ্ঞেয়ঃ পুরুষ ইতি ॥ ৫০॥ ১॥

ভাষ্যানুবাদ।

অনন্তর ভরদ্বাজ-তনয় সুকেশা ইহাঁকে(পিপ্পলাদকে) জিজ্ঞাসা করিলেন—সুষুপ্তি সময়ে কার্য্য-কারণাত্মক সমস্ত জগৎ বিজ্ঞানাত্মা জীবের সহিত প্রসিদ্ধ অক্ষর ব্রহ্মে সম্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়, ইহা উক্ত হইয়াছে। এই নিয়মানুসারে ইহাও সিদ্ধি হয় যে, এই জগৎ প্রলয়-সময়েও সেই অক্ষরেই সম্যক্ প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং তাহা হইতেই[পুনশ্চ] উৎপন্ন হয়, কারণ যাহা কারণ নহে, তাহাতে কখনই কার্য্যের প্রতিষ্ঠা বা বিলয় হইতে পারে না। ‘আত্মা হইতে প্রাণ উৎপন্ন হয়’ এই কথাও[শ্রুতিতে] উক্ত আছে। জগতের যাহা মূল কারণ, তাহার পরিজ্ঞানেই পরম শ্রেয়ঃ প্রাপ্ত হয়, ইহাই সমস্ত উপনিষদের নিশ্চিত বা সিদ্ধান্তিত অর্থ। অব্যবহিত পূর্ব্বেও কথিত হইয়াছে যে, ‘তিনি সর্ব্বজ্ঞ ও সর্বাত্মক হন’। সুতরাং, পুরুষসংজ্ঞক সেই সত্য অক্ষরকে(ব্রহ্মকে) কোথায় জানিতে হইবে, ইহা বলা উচিত; সেই উদ্দেশেই এই ষষ্ঠ প্রশ্ন আরব্ধ হইতেছে। আখ্যায়িকায় বিজ্ঞানের দুর্লভতা জ্ঞাপন করায় তদুদ্দেশে যে মুমুক্ষুগণের বিশেষ চেষ্টা করা আবশ্যক, তৎপ্রতিপাদনার্থই আখ্যায়িকার অবতারণা করা হইয়াছে।

১০৮ প্রশ্নোপনিষৎ।

হে ভগবন্ কোসলাদেশোৎপন্ন-কৌসল্য-রাজপুত্র অর্থাৎ জাতিতে ক্ষত্রিয়, হিরণ্যনাভ আমার সমীপে উপস্থিত হইয়া কথ্যমান প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, আত্মা নিরবয়ব হইলেও অবিদ্যা দ্বারা তাহাতে অবয়বেরই ষোলটি অংশ অধ্যারোপিত হইয়া থাকে; সেই ষোড়শ- সংখ্যক কলা বা অবয়ব যে পুরুষে অবস্থিত আছে, হে ভারদ্বাজ! সেই ষোড়শ কলাবিশিষ্ট পুরুষকে তুমি কি জান? আমি সেই প্রশ্নকারী রাজ- কুমারকে বলিয়াছিলাম যে, ‘তুমি যাহা জিজ্ঞাসা করিতেছ, তাহা আমি জানি না।‘আমি একথা বলিলেও তিনি আমার অজ্ঞানবিষয়ে অর্থাৎ আমি যে তাহা জানি, না, একথায় যেন বিশ্বাস করিতে পারিতেছেন না, দেখিয়া আমার অজ্ঞানের কারণ বলিয়াছিলাম-‘আমি যদি তোমার জিজ্ঞাসিত এই পুরুষকে কিছুমাত্র জানিতাম,[তাহা হইলে] অত্যন্ত শিষ্যগুণসম্পন্ন ও শিক্ষার্থী তোমাকে কেন না বলিব? অর্থাৎ অবশ্যই বলিতাম। পুনশ্চ তাঁহার অবিশ্বাসের ভাব দেখিয়া, বিশ্বাস উৎপাদনার্থ বলিয়াছি- লাম-‘যে লোক অনৃতবাদী হয়, অর্থাৎ একপ্রকারের আপনাকে অন্যপ্রকারে প্রকাশ করিয়া অসত্য কথা বলে; এই সেই ব্যক্তি নিশ্চয়ই মূলের(শুভ কর্মাদির) সহিত শোষ প্রাপ্ত হয়,-ইহলোক ও পরলোক হইতে ভ্রষ্ট হয়। যেহেতু আমি ইহা জানি, সেই হেতু আমি মুঢ়ের ন্যায় মিথ্যা বলিতে পারি না‘। এইরূপে বিশ্বাস লাভ করিয়া সেই রাজকুমার চুপ করিয়া লজ্জিতভাবে রথে আরোহণ করিয়া যেমন আসিয়াছিলেন, তেমনই চলিয়া গেলেন। অতএব, ইহাই প্রমাণিত হইল যে, যথারীতি উপসন্ন উপযুক্ত শিষ্যকে বিদ্যা উপদেশ করা জ্ঞানী ব্যক্তির অবশ্য কর্তব্য এবং কোন অবস্থায়ই মিথ্যা ব্যবহার করা উচিত নহে। আমি আপনাকে সেই পুরুষ- বিষয়েই জিজ্ঞাসা করিতেছি-আমার বিজ্ঞেয় এই পুরুষ কোথায় আছেন?’ ইহা জানিবার ইচ্ছাটি আমার হৃদয়ে যেন শল্যের মত রহিয়াছে; ॥৫০॥১৷৷

প্রশ্নোপনিষৎ। ১০৯

তস্মৈ স হোবাচ—ইহৈবান্তঃশরীরে সোম্য স পুরুষঃ, যস্মিন্নেতাঃ ষোড়শ কলাঃ প্রভবন্তীতি ॥ ৫১॥২ ॥

[ ইদানীং ভারদ্বাজ-প্রশ্নোত্তরমবতারন্বিতুং উপক্রমতে তস্মৈ ইত্যাদিনা।]— সঃ(পিপ্পলাদঃ) তস্মৈ(ভারদ্বাজায়) উবাচ(উক্তবান্) হ(কিল)—হে সোম্য! সঃ(ষোড়শকলঃ) পুরুষঃ ইহ(প্রত্যক্ষগোচরে) অন্তঃশরীরে(শরীরা- ভ্যন্তরে হৃৎপদ্মমধ্যে)[বর্ত্ততে]; যস্মিন্(পুরুষে) এতাঃ(বক্ষ্যমাণাঃ) ষোড়শ কলাঃ(কং—ব্রহ্ম লীয়তে তিরক্রিয়তে যাভিঃ, তাঃ কলা অবয়বা উপাধয়ঃ) প্রভবন্তি(প্রকর্ষেণ জায়ন্তে) ইতি॥

তিনি তাহাকে বলিলেন—হে সৌম্য! যে পুরুষে এই ষোড়শ কলা প্রকৃষ্টরূপে সমুৎপন্ন হইয়া থাকে সেই পুরুষ এই শরীর মধ্যেই[বর্তমান] রহিয়াছেন ॥ ৫১॥২ ॥

শাঙ্কর ভাষাম্।

তস্মৈ স হোবাচ -ইহৈব অন্তঃশুরীরে হৃদয়পুণ্ডরীকাকাশমধ্যে হে সোম্য স পুরুষঃ, ন দেশান্তরে বিজ্ঞেয়ঃ। যস্মিন্ এতাঃ উচ্যমানাঃ ষোড়শকলাঃ প্রাণাদ্যাঃ প্রভবন্তি উৎপদ্যন্ত ইতি। ষোড়শভি: কলাভিঃ উপাধিরূপাভিঃ সকল ইব নিষ্কলঃ পুরুষো লক্ষ্যতেহবিদ্যয়া ইতি, তদুপাধি-কলাধ্যারোপাপনয়নেন বিদ্যয়া স পুরুষঃ কেবলো দর্শয়িতব্যঃ, ইতি কলানাং তৎপ্রভবত্বমুচ্যতে। প্রাণাদীনাম্ অত্যন্ত- নির্বিশেষে হৃদয়ে শুদ্ধে তত্ত্বে ন শক্যঃ অধ্যারোপমন্তরেণ প্রতিপাদ্য-প্রতিপাদনাদি- ব্যবহারঃ কর্ত্তুমিতি কলানাং প্রভব-স্থিত্যপ্যয়া আরোপ্যন্তে অবিদ্যাবিষয়াঃ; চৈতন্যাব্যতিরেকেণৈব হি কলা জায়মানাঃ তিষ্ঠন্ত্যঃ প্রলীয়মানাশ্চ সর্ব্বদা লক্ষ্যন্তে। অতএব ভ্রান্তাঃ ক্বচিৎ অগ্নিসংযোগাদ ঘৃতমিব ঘটাদ্যাকারেণ চৈতন্যমেব প্রতিক্ষণং জায়তে নশ্যতীতি; তন্নিরোধে শূন্যমের সর্ব্বমিতি অপরে। ঘটাদিবিষয়ং চৈতন্যং চেতয়িতুনিত্যস্য আত্মনোহনিত্যং জায়তে বিনশ্যতীত্যপরে। চৈতন্যং ভূতধৰ্ম্ম ইতি লৌকায়তিকাঃ।

অনপায়োপজনধৰ্ম্মকচৈতন্যম্ আত্মৈব নামরূপাদ্যুপাধিধর্ম্মৈঃ প্রত্যবভাসতে। “সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম।” “প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম।” “বিজ্ঞানমানন্দং ব্রহ্ম” “বিজ্ঞানঘন এব” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ। স্বরূপব্যভিচারিযু পদার্থেযু চৈতন্যস্যাব্যভিচারাৎ যথা যথা যো যঃ পদার্থো বিজ্ঞায়তে, তথা তথা জ্ঞায়মানত্বাদেব তস্য তস্য চৈতন্যস্যাব্যভি-

১১০ প্রশ্নোপনিষৎ।

চারিত্বম্ বস্তু-তত্ত্বং চ ভবতি কিঞ্চিৎ, ন জ্ঞায়ত ইতি চানুপপন্নম্। রূপঞ্চ দৃশ্যতে, ন চান্তি চক্ষুরিতিবৎ। ব্যভিচরতি তু জ্ঞানং, জ্ঞেয়ং ন ব্যভিচরতি কদাচিদপি। জ্ঞেয়াভাবেহপি জ্ঞেয়ান্তরে ভাবাজজ্ঞানস্য; ন হি জ্ঞানেৎসতি জ্ঞেয়ং নাম ভবতি কস্যচিৎ, সুযুপ্তেহদর্শনাজ জ্ঞানস্যাপি সুযুপ্তেহভাবাজ্জেয়বজ-জ্ঞানস্বরূপস্য ব্যভিচার ইতি চেৎ, ন; জ্ঞেয়াবভাসকস্য জ্ঞানস্যালোকবজ জ্ঞেয়াভিব্যঞ্জকত্বাৎ স্বব্যঙ্গ্যা- ভাবে আলোকাভাবানুপপত্তিবৎ সুযুপ্তে বিজ্ঞানাভাবানুপপত্তেঃ। ন হ্যন্ধকারে চক্ষুষা রূপানুপলব্ধৌ চক্ষুষোভাবঃ শক্যঃ কল্পয়িতুং বৈনাশিকেন। বৈনাশিকো জ্ঞেয়াভাবে জ্ঞানাভাবং কল্পয়ত্যেবেতি চেৎ, যেন তদভাবং কল্পয়েত্তস্যাভাবঃ কেন কল্প্যত ইতি বক্তব্যম্ বৈনাশিকেন।

তদভাবস্যাপি জ্ঞেয়ত্বাজজ্ঞানাভাবে তদনুপপত্তেঃ। জ্ঞানস্য জ্ঞেয়াব্যতিরিক্ত- ত্বাজজ্ঞেয়াভাবে জানাভাব ইতি চেৎ,ন। অভাবস্যাপি জ্ঞেয়ত্বাভ্যুপগমাৎ অভাবো- হপি জ্ঞেয়োহভ্যুপগম্যতে বৈনাশিকৈর্নিত্যশ্চ। তদব্যতিরিক্তঞ্চেৎ জ্ঞানং নিত্যং কল্পিতং স্যাৎ, তদভাবস্য চ জ্ঞানাত্মকত্বাদভাবত্বং চ বাষ্মাত্রমেব, ন পরমার্থতো- হভাবত্বম্ অনিত্যত্বং চ জ্ঞানস্য। ন চ নিত্যস্য জ্ঞানস্য অভাব-নামমাত্রাধ্যারোপে কিঞ্চিৎ নশ্ছিন্নম্।

অথাভাবো জ্ঞেয়োহপি সন্ জ্ঞানব্যতিরিক্ত ইতি চেৎ, ন; তর্হি জ্ঞেয়াভাবে জ্ঞানাভাবঃ। জ্ঞেয়ং জ্ঞানব্যতিরিক্তং, ন তু জ্ঞানং জ্ঞেয়ব্যতিরিক্তমিতি চেৎ; ন; শব্দমাত্রত্বাৎ বিশেষানুপপত্তেঃ। জ্ঞেয়-জ্ঞানয়োরেকত্বঞ্চেৎ অভ্যুপগম্যতে, জ্ঞেয়ং জ্ঞানব্যতিরিক্তং, জ্ঞানং জ্ঞেয়ব্যতিরিক্তং ন, ইতি তু শব্দমাত্রমেতৎ, বহ্নিরগ্নি- ব্যতিরিক্তঃ অগ্নির্ন বহ্নিব্যতিরিক্ত ইতি যদ্বৎ অভ্যুপগম্যতে। জ্ঞেয়ব্যতিরেকে তু জ্ঞানস্য জ্ঞেয়াভাবে জ্ঞানাভাবানুপপত্তিঃ সিদ্ধা।

জ্ঞেয়াভাবেহদর্শনাৎ অভাবো জ্ঞানস্যেতি চেৎ, ন; সুষুপ্তে জ্ঞপ্ত্যভ্যুপগমাৎ। বৈনাশিকৈরভ্যুপগম্যতে হি সুযুপ্তেহপি বিজ্ঞানাস্তিত্বম্; তত্রাপি জ্ঞেয়ত্বমভ্যুপগ- ম্যতে জ্ঞানস্য স্বেনৈবেতি চেৎ, ন; ভেদস্য সিদ্ধত্বাৎ। সিদ্ধং হ্যভাববিজ্ঞেয়- বিষয়স্য জ্ঞানস্য অভাব-জ্ঞেয়ব্যতিরেকাৎ জ্ঞেয়-জ্ঞানয়োরন্যত্বম্। ন হি তৎ সিদ্ধং মৃতমিবোজ্জীবয়িতুং পুনরন্যথা কর্ত্তুং শক্যতে বৈনাশিকশতৈরপি। জ্ঞানস্য জ্ঞেয়ত্ব- মেবেতি। তদপ্যন্যেন তদপ্যন্যেনেতি ত্বৎপক্ষেহতি প্রসঙ্গ ইতি চেৎ, ন; তদ্বি- ভাগোপপত্তেঃ সর্ব্বস্য। যদা হি সর্ব্বং জ্ঞেয়ংকস্যচিৎ অদা তদ্ব্যতিরিক্তং জ্ঞানং

প্রশ্নোপনিষৎ। ১১১।

জ্ঞানমেবেতি দ্বিতীয়ো বিভাগ এবাভ্যুপগম্যতেহবৈনাশিকৈঃ, ন তৃতীয়স্তদ্বিষয় ইত্যনবস্থানুপপত্তিঃ।

জ্ঞানস্য স্বেনৈবাবিজ্ঞেয়ত্বে সর্ব্বজ্ঞত্বহানিরিতি চেৎ, সোহপি দোষস্তস্যৈবাস্তু, কিং তন্নিবর্হণেনাস্মাকম্? অনবস্থাদোষশ্চ জ্ঞানস্য জ্ঞেয়ত্বাভ্যুপগমাৎ, অবশ্যঞ্চ বৈনাশিকানাং জ্ঞানং জ্ঞেয়ম্। স্বাত্মনা চাবিজ্ঞেয়ত্বেন অনবস্থানিবার্য্যা; সমান এবায়ং দোষ ইতি চেৎ, ন; জ্ঞানস্যৈকত্বোপপত্তেঃ। সর্ব্বদেশকালপুরুষাদ্যবস্থা- স্বেকমেব জ্ঞানং নামরূপাদ্যনেকোপাধিভেদাৎ সবিত্রাদিজলাদি প্রতিবিম্ববদনে কথা অবভাসত ইতি, নাসৌ দোষঃ। তথা চেহেদমুচ্যতে।

ননু শ্রুতেরিহৈব অন্তঃশরীরে পরিচ্ছিন্নঃ কুণ্ডবদরবৎ পুরুষ ইতি, ন; প্রাণাদি- কলাকারণত্বাৎ। ন হি শরীরমাত্রপরিচ্ছিন্নঃ প্রাণ-শ্রদ্ধাদীনাং কলানাং কারণত্বং প্রতিপত্তুং শত্রুয়াৎ। কলাকার্য্যত্বাচ্চ শরীরস্য; নহি পুরুষকাৰ্য্যাণাং কলানাং কার্য্যং সং শরীরং কারণ-কারণং স্বস্য পুরুষং কুণ্ডবদরমিব অভ্যন্তরীকুর্য্যাৎ। বীজ-বৃক্ষাদিবৎ স্যাদিতি চেৎ; যথা বীজকার্য্যং বৃক্ষঃ, তৎকার্য্যঞ্চ ফলং স্বকারণ- কারণং বীজমভ্যন্তরীকরোত্যাভ্রাদি, তদ্বৎ পুরুষমভ্যন্তরীকুর্য্যাৎ শরীরং স্বকারণ- কারণমপীতি চেৎ, ন; অন্যত্বাৎ সাবয়বত্বাচ্চ। দৃষ্টান্তে কারণবীজাদবৃক্ষফল- সংবৃত্তানি অন্যান্যেব বীজানি; দাষ্টান্তিকে তু স্বকারণ-কারণভূতঃ স এব পুরুষঃ শরীরেহভ্যন্তরীকৃতঃ ক্রয়তে। বীজ-বৃক্ষাদীনাং সাবয়বত্বাচ্চ স্যাদাধারাধেয়ত্বম্; নিরবয়বশ পুরুষঃ, সাবয়বাশ্চ কলাঃ শরীরঞ্চ; এতেন আকাশস্যাপি শরীরাধারত্বম্ অনুপপন্নং, কিমুতাকাশ-কারণস্য পুরুষস্য; তস্মাদসমানো দৃষ্টান্তঃ। কিং দৃষ্টান্তেন বচনাৎ স্যাদিতি চেৎ, ন; বচনস্যাকারকত্বাৎ। নহি বচনং বস্তুনোহন্যথাকরণে ব্যাপ্রিয়তে, কিং তর্হি যথাভূতার্থাবদ্যোতনে। তস্মাদন্তঃশরীর ইত্যেতদ্বচনম্ ‘অণ্ড- স্যান্তর্ব্ব্যোম’ ইতিবচ্চ দ্রষ্টব্যম্। উপলব্ধিনিমিত্তত্বাচ্চ, দর্শন-শ্রবণ-মননবিজ্ঞানাদি- লিঙ্গৈঃ অন্তঃ-শরীরে পরিচ্ছিন্ন ইব হ্যপলভ্যতে পুরুষঃ, উপলভ্যতে চ, অত উচ্যতে ‘অন্তঃশরীরে সোম্য স পুরুষঃ’ ইতি। ন পুনরাকাশকারণভূতঃ সন্ কুণ্ড- বদরবচ্ছরীরপরিচ্ছিন্ন ইতি মনসাপীচ্ছতি বক্তুং মূঢ়োহপি; কিমূত প্রমাণভূতা শ্রুতিঃ ॥৫১৷৷২৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

তিনি তাহাকে বলিলেন,—হে সৌম্য! কথ্যমান এই প্রাণাদি

১১১ প্রশ্নোপনিষৎ।

ষোড়শ-সংখ্যক কলা যাহাতে(যে পুরুষে) সংভূত বা সমুৎপন্ন হইয়া থাকে; সেই পুরুষকে এই শরীরাভ্যন্তরেই হৃৎপদ্ম-মধ্যগত আকাশে জানিতে হইবে, অন্য দেশে নহে। স্বভাবতঃ কলাহীন-নিষ্কল পুরুষও অজ্ঞানবশতঃ উপাধিরূপ উক্ত কলাসমূহ দ্বারা ‘সকল’-কলাযুক্ত বলিয়াই যেন প্রতীত হয়। অর্থাৎ পুরুষে ষোড়শ কলার অধ্যারোপ হয়; অতএব তত্ত্বজ্ঞানদ্বারা সেই কলারূপ উপাধির অধ্যারোপ অপনীত করিয়া সেই পুরুষকে কেবল(কলাবিহীন বিশুদ্ধরূপে) প্রদর্শন করা আবশ্যক; এই নিমিত্ত কলাসমুহকে তাহা হইতে উৎপন্ন বলা হইতেছে। অত্যন্ত বিশুদ্ধ অদ্বিতীয় তত্ত্বে(ব্রহ্মে) অধ্যারোপ ব্যতিরেকে কখনই প্রাণাদিকলার প্রতিপাদ্য-প্রতিপাদকভাব সম্বন্ধ সংস্থাপন করিতে পারা যায় না; এই কারণেই অবিদ্যার বিষয়ীভূত কলাসমূহের উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয় আরোপিত হইয়া থাকে এবং সর্বদাই কলাসমুহকে উৎপন্ন, স্থিত ও বিলয়প্রাপ্ত হইতে দেখা যায়। এই জন্যই কোন কোন ভ্রান্ত লোক[মনে করিয়া থাকে যে,] অগ্নি- সংযোগে ঘৃত যেরূপ অবস্থান্তর প্রাপ্ত হয়, সেইরূপ চৈতন্যই প্রতিক্ষণে ঘটাদি আকারে উৎপন্ন ও বিনষ্ট হইয়া থাকে।(১) অপরে বলে যে, [সুষুপ্তকালে] সেই বিজ্ঞানও নিরুদ্ধ বা স্থগিত হইলে সমস্তই যেন শূন্য (অসৎ) হইয়া পড়ে।(২) অন্য সম্প্রদায় বলেন যে, চেতয়িতা

প্রশ্নোপনিষৎ। ১১৩

(জ্ঞাতা) আত্মাই একমাত্র নিত্য পদার্থ, ঘটাদি বিষয়ে তাহার অনিত্য বিজ্ঞান সমুৎপন্ন ও বিনষ্ট হইয়া থাকে(৩), আর লোকা- য়তিক বা নাস্তিকগণ বলেন যে, চৈতন্য বা বিজ্ঞান পৃথিব্যাদি ভূতের ধৰ্ম্ম, তদতিরিক্ত চেতন আত্মা বলিয়া কিছু নাই(৪)

‘ব্রহ্ম সত্য, জ্ঞানও অনন্ত স্বরূপ।’ ‘ব্রহ্ম প্রজ্ঞান(জ্ঞান) ও আনন্দস্বরূপ।’ ‘বিজ্ঞানঘনই(জীবই) এই সকল ভূত হইতে-’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, হ্রাস-বৃদ্ধিবিহীন, চৈতন্যস্বরূপ আত্মাই নাম-রূপাদি উপাধি-ধৰ্ম্ম বিশিষ্টরূপে প্রতিভাত হইয়া থাকেন। বিশেষতঃ ঘট-পটাদি-পদার্থ সমূহ স্বরূপতই ব্যভিচারী অর্থাৎ ঘটের কালে পট না থাকিতেও পারে, কিন্তু জ্ঞান পদার্থটি সেরূপ নহে; অর্থাৎ যেখানে জ্ঞান আছে, সেখানে একটা না একটা বিষয় নিশ্চয়ই থাকিবে। এই হেতু[বুঝিতে হয় যে,] যে যে পদার্থ যে যে প্রকারে জ্ঞানগোচর হয়, সেই সেই প্রকারে জ্ঞায়মান হয় বলিয়াই অর্থাৎ তদনুযায়ী জ্ঞান উৎপন্ন হয় বলিয়াই, সেই সকল পদার্থবিষয়ক চৈতন্যের অব্যভিচারিত্ব ও বস্তুত্ব বা সত্যতা সিদ্ধ হয়; রূপ দর্শন হইতেছে, অথচ চক্ষু নাই, এই কথার ন্যায় বস্তু আছে, অথচ তাহা বিজ্ঞাত হয় না, ইহাও উপপন্ন হয় না। অধিকন্তু,[কোন একটা] জ্ঞেয়ের অভাবেও যখন অপর জ্ঞেয়বিষয়ে জ্ঞান থাকিতে পারে, তখন জ্ঞানই জ্ঞেয় ছাড়া থাকিতে পারে, কিন্তু জ্ঞেয় কখনই জ্ঞানব্যভিচারী বা

১৫

১১৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

জ্ঞানের অবিষয় হইয়া থাকিতে পারে না(৫)। কেননা, জ্ঞানের অভাবে কাহারও নিকট জ্ঞেয় বলিয়া কোন বস্তু উপলব্ধ হয় না; কারণ,[জ্ঞান- রহিত] সুষুপ্তি দশায় ঐরূপ দেখা যায় না। যদি বল, সুষুপ্তি সময়ে যখন জ্ঞানও থাকে না, তখন ত জ্ঞেয়ের ন্যায় জ্ঞানেরও স্বরূপগত ব্যভি- চার হইল? না,-আলোক যেরূপ জ্ঞেয়-পদার্থের অভিব্যঞ্জক, জ্ঞেয়- প্রকাশক জ্ঞানও তদ্রূপ দৃশ্য পদার্থের অভিব্যঞ্জক মাত্র; সুতরাং নিজের প্রকাশ্য বস্তুর অভাবে যেরূপ আলোকের অভাব প্রমাণিত হয় না; সেইরূপ সুষুপ্তিসময়ে প্রকাশ্য বিষয় নাই বলিয়া, জ্ঞানেরও অভাব উপপাদন করা যাইতে পারে না। কেননা, অন্ধকারে চক্ষু দ্বারা রূপের উপলব্ধি বা প্রতীতি হয় না বলিয়া বৈনাশিকও(বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধও) চক্ষুর অভাব পরিকল্পনা করিতে পারে না। যদি বল, বৈনাশিক ত জ্ঞেয়ের অভাবে জ্ঞানের অভাব কল্পনাই করেন? ভাল, যাহার সাহায্যে, জ্ঞেয়াভাবে জ্ঞানের অভাব কল্পনা করিয়া থাকেন, সেই বিজ্ঞানেরও অভাব কাহার সাহায্যে কল্পনা করা হয়; ইহা বৈনাশিকের বলা আবশ্যক।

বিশেষতঃ সেই জ্ঞেয়াভাবও যখন জ্ঞেয়, অর্থাৎ অজ্ঞাত বস্তুর অস্তিত্বে কোনই প্রমাণ না থাকায়, তখন জ্ঞেয়াভাবকেও অবশ্যই জ্ঞাতব্য বলিতে হইবে, কিন্তু জ্ঞানের সদ্ভাব না থাকিলে তাহা হইবে কি প্রকারে? যদি বল, জ্ঞান যখন জ্ঞেয় পদার্থ হইতে অতিরিক্ত

প্রশ্নোপনিষৎ। ১১৫

নহে, তখন কাজেই জ্ঞেয়ের অভাবে কি জ্ঞানের অভাব স্বীকার করিতে হইবে? না,-তাহা হইতে পারে না; কারণ, বৈনাশিকেরা অভাবকেও জ্ঞেয় বলিয়া স্বীকার করিয়া থাকেন; সুতরাং[তাহাদের মতে] অভাবও জ্ঞানের বিষয়ীভূত এবং নিত্য বলিয়া স্বীকৃত হয়; এখন সেই অভাব- ত্মক জ্ঞান যদি নিত্যই হয়, তাহা হইলে সেই অভাব যখন জ্ঞানাত্মক বা জ্ঞানেরই স্বরূপ, তখন ‘অভাব’ একটা কথামাত্র; বস্তুতঃ জ্ঞান পদার্থটি অনিত্যও নহে কিংবা অভাবস্বরূপও নহে। আর নিত্য জ্ঞানের উপর অভাব বলিয়া একটা শব্দমাত্র আরোপ করিলেও আমাদের পক্ষে কিছুমাত্র ক্ষতি নাই। পক্ষান্তরে যদি বল, অভাব জ্ঞেয় পদার্থ হইলেও জ্ঞান হইতে অতিরিক্ত(জ্ঞানাত্মক নহে); না-তাহা হইলে জ্ঞেয়ের অভাবে জ্ঞানের অভাব হইতে পারে? যদি বল, জ্ঞেয়ই জ্ঞান হইতে পৃথক্, কিন্তু জ্ঞান কখনও জ্ঞেয়. হইতে অতিরিক্ত নহে; না,-ইহা কেবল কথার প্রভেদমাত্র(বস্তুগত কোন প্রভেদ নাই); সুতরাং ইহাতে কিছুমাত্র বিশেষ সিদ্ধ হইতে পারে না। কেন না, যদি জ্ঞেয় ও জ্ঞানের একত্ব বা অভেদই স্বীকার করা হয়, তাহা হইলে কেবল ‘জ্ঞেয়’ পদার্থটি জ্ঞানাতিরিক্ত, আর ‘জ্ঞান পদার্থটি’ জ্ঞেয়াতিরিক্ত নহে; ইহা কেবল, ‘বহ্নি অগ্নি হইতে অতিরিক্ত, কিন্তু অগ্নি বহ্নি হইতে পৃথক্ বা অরিরিক্ত নহে’ এইরূপ কথার ন্যায় শব্দের প্রভেদ মাত্র(৬) আর জ্ঞান যদি জ্ঞেয় হইতে অতিরিক্তই হয়, তাহা হইলে[সুষুপ্তি প্রভৃতি অবস্থায়] জ্ঞেয়াভাবে জ্ঞানাভাব সিদ্ধ হইতে পারে না।

যদি বল জ্ঞেয়ের অভাবে জ্ঞানের উপলব্ধি হয় না বলিয়াই [ সুষুপ্তি প্রভৃতি] সময়ে জ্ঞানের অভাব[ কল্পনা করা হয়]; না,

১১৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

—তাহা কল্পনা করিতে পার না; কারণ, সুষুপ্তি-দশায়ও জ্ঞানের সম্ভাব স্বীকার করা হয়। বৈনাশিকেরাও(বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধেরাও) সুষুপ্তি সময়ে জ্ঞানের অস্তিত্ব নিশ্চয়ই স্বীকার করিয়া থাকেন। সে সময়েও জ্ঞান যে, নিজেই নিজের জ্ঞেয় হয় বলিয়া স্বীকার করা যাইতে পারে, তাহা নহে; কারণ, জ্ঞান ও জ্ঞেয়, এতদুভয়ের পরস্পর ভেদ [পূর্ব্বেই] সিদ্ধ বা প্রমাণিত হইয়াছে। কারণ, অভাবই যাহার বিজ্ঞেয় বিষয়, সেই জ্ঞান যখন বিজ্ঞেয় অভাব হইতে ব্যতিক্রম বা ভিন্ন, তখন জ্ঞান ও জ্ঞেয়, এতদুভয়ের অন্যত্ব বা ভেদ নিশ্চয়ই সিদ্ধ হইতেছে। আর শত শত বৈনাশিকও মৃতকে পুনরুজ্জীবিত করিবার চেষ্টার ন্যায় সেই সিদ্ধ বিষয়টিকে(জ্ঞান ও জ্ঞেয়ের ভেদকে) পুনর্ব্বার অন্যথা[অসিদ্ধ] করিতে পারেন না, অর্থাৎ জ্ঞানের জ্ঞেয়- স্বরূপতা স্থাপন করিতে পারে না।[ভাল কথা, জ্ঞান ও জ্ঞেয়ের পার্থক্য স্বীকার করিলে ত] তোমার পক্ষে প্রত্যেক জ্ঞানের উপলব্ধির জন্য তদতিরিক্ত অন্য অন্য জ্ঞানের অঙ্গীকার করায় ‘অনবস্থা দোষ’ উপস্থিত হইতে পারে? না; কারণ, জ্ঞান ও জ্ঞেয়, উভয়েরই বিভাগ যুক্তিসিদ্ধ হইতে পারে। যখন বিষয়সমূহ কোন একটি জ্ঞানের জ্ঞেয় হয়, তখন সেই জ্ঞেয়াতিরিক্ত জ্ঞান জ্ঞানস্বরূপই থাকে; সুতরাং (জ্ঞেয় হইল প্রথম ভাগ, আর) জ্ঞানই তাহার দ্বিতীয় ভাগ বা অংশ; সুতরাং অবৈনাশিকগণ(আমরা) দুএকটি মাত্র বিভাগই অঙ্গীকার করিয়া থাকেন, কিন্তু তৃতীয় আর একটি তদ্বিষয় অর্থাৎ জ্ঞানবিষয়ক জ্ঞান আর স্বীকার করেন না; সুতরাং তাহাদের মতে ‘অনবস্থা’ দোষও হইতে পারে না।(৭)

প্রশ্নোপনিষৎ। ১১৭

যদি বল, জ্ঞান যদি আপনি আপনাকে প্রকাশ করিতে পারে, তাহা হইলে ত[জ্ঞানময় ব্রহ্মের] সর্বজ্ঞতার বাধা ঘটে? না,-এই দোষও তাহার পক্ষেই সম্ভবপর হয়,(আমার পক্ষে নহে); সুতরাং তন্নিবারণে আমাদের কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। অধিকন্তু, বৈনাশিক- দিগকে যখন জ্ঞানের জ্ঞেয় স্বরূপতা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে, তখন জ্ঞানের জ্ঞেয়রূপতা স্বীকার হেতুই ‘অনবস্থা’ দোষটিও তাহাদের মতেই উপস্থিত হয়। যদি বল, জ্ঞান নিজে নিজের বিজ্ঞেয় না হইলে ত ‘অনবস্থা’দোষ অনিবার্য্য হইয়া পড়ে? সুতরাং এই ‘অনবস্থা’ দোষ [উভয় পক্ষেই] সমান? না,-জ্ঞানের একত্বনিবন্ধন এ দোষ হইতে পারে না; অর্থাৎ জ্ঞানের যদি ভেদ স্বীকার করা হইত, তাহা হইলেই ‘অনবস্থা’ দোষ সম্ভাবিত হইত; ভেদ না থাকায় ‘অনবস্থা’ দোষেরও সম্ভাবনা নাই। সূর্য্যাদি বিশ্বসমূহ যেরূপ জলাদিতে প্রতিবিম্বিত হইয়া নানাকারে প্রতিভাত হয়, তদ্রূপ সর্বদেশে, সর্বকালে সর্ব- পুরুষে সর্বাবস্থায় একই জ্ঞান নাম-রূপাদি-ভেদানুসারে বহুরূপে প্রতিভাত হইয়া থাকে।[বস্তুতঃ জ্ঞান-এক], কাজেই উক্ত ‘অনবস্থা’ দোষের সম্ভাবনা নাই। তদনুসারেই এই শ্রুতিতে[আত্মায়] এই কলাধ্যারোপের কথা উক্ত হইয়াছে।

ভাল, শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, কুণ্ড মধ্যে যেরূপ বদর(বদরী) থাকে; পুরুষও সেইরূপই শরীরাভ্যন্তরে পরিচ্ছিন্ন হইয়া বাস করেন না, তাহা হইতে পারে না; কারণ, এখানে প্রাণাদি কলার কারণত্বই একমাত্র বিবক্ষিত, কিন্তু পরিচ্ছিন্নত্ব নহে। কেননা, শরীর-পরিচ্ছিন্ন পুরুষকে কখনই প্রাণ-শ্রদ্ধাদি কলাসমূহের কারণ বলিয়া নিরূপণ করা যাইতে পারে না। বিশেষতঃ এই শরীর উক্ত কলা হইতেই সমুৎপন্ন;

১১৮ প্রশ্নোপনিষৎ।

এই শরীর পুরুষ-জন্য কলা হইতে সমুৎপন্ন হইয়া আবার নিজেরই কারণীভূত(শরীরের কারণ-কলা, আবার কলার কারণ পুরুষ, সেই) পুরুষকে কুণ্ডে বদরিকার ন্যায় অভ্যন্তরস্থ বা কবলিত করিতে পারে না। যদি বল, বীজ ও বৃক্ষের ন্যায় হউক?-বৃক্ষ বীজ হইতে উৎপন্ন হয়, সেই বৃক্ষ হইতে আবার আম্রাদি ফল উৎপন্ন হয়, সেই আম্রাদি ফল যেরূপ স্বীয় কারণ বৃক্ষেরও কারণীভূত বীজকে অভ্য- ন্তরস্থ করিয়া রাখে, তদ্রূপ পুরুষ কারণ-কারণ হইলেও শরীর তাহাকে অবশ্যই আবৃত করিতে পারে! না,-এরূপ হইতে পারে না; কারণ, অন্যত্ব(ভেদ) ও সাবয়বত্বই তাহার বাধক হেতু। দৃষ্টান্তস্থলে দেখা যায়, বৃক্ষের ফল-জাত বীজসমূহ সেই কারণীভূত বীজ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্; কিন্তু দার্টান্তিক স্থলে(শরীর ও আত্মার আলোচনা স্থলে) স্বীয় কারণের কারণীভূত সেই পুরুষই[তৎকার্য্যের কার্য্যস্বরূপ] শরীরে অভ্যন্তরীকৃত(কবলিত) বলিয়া পরিশ্রুত হইতেছে। বিশেষতঃ বীজ ও বৃক্ষাদি পদার্থসমূহ সাবয়ব; এই কারণেও তদুভয়ের আধারাধেয়ভাব হইতে পারে; কিন্তু পুরুষ নিজে নিরবয়ব, আর কলা ও শরীর[উভ- য়ই] সাবয়ব;[সুতরাং দৃষ্টান্ত ও দার্টান্তিক অনুরূপ হইতেছে] ইহা দ্বারা[প্রমাণিত হয় যে,] শরীরে যখন আকাশাধারত্বই অর্থাৎ আকাশকে ধারণ করাই উপপন্ন হয় না, তখন আকাশেরও কারণীভূত পুরুষের অনাধারত্ব সম্বন্ধে আর কথা কি? অতএব, উক্ত দৃষ্টান্তটি অনু- রূপ হয় না। যদি বল, দৃষ্টান্তের প্রয়োজন কি? বচনের বলে হইবে! না,-কারণ, বচন ত আর কারক(উৎপাদক) নহে,[উহা জ্ঞাপক মাত্র); বচন কখনই কোন বস্তুর উৎপাদনে যত্নবান্(সমর্থ) হয় না; পরন্তু, যথাযথরূপে বর্তমান বস্তুর প্রকাশনে যত্নপর হয় মাত্র। অতএব “অন্তঃশরীরে” এই বাক্যের অর্থ, ‘ব্রহ্মাণ্ডের অভ্যন্তরে আকাশ’ এই বাক্যের অর্থের ন্যায় বুঝিতে হইবে(৮)। উপলব্ধি হেতুও (৮) তাৎপর্য্য ‘অণ্ডেতি, অণ্ডকারণস্য ব্যোম্নো যথা তদনুসত্যতত্ত্বেন তদন্তর্গতত্বপ্রতীতিঃ।

প্রশ্নোপনিষৎ। ১১৯

[ঐরূপ বলিতে হয়], দর্শন, শ্রবণ, মনন(ইহা অমুক কি, অমুক, ইত্যাকার জ্ঞান) ও বিজ্ঞানাদি চিহ্ন দ্বারা পুরুষ শরীরাভ্যন্তরে যেন পরিচ্ছিন্নের ন্যায়ই প্রতীত হইয়া থাকে; এই[ভ্রান্ত] উপলব্ধি বশতই কথিত হইতেছে যে, ‘হে সৌম্য! পুরুষ এই শরীরাভ্যন্তরে [বাস করেন];’ নচেৎ পুরুষ আকাশেরও কারণ হইয়া যে, কুণ্ড- বদরের ন্যায় শরীর-পরিচ্ছিন্ন, হন, মূঢ় ব্যক্তিও মনে মনেও এ কথা বলিতে ইচ্ছা করে না, প্রমাণভূতা শ্রুতির আর কথা কি? ॥ ৫১৷২৷

স ঈক্ষাঞ্চক্রে—কস্মিন্নহমুৎক্রান্ত উৎক্রান্তো ভবিষ্যামি, কস্মিন্ বা প্রতিষ্ঠিতে প্রতিষ্ঠাস্যামীতি ॥ ৫২। ৩॥

[ ইদানীং কলানাং সৃষ্টিপ্রক্রিয়াং বক্তুমাহ]—স ঈক্ষামিত্যাদি। সঃ ( ষোড়শকলঃ পুরুষঃ) ঈক্ষাং( চিন্তাং) চক্রে( কৃতবান্)—কস্মিন্( কর্তৃ- বিশেষে) উৎক্রান্তে( দেহাৎ নির্গতে সতি) অহম্[ অপি] উৎক্রান্তঃ( বহির্গতঃ) ভবিষ্যামি; কস্মিন্( কর্তৃবিশেষে) বা প্রতিষ্ঠিতে( দেহস্থে সতি) প্রতিষ্ঠাস্যামি ( অহম্ অপি স্থিতঃ ভবেয়ম্); ইতি শব্দঃ( চিন্তাপ্রকার প্রদর্শন-সমাপ্তৌ) ॥

সেই ষোড়শকল পুরুষ চিন্তা করিয়াছিলেন যে, কে[দেহ হইতে] উৎক্রান্ত হইলে পর আমি উৎক্রান্ত হইব, আর কেই বা প্রতিষ্ঠিত হইলে আমিও প্রতিষ্ঠিত হইব; ইতি ॥ ৫২ ॥ ৩॥]

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

যস্মিন্নেতাঃ ষোড়শকলাঃ প্রভবন্তীত্যুক্তং, পুরুষবিশেষণার্থং কলানাং প্রভবঃ, স চান্যার্থোহপি শ্রুতঃ কেন ক্রমেণ স্যাদিত্যত ইদমুচ্যতে—

চেতনপূর্ব্বিকা চ সৃষ্টিরিত্যেবমর্থং চ পুরুষঃ ষোড়শকলঃ পৃষ্টো যো ভার- দ্বাজেন, স ঈক্ষাঞ্চক্রে ঈক্ষণং দর্শনং চক্রে কৃতবানিত্যর্থঃ, সৃষ্টিফলক্রমাদি- বিষয়ম্। কথমিতি? উচ্যতে—কস্মিন্ কর্তৃবিশেষে দেহাদুৎক্রান্তে উৎক্রান্তো

১২০ প্রশ্নোপনিষৎ।

ভবিষ্যাম্যহম্, এবং কস্মিন্ বা শরীরে প্রতিষ্ঠিতে অহং প্রতিষ্ঠাস্যামি প্রতিষ্ঠিতঃ শ্যামিত্যর্থঃ ॥

ননু আত্মা অকর্তা, প্রধানং কর্তৃ; অতঃ পুরুষার্থং প্রয়োজনমুররীকৃত্য প্রধানং প্রবর্ততে মহদাদ্যাকারেণ। তত্রেদমনুপপন্নং পুরুষস্য স্বাতন্ত্র্যেণ ঈক্ষাপূর্ব্বকং কর্তৃত্ববচনং, সত্ত্বাদিগুণসাম্যে প্রধানে প্রমাণোপপন্নে সৃষ্টিকর্তরি সতি ঈশ্বরেচ্ছানু- বর্তিষু বা পরমাণুষু সৎসু আত্মনোহপি একত্বেন কর্তৃত্বে সাধনাভাবাৎ। আত্মন আত্মনি অনর্থকর্তৃত্বানুপপত্তেশ; নহি চেতনাবান্ বুদ্ধিপূর্বকারী আত্মনোহনর্থং কুৰ্য্যাৎ। তস্মাৎ পুরুষার্থেন প্রয়োজনেন ঈক্ষাপূর্ব্বকমিব নিয়তক্রমেণ প্রবর্ত- মানেহচেতনে প্রধানে চেতনবদুপচারোহয়ং “স ঈক্ষাঞ্চক্রে” ইত্যাদিঃ। যথা রাজ্ঞঃ সর্ব্বার্থকারিণি ভৃত্যে রাজেতি, তদ্বৎ। ন, আত্মনো ভোক্ত ত্ববৎ কর্তৃত্বোপ- পত্তেঃ। যথা সাংখ্যস্য চিন্মাত্রস্য অপরিণামিনোহপি আত্মনো ভোক্ত ত্বং, তদ্বৎ বেদবাদিনাম্ ঈক্ষাদিপূর্ব্বকং জগৎকর্তৃত্বম্ উপপন্নং শ্রুতিপ্রামাণ্যাৎ।

তত্ত্বান্তরপরিণাম আত্মনোহনিত্যত্বাশুদ্ধত্বানেকত্বনিমিত্তো ন, চিন্মাত্রস্বরূপ- বিক্রিয়া, অতঃ পুরুষস্য স্বাত্মন্যেব ভোক্তৃত্বে চিন্মাত্রস্বরূপবিক্রিয়া ন দোষায়। ভবতাং পুনর্ব্বেদবাদিনাং সৃষ্টিকর্তৃত্বে তত্ত্বান্তরপরিণাম এব, ইত্যাত্মনোহনিত্যত্বাদি- সর্ব্বদোষ প্রসঙ্গ ইতি চেৎ, ন; একস্যপি আত্মনোহবিদ্যাবিষয়নাম-রূপোপাধ্যনু- পাধিকৃতবিশেষাভ্যুপগমাৎ, অবিদ্যাকৃতনাম-রূপোপাধিকৃতো হি বিশেষোহভ্যুপ- গম্যতে, আত্মনো বন্ধ-মোক্ষাদিশাস্ত্রকৃত-সংব্যবহারায়। পরমার্থতোহমুপাধিকৃতঞ্চ তত্ত্বমেকমেবাদ্বিতীয়মুপাদেয়ং সর্ব্বতার্কিকবুদ্ধ্যনবগাহ্যমভয়ং শিবমিষ্যতে, ন তত্র কর্তৃত্বং ভোক্তৃত্বং বা ক্রিয়া কারকফলং চ স্যাৎ, অদ্বৈতত্বাৎ সর্ব্বভাবানাম্।

সাঙ্খ্যাস্ত অবিদ্যাধ্যারোপিতমেব পুরুষে কর্তৃত্বং ক্রিয়া-কারকং ফলঞ্চেতি কল্পয়িত্বা আগমবাহ্যত্বাৎ পুনস্ততন্ত্রস্যন্তঃ পরমার্থত এব ভোক্তৃত্বং পুরুষস্যেচ্ছন্তি। তত্ত্বান্তরঞ্চ প্রধানং পুরুষাৎ পরমার্থবস্তুভূতমেব কল্পয়ন্তোহন্যতার্কিক-কৃতবুদ্ধিবিষয়াঃ সন্তো বিহন্যন্তে; তথেতরে তার্কিকাঃ সাঙ্খ্যৈঃ, ইত্যেবং পরস্পরবিরুদ্ধার্থকল্পনাত আমিষার্থিন ইব প্রাণিনোহন্যোন্তং বিরুদ্ধমানার্থদর্শিত্বাৎ পরমার্থতত্ত্বাদ্দ রমেবাপ- কৃষ্যন্তে, অতস্তন্মতমনাদৃত্য বেদান্তার্থতত্ত্বমেকত্বদর্শনং প্রতি আদরবন্তো মুমুক্ষবঃ স্যুঃ, ইতি তার্কিকমত-দোষপ্রদর্শনং কিঞ্চিদুচ্যতেহস্মাভিঃ, ন তু তার্কিকবৎ তাৎপর্য্যেণ।

প্রশ্নোপনিষৎ। ১২১

তৈলতদবোজ্জ্ব—“বিবদৎসব নিক্ষিপ্য বিরোধোদ্ভবকারণম্।

তৈঃ সংরক্ষিতসদ্বুদ্ধিঃ সুখং নির্ব্বাতি বেদবিৎ।”

কিঞ্চ ভোক্তৃত্ব-কর্তৃত্বয়োর্বিক্রিয়য়োর্বিশেষানুপপত্তিঃ। কা নামাসৌ কর্তৃত্বাৎ জাত্যন্তরভূতা ভোক্ত ত্ববিশিষ্টা বিক্রিয়া, যতো ভোক্তৈব পুরুষঃ কল্প্যতে, ন কর্তা। প্রধানন্তু কর্ত্তে বন ভোক্তিতি। ননু উক্তং পুরুষশ্চিন্মাত্র এব; সচ স্বাত্মস্থো বিক্রিয়তে ভুঞ্জানঃ, ন তত্ত্বান্তরপরিণামেন; প্রধানং তু তত্ত্বান্তরপরিণামেন বিক্রি- য়তে, অতোহনেকম্ অশুদ্ধম্ অচেতনঞ্চ ইত্যাদিধৰ্ম্মবৎ; তদ্বিপরীতঃ পুরুষঃ। নাহসৌ বিশেষঃ, বাঙ মাত্রত্বাৎ; প্রাগভোগোৎপত্তেঃ কেবলচিন্মাত্রস্য পুরুষস্য ভোক্ত ত্বং নাম বিশেষো ভোগোৎপত্তিকালে চেজ্জায়তে, নিবৃত্তে চ ভোগে পুনস্তদ্বিশেষাৎ অপেতশ্চিন্মাত্র এব ভবতীতি চেৎ; মহদাদ্যাকারেণ চ পরিণম্য প্রধানং ততোহপেত্য পুনঃ প্রধানস্বরূপেণ ব্যবতিষ্ঠতে ইতি, অস্যাং কল্পনায়াং ন কশ্চিবিশেষঃ ইতি বাঙমাত্রেণ প্রধান-পুরুষয়োর্বিশিষ্টবিক্রিয়া কল্প্যতে।

অথ ভোগকালেহপি চিন্মাত্র এব প্রাগ্বৎ পুরুষ ইতি চেৎ, ন; তর্হি পরমার্থতো ভোগঃ পুরুষস্য। অথ ভোগকালে চিন্মাত্রস্য বিক্রিয়া পরমার্থৈব, তেন ভোগঃ পুরুষস্যেতি চেৎ, ন; প্রধানস্যাপি ভোগকালে বিক্রিয়াবত্ত্বাদভোক্ত ত্বপ্রসঙ্গঃ। চিন্মা- ত্রস্যৈব বিক্রিয়া ভোক্তৃত্বমিতি চেৎ; ঔষ্ণ্যাদ্যসাধারণধৰ্ম্মবতাম্ অগ্ন্যাদীনাম্ অভোক্তত্বে হেত্বনুপপত্তিঃ। প্রধান-পুরুষয়োদ্ব য়োযু গপদ্ভোক্ত ত্বমিতি চেৎ, ন; প্রধানস্য পারার্থ্যানুপপত্তেঃ। ন হি ভোক্তোর্থ য়োরিতরেতরগুণ-প্রধানভাব উপ- পদ্যতে, প্রকাশয়োরিব ইতরেতরপ্রকাশনে। ভোগধর্মবতি সত্ত্বাঙ্গিনি চেতসি পুরুষস্য চৈতন্য প্রতিবিম্বোদয়াদবিক্রিয়স্য পুরুষস্য ভোক্ত ত্বমিতি চেৎ, ন; পুরুষস্য বিশেষা- ভাবে ভোক্ত ত্বকল্পনানর্থক্যাৎ। ভোগরূপশ্চেদনর্থ: পুরুষস্য নাস্তি, সদা নির্বি- শেষত্বাৎ পুরুষস্য, কস্যাপনয়নার্থং মোক্ষসাধনং শাস্ত্রং প্রণীয়তে? অবিদ্যা- ধ্যারোপিতানর্থাপনয়নায় শাস্ত্রপ্রণয়নমিতি চেৎ? পরমার্থতঃ পুরুষো ভোক্তৈব, ন কর্তা; প্রধানং কর্ত্রেব, ন ভোক্তু পরমার্থসদ্বস্বন্তরং পুরুষাচ্চ, ইতীয়ং কল্পনা আগমবাহ্যা ব্যর্থা নির্হেতুকা চ, ইতি নাদর্তব্যা মুমুক্ষুভিঃ।

একত্বেহপি শাস্ত্রপ্রণয়নাদ্যানর্থক্যমিতি চেৎ, ন; অভাবাৎ-সৎসু হি শাস্ত্র- প্রণেত্রাদিষু তৎফলার্থিষু চ শাস্ত্রস্য প্রণয়নমনর্থকং সার্থকং বা ইতি বিকল্পনা স্যাৎ। ন হ্যত্মৈকত্বে শাস্ত্রপ্রণেত্রাদয়স্ততো ভিন্নাঃ সন্তি, তদভাবে এবং বিকল্প-

১৬

. ১২২ প্রশ্নোপনিষৎ।

নৈব অনুপপন্না। অভ্যুপগতে আত্মৈকত্বে প্রমাণার্থশ্চ অভ্যুপগতো ভবতা যদা আত্মৈকত্বমভ্যুপগচ্ছতা। তদভ্যুপগমে চ বিকল্পনানুপপত্তিমাহ শাস্ত্রম্- “যত্র ত্বস্য সর্ব্বমাত্মৈবাভূৎ, তৎ কেন কং পশ্যেৎ” ইত্যাদি। শাস্ত্রপ্রণয়নাদ্যুপপত্তিঞ্চাহ অন্যত্র পরমার্থবস্তুস্বরূপাৎ অবিদ্যাবিষয়ে-“যত্র হি দ্বৈতমিব ভবতি” ইত্যাদি-বিস্তরতো বাজসনেয়কে।

অত্রচ বিভক্তে বিদ্যাহবিদ্যে পরাপরে ইত্যাদাবেব শাস্ত্রস্য; অতো ন তার্কিক- বাদ-ভটপ্রবেশঃ বেদান্তরাজ-প্রমাণবাহুগুপ্তে ইহাত্মৈকত্ববিষয়ে ইতি। এতেন অবিদ্যাকৃতনাম-রূপাদ্যপাধিকৃতানেকশক্তিসাধনকৃতভেদবত্ত্বাদ ব্রহ্মণঃ সৃষ্ট্যাদি- কর্তৃত্বে সাধনাদ্যভাবো দোষঃ প্রত্যুক্তো বেদিতব্যঃ, পরৈরুক্ত আত্মানর্থকর্তৃত্বাদি- দোষশ্চ। যস্ত দৃষ্টান্তো রাজ্ঞঃ সর্ব্বার্থকারিণি কর্তরি উপচারাৎ রাজা, কর্তেতি, সোহত্রানুপপন্নঃ; “স ঈক্ষাঞ্চক্রে” ইতি শ্রুতেমুখ্যার্থবাধনাৎ প্রমাণভূতায়াঃ। তত্র হি গৌণী কল্পনা শব্দস্য, যত্র মুখ্যার্থে। ন সম্ভবতি। ইহ ত্বচেতনস্য মুক্ত-বদ্ধ পুরুষ বিশেষাপেক্ষয়া কর্তৃ-কর্ম-দেশ-কালনিমিত্তাপেক্ষয়া চ বন্ধ-মোক্ষাদিফলার্থা নিয়তা পুরুষং প্রতি প্রবৃত্তির্নোপপদ্যতে; যথোক্তসর্ব্বজ্ঞেশ্বরকর্তৃত্বপক্ষে তু উপপন্না ॥৫২৷৷৩৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

পূর্ব্বে উক্ত হইয়াছে যে, ‘এই ষোড়শ কলা যে আশ্রয়ে প্রাদু- ভূত হয়। অবশ্য, পুরুষকে বিশেষিত করিবার উদ্দেশেই কলার প্রাদুর্ভাব[বর্ণিত হইয়াছে]। যদিও উহা পুরুষের বিশেষণার্থই পরি- শ্রুত হউক, তথাপি তাহার(প্রাদুর্ভাব) কিরূপ ক্রমে সম্পন্ন হইতে পারে; তন্নিরূপণার্থ ইহা কথিত হইতেছে—

সৃষ্টিকার্য্যটি যে, চেতনপূর্ব্বক, অর্থাৎ চেতনের প্রেরণা না থাকিলে যে, কখনই সৃষ্টি হইতে পারে না, তন্নিরূপণার্থ ভারদ্বাজকর্তৃক-যোড়শ কলাবিশিষ্ট যে পুরুষ জিজ্ঞাসিত হইয়াছিলেন; সেই পুরুষ ঈক্ষা করিয়াছিলেন, অর্থাৎ তিনি সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও ক্রমবিষয়ে ঈক্ষণ—দর্শন করিয়াছিলেন। কি প্রকার? বলা যাইতেছে—কোন্ বিশিষ্ট কর্তাটি দেহ হইতে উৎক্রান্ত(বহির্গত) হইলে, আমি নিশ্চয়ই উৎক্রান্ত হইব,

প্রশ্নোপনিষৎ। ১২৩

এবং শরীরে কে বা স্থিতিশালী হইলে প্রতিষ্ঠা লাভ করিব, অর্থাৎ কাহার স্থিতিতে আমিও শরীরে প্রতিষ্ঠিত হইব?

ভাল, আত্মায় ত কর্তৃত্ব নাই; প্রধান বা প্রকৃতিরই কর্তৃত্ব; প্রধানই পুরুষের অভীষ্ট-সম্পাদনরূপ প্রয়োজন অঙ্গীকার করিয়া, মহত্তত্ত্বাদি আকারে পরিণত হয়। তদনুসারে, সত্ত্বাদি গুণের(সত্ত্ব, রজঃ ও তমো- গুণের) সাম্যাবস্থারূপ প্রধানই(প্রকৃতিই) প্রমাণোপপাদিত সৃষ্টির কারণ বিদ্যমান থাকিতে এবং ঈশ্বরের ইচ্ছানুবর্তী পরমাণুপুঞ্জ বর্তমান থাকিতে, পক্ষান্তরে একত্ব-নিবন্ধন আত্মার কর্তৃত্ববিষয়েও অনুকূল কোন সাধন না থাকায়[প্রকৃতির সাহায্য ব্যতীত] স্বতন্ত্রভাবে পুরুষের সৃষ্টি-কর্তৃত্ব নির্দেশ কখনই উপপন্ন হইতে পারে না।(৯) বিশেষতঃ আত্মার পক্ষেও আপনার উপর নিষ্প্রয়োজন কর্তৃত্ব প্রকাশন উপপন্ন হয় না। কারণ, বুদ্ধি-পূর্ব্বক কার্য্যকারী ও চৈতন্যসম্পন্ন কোন পুরুষই আপনার অনর্থকর বা দুঃখজনক কার্য্য করে না। অতএব, চেতন পুরুষের প্রয়োজনার্থ অচেতন প্রধানই নিয়মিত ক্রমানুসারে প্রবৃত্ত হয়, এবং সেই প্রবৃত্তিটি ঈক্ষাপূর্ব্বক প্রবৃত্তিরই অনুরূপ; এই কারণেই অচেতন প্রধানের সম্বন্ধে যে, ‘তিনি ঈক্ষণ করিয়াছিলেন’ ইত্যাদি প্রয়োগ, তাহা যেমন রাজার সর্বার্থসাধক ভৃত্যে(মন্ত্রিপ্রভৃতিতে) ‘রাজ’শব্দের প্রয়োগ হয়, তাহারই অনুরূপ। না; কারণ, আত্মার ভোক্তৃত্ব যেরূপ উপপন্ন হয় কর্তৃত্বও সেইরূপই উপপন্ন হইতে পারে? সাংখ্যমতে যেরূপ চিন্ময় অপরিণামী আত্মায়ও ভোক্তৃত্ব কল্পিত

১২৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

হয়, সেইরূপ বেদবাদী বৈদান্তিকগণের মতেও[ব্রহ্মের] ঈক্ষাপূর্ব্বক জগৎকর্তৃত্ব উপপন্ন হইতে পারে। বিশেষতঃ শ্রুতিই এ বিষয়ে প্রমাণ।(১০)

যদি বল, আত্মার যে, অপর কোনও তত্ত্বরূপে(মহৎ অহঙ্কারাদি রূপে) পরিণতি, তাহাই তাহার অনিত্যত্ব, অশুদ্ধত্ব ও অনেকত্ব সাধক হইয়া থাকে; কিন্তু চিন্মাত্র রূপের বিকার সেরূপ হয় না। অতএব, পুরুষের কেবলই স্বগত ভোক্তৃত্ব স্বীকার করিলেও চিন্মাত্রস্বরূপের বিকারে কোনও দোষ হয় না। কিন্তু বেদবাদী স্বমতে[আত্মার] সৃষ্টি- কর্তৃত্ব স্বীকার করিলে ত তত্ত্বান্তর পরিণামই উপস্থিত হইতে পারে? কাজেই আত্মার উপর অনিত্যত্বাদি দোষরাশি সম্ভাবিত হইতে পারে! না; তাহা হইতে পারে না; কারণ, আত্মা এক হইলেও অবিদ্যাসহ- যোগে বিষয়(শব্দাদি)ও নামরূপাদি উপাধির সম্বন্ধ এবং তাহার অভাব- নিবন্ধনই আত্মাতে বিশেষ বিশেষ অবস্থা অঙ্গীকার করা হইয়া থাকে, (স্বরূপতঃ নহে)। বস্তুতঃ[আত্মাতে যে] বিশেষ বিশেষ অবস্থা ঘটে, তাহা নাম-রূপাত্মক উপাধি-সমুৎপাদিত বলিয়াই স্বীকার করা হয়। আর আত্মার সম্বন্ধে শাস্ত্রোক্ত বন্ধ-মোক্ষাদি ব্যবহার-রক্ষার্থ অনুপাধি- কৃত(যাহা উপাধি দ্বারা উৎপাদিত নহে, এরূপ) পারমার্থিক এক, অদ্বিতীয়, সমস্ত তার্কিক-বুদ্ধির অগোচর, উপাদেয়(অবশ্যগ্রাহ্য), অভয় ও কল্যাণময় পারমার্থিত্ব ইচ্ছা করা হয়, অর্থাৎ ঐ প্রকার এক অদ্বিতীয় তত্ত্বকেই যথার্থ সত্য বলিয়া গ্রহণ করা হয় এবং উহাই অনৌপাধিক স্বরূপ। তৎকালে সমস্ত পদার্থই অদ্বৈততত্ত্বে পর্য-

প্রশ্নোপনিষৎ। ১২৫

বসিত হইয়া যায়; সুতরাং কর্তৃত্ব, ভোক্তা কিংবা ক্রিয়া, কারক ও ফলগত ভেদ থাকে না;(নিবৃত্ত হইয়া যায়)।

কিন্তু সাংখ্যবাদিগণ[প্রথমতঃ] পুরুষগত ক্রিয়া, কারক ও তৎফলকে অবিদ্যা দ্বারা অধ্যারোপিত বলিয়াই কল্পনা করেন; অনন্তর এই কল্পনা বেদবিহিত নহে, এই জন্য তাহা হইতে ভীত হইয়া, পুরুষের যথার্থ ভোক্তৃত্ব ইচ্ছা করেন(স্বীকার করেন); এবং প্রধানকে পুরুষ হইতে পৃথক্ একটি সত্য বস্তু বলিয়াই কল্পনা করতঃ অপরাপর তার্কিকগণের বুদ্ধির বিষয়ীভূত হইয়া অর্থাৎ তাহাদের উদ্ভাবিত তর্কের সহিত সংঘর্ষ লাভ করিয়া, ব্যাহত বা বাধা প্রাপ্ত হন; সেইরূপ অপর তার্কিকগণও আবার সাংখ্যবাদি-কর্তৃক[তর্কে পরাভূত হন]। এইরূপে পরস্পর বিরুদ্ধার্থ কল্পনাবশতঃ মাংসার্থী প্রাণিগণের ন্যায় পরস্পরে বিরুদ্ধার্থ দর্শন করে[বিরোধ করে]। তাহার ফলে নিশ্চয়ই[তাহারা] পরমার্থ- তত্ত্ব বা সত্যবস্তু হইতে অতিদূরে নীত হইয়া থাকে। অতএব মুমুক্ষু- গণ সে সকল মতে অনাদরপূর্ব্বক যাহাতে বেদান্তবেদ্য যথার্থ বস্তু একত্ব দর্শনে শ্রদ্ধাবান্ হইতে পারেন, সেই উদ্দেশেই আমরা তার্কিক- মতের দোষ প্রদর্শনার্থ কিঞ্চিৎ বলিতেছি; কিন্তু তার্কিকগণের ন্যায় কেবল দোষ-প্রদর্শনোদ্দেশেই নহে। সেইরূপ কথাই এ বিষয়ে উক্ত আছে,[অদ্বৈত তত্ত্ব লইয়া বিরোধ উপস্থিত হইলে] বেদবিৎ ব্যক্তি [ভেদদর্শনরূপ] সেই বিরোধোৎপত্তির কারণটি পরস্পর বিবদমান পুরুষদিগের নিকট উপস্থাপিত করে; এবং তাহাদের নিকট হইতে সদ্বুদ্ধি প্রাপ্ত হইয়া, সুখে শান্তি লাভ করেন।(১১)

১২৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

আরও এক কথা,-ভোক্তৃত্ব ও কর্তৃত্বরূপ বিকারদ্বয়ের মধ্যে কোন বিশেষ থাকা উপপন্ন হয় না।[প্রথমতঃ] কর্তৃত্ব হইতে ভিন্ন- জাতীয় ভোক্তৃত্ববিশিষ্ট এই ‘বিক্রিয়া’ বা বিকার পদার্থটা কি? যাহার বলে তুমি কল্পনা করিতেছ যে, পুরুষ কেবলই ভোক্তা-কর্তা নহে, এবং প্রধানও কেবলই কর্তা, ভোক্তা নহে। ভাল, পূর্ব্বেইত উক্ত হইয়াছে যে, পুরুষ কেবলই চিন্ময়, সেই পুরুষ স্বপ্রতিষ্ঠভাবে ভোগ করেন বলিয়াই, বিক্রিয়া-বিশিষ্ট হন; কিন্তু তত্ত্বান্তররূপে পরিণাম বশতঃ যে, বিকার যুক্ত হন, তাহা নহে। ‘প্রধান’ কিন্তু অন্য পদার্থাকারেই পরিণত হইয়া, বিকার প্রাপ্ত হইয়া থাকে; সুতরাং প্রধান-অনেকত্ব, অশুদ্ধি ও অচেতনত্বাদি ধর্মযুক্ত, আর পুরুষ ঠিক তাহার বিপরীত।[না] ইহাতেও কেবল শব্দভেদমাত্র; সুতরাং ইহা বিশেষ[ উভয়ের পার্থক্য বলিয়া গণ্য] হইতে পারে না। কারণ, ভোগোৎপত্তির পূর্ব্বে পুরুষ কেবলই চিন্মাত্র স্বরূপ থাকেন; ভোগোৎ- পত্তির সময়ে যদি সেই পুরুষেরই আবার ভোক্তারূপ বিশেষ ধৰ্ম্ম উৎপন্ন হয়, আবার ভোগ-নিবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গেই পুরুষ যদি সেই বিশেষ ধৰ্ম্ম হইতে বিচ্যুত হইয়া, কেবলই চিন্মাত্রস্বরূপ হন, তাহা হইলে, প্রধানও ত মহত্তত্ত্বাদি আকারে পরিণত হইয়া পুনশ্চ[প্রলয় কালে] স্বরূপে অবস্থান করে; সুতরাং উক্তপ্রকার কল্পনায়[প্রধান ও পুরুষের মধ্যে] কিছুমাত্র বিশেষই লক্ষিত হয় না; কাজেই প্রধান ও পুরুষের বিকার ধর্মটি বিশিষ্ট বা বিভিন্নপ্রকার[একরূপ নহে), এইরূপ কল্পনাটি কথামাত্র সার(বস্তুতঃ উহার মধ্যে কিছুমাত্র বিশেষত্ব নাই)।

যদি বল,—ভোগকালেও পুরুষ পূর্ব্বেরই মত চিন্মাত্রই থাকেন, [ প্রধান সেরূপ থাকে না], না;—তাহা বলিতে পার না; তাহা হইলে পুরুষের ভোগ পারমার্থিক[ হইয়া পড়ে]। আর যদি বল, ভোগকালে চিন্মাত্র পুরুষের সত্য সত্যই বিকার ঘটে, এবং

প্রশ্নোপনিষৎ। ১২৭

তাহা দ্বারাই পুরুষের ভোগ[সম্পন্ন হয়]; না;—তাহা হইলে ভোগকালে, প্রধানেরও বিকার থাকায়, তাহারও ভোক্তৃত্ব হইতে পারে। যদি বল, কেবল চিন্মাত্রের বিকারই ভোক্তাত্ব বা ভোগ- পদবাচ্য(অচেতনের বিকার নহে);[তাহা হইলেও] উষ্ণতা প্রভৃতি অসাধারণ(যাহা অন্যত্র থাকে না, এতাদৃশ) ধর্ম্মশালী অগ্নি প্রভৃতির ভোক্তাত্ব না থাকিবার কোন কারণই দৃষ্ট হয় না; অর্থাৎ তাহা হইলে, অগ্নি প্রভৃতিরও অবশ্যই ভোক্তাত্ব ঘটিতে পারে। আর প্রধান ও পুরুষ, উভয়েরই যে এক সঙ্গে ভোক্তাত্ব, অর্থাৎ পুরুষের ভোগের সঙ্গে প্রকৃতিরও ভোগ হইয়া থাকে, একথা বলা যায় না; কারণ, তাহা হইলে প্রকৃতির পরার্থত্ব সিদ্ধান্তের উপপত্তি হয় না।(১২)। কারণ, দুইটি প্রকাশ বা জ্যোতিঃ-পদার্থের যেরূপ পরস্পর প্রকাশনকার্য্যে গুণ-প্রধান ভাব হয় না, তদ্রূপ দুইটি ভোক্তারও পরস্পরের মধ্যে গুণ-প্রধানভাব(একটি প্রধান, অপরটি তাহার অধীন, এরূপ) হইতে পারে না। আর যদি বল, ভোগধৰ্ম্ম- যুক্ত(ভোগসমর্থ) সত্ত্বপ্রধান চিত্তে যে পুরুষের প্রতিবিম্ব-পতন, তাহাই পুরুষের ভোক্তাত্ব,—প্রকৃতপক্ষে পুরুষ অবিক্রিয়ই থাকে। না; পুরুষে কিছুমাত্র বিশেষ সমুৎপন্ন না হইলে, তাহাতে ভোক্তাত্ব কল্পনা নিরর্থক। কেন না, পুরুষে যদি ভোগরূপ অনর্থই(পরিত্যাগার্হ বিষয়ই) না থাকে, তাহা হইলে, পুরুষ যখন সর্বদাই নির্বিশেষ, তখন কাহার অপনয়নার্থ মোক্ষ-সাধন-শাস্ত্র প্রণীত হইয়া থাকে? যদি বল, [বাস্তবিক অনর্থ না থাকিলেও] অবিদ্যা দ্বারা অধ্যারোপিত অনর্থের দূরীকরণার্থ মোক্ষশাস্ত্রের প্রণয়ন হইয়া থাকে, তাহা হইলেও পুরুষ

১২৮ প্রশ্নোপনিষৎ।

পরমার্থতঃ ভোক্তা বটে, কর্তা নহে; আর প্রধানও পরমার্থতঃ কর্তাই বটে,ভোক্তা নহে,—এবং পুরুষ হইতে পৃথক্ একটি সত্য বস্তু; এইরূপ শাস্ত্রবিরুদ্ধ কল্পনাটি বিফল এবং অযৌক্তিকই হইল; সুতরাং মুমুক্ষুগণের ইহা আদরণীয় নহে। ভাল, একত্ব পক্ষেও[অদ্বৈতবাদেও] ত শাস্ত্র-প্রণয়ন নিরর্থক হয়? না;—এ পক্ষে শাস্ত্রাদির অভাব হেতুই এ আপত্তি হইতে পারে না। কেন না, শাস্ত্রপ্রণয়ন-কর্তা প্রভৃতি এবং শাস্ত্রোক্ত ফলার্থী বর্তমান থাকিলেই ‘অনর্থক’ বা ‘সার্থক’ কল্পনা হইতে পারে; কারণ, আত্মৈকত্ব নিশ্চয় হইলে পর, সেই নিশ্চয়কর্তা হইতে পৃথভূত কোনও শাস্ত্র-প্রণেতৃ-প্রভৃতি নাই; সুতরাং প্রণেতৃপ্রভৃতির অভাবে উক্তপ্রকার বিতর্কই উপপন্ন হইতে পারে না। তুমি যখন আত্মৈকত্ব অঙ্গীকার করিতেছ, তখন তোমাকে আত্মৈকত্ব স্বীকারের সঙ্গে সঙ্গেই প্রমাণভূত শাস্ত্রেরও সফলতা স্বীকার করিতে হইতেছে। আর শাস্ত্রের সার্থকতা স্বীকার করাতেই যে পূর্ব্বোক্ত সার্থকত্ব-নিরর্থকত্ব বিতর্কও উপপন্ন হইতে পারে না, ইহা,—‘যে অবস্থায় ইহার (মুমুক্ষুর) সমস্তই আত্মস্বরূপ হইয়া যায়, তখন কিসের দ্বারা কাহাকে দর্শন করিবে’ ইত্যাদি শাস্ত্রই বলিয়া দিতেছেন। বাজসনেয় ব্রাহ্মণেও[আছে] ‘যে অবস্থায় দ্বৈতের মতই হয়, তখনই অপরে অপরকে দর্শন করে’ ইত্যাদি শাস্ত্র আবার পরমার্থ বস্তুর স্বরূপো- পলব্ধি না হওয়া পর্য্যন্ত—অবিদ্যাবস্থায় শাস্ত্র প্রণয়নাদির উপপত্তিও সবিস্তরে প্রদর্শন করিতেছেন।

আর এখানেও পরা বিদ্যা ও অপরা বিদ্যার বিষয় দুইটি পৃথক্- ভাবেই নির্দিষ্ট হইয়াছে; সুতরাং বেদান্তরূপ রাজার প্রামাণ্যরূপ বাহু- সংরক্ষিত এই আত্মৈকত্ব-বিষয়ে তার্কিক-বাদরূপ বীরের প্রবেশাধিকার নাই। ইহা দ্বারাই ব্রহ্মে অনাদি অবিদ্যাকৃত নাম ও রূপাদি উপাধি- জনিত অনেকপ্রকার শক্তি ও তৎসাধন-সমুৎপাদিত ভেদ উপস্থিত

প্রশ্নোপনিষৎ। ১২৯

হওয়ায় ব্রহ্মের সৃষ্টিকর্তৃত্ব বিষয়ে কোন সাধন বা সহায় নাই বলিয়া, পর পক্ষকর্তৃক যে দোষ উপস্থাপিত হইয়াছিল, তাহা এবং আত্মার সম্বন্ধে যে, সংসারপ্রাপ্তিরূপ অনর্থ-কর্তৃত্ব দোষ প্রদত্ত হইয়াছিল, তাহাও প্রত্যাখ্যাত হইল, জানিতে হইবে। আর যে, রাজার সর্ব- প্রকার প্রয়োজন-সাধক ভৃত্যে ‘রাজা’ ও ‘কর্তা’ ইত্যাদি ব্যবহারের আরোপের দৃষ্টান্ত, তাহাও উপপন্ন হয় না; কারণ, তাহা হইলে, ‘তিনি’ ঈক্ষণ[চিন্তা] করিলেন এই স্বতঃপ্রমাণ শ্রুতির মুখ্যার্থটি বাধিত হইয়া পড়ে। আর যেখানে মুখ্যার্থের সম্ভব হয় না, সেই স্থানেই শব্দের গৌণার্থ কল্পনা করিতে হয়। এখানে কিন্তু পুরুষের জন্য অচেতন প্রধানের যে, বদ্ধ ও মুক্ত পুরুষগত বৈশিষ্ট্যনুসারে এবং কর্তা, কৰ্ম্ম, দেশ, কাল ও নিমিত্তানুসারে বন্ধন ও মোক্ষ রূপ ফলোৎপাদনার্থ প্রবৃত্তি বা চেষ্টা, তাহা উপপন্ন হয় না; কিন্তু যথোক্ত বিশেষণ-বিশিষ্ট সর্বজ্ঞ সর্বেশ্বর ঈশ্বরের কর্তৃত্ব পক্ষে ঐরূপ কথা সম্পূর্ণরূপে উপপন্ন হয়;[সুতরাং সৃষ্টি-প্রবৃত্তির অনুপপত্তিনিবন্ধন অচেতন প্রধানের গৌণার্থক “ঈক্ষণ” কল্পনা করা যাইতে পারে না](১৩) ॥৫২৷৩৷৷

স প্রাণমসৃজত, প্রাণাচ্ছ্রদ্ধাং খং বায়ুর্জ্যোতিরাপঃ পৃথিবী- ন্দ্রিয়ং মনঃ। অন্নমন্নাদ্বীর্য্যং তপো মন্ত্রাঃ কৰ্ম্ম লোকাঃ, লোকেষু চ নাম চ ॥ ৫৩ ॥ ৪ ॥

সঃ(ষোড়শকলঃ পুরুষঃ) প্রাণম্(সূত্রাত্মানং হিরণ্যগর্ভম্) অসৃজত(সৃষ্টবান্); প্রাণাৎ শ্রদ্ধাং(আস্তিক্যবুদ্ধিরূপাং)[সৃষ্টবান্];[ততশ্চ] খং(আকাশং) বায়ুঃ, জ্যোতিঃ(তেজঃ) আপঃ(জলানি), পৃথিবী, ইন্দ্রিয়ং(শ্রোত্রাদি) মনঃ(অন্তঃকরণং) অন্নং(ব্রীহ্যাদি), অন্নাৎ বীর্য্যং(শরীরেন্দ্রিয়-সামর্থ্যং), তপঃ(দেহেন্দ্রিয়-শোধকং)

১৭

১৩০ প্রশ্নোপনিষৎ

মন্ত্রাঃ(ঋগ্যজুঃসামার্থর্ব্বরূপাঃ) কৰ্ম্ম(যজ্ঞাদিরূপং), লোকাঃ(কৰ্ম্মফলভূতাঃ স্বর্গাদ্যাঃ), লোকেষু চ(অপি) নাম(দেবদত্ত-যজ্ঞদত্তাদিরূপং) চ(অপি) [এতাঃ কলাঃ তেন সৃষ্টা ইতিশেষ:] ॥

সেই ষোড়শকল পুরুষ প্রাণসংজ্ঞক হিরণগর্ভের সৃষ্টি করিলেন, সেই প্রাণ হইতে শ্রদ্ধার[সৃষ্টি করিলেন];[তাহার পর] আকাশ, বায়ু, তেজঃ, জল, পৃথিবী, ইন্দ্রিয়, মনঃ, অন্ন(ধ্যানাদি), অন্ন হইতে বীর্য্য(বল), তপস্যা, মন্ত্র,(ঋক্, যজুঃ সাম ও অথর্ব্ববেদ), কৰ্ম্ম(যজ্ঞাদি), স্বর্গাদি লোক সমূহ, এবং লোক সমূহের মধ্যে নাম(সংজ্ঞা)[এই কলা-সমূহ সৃষ্টি করিলেন] ॥ ৫৩॥ ৪ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

ঈশ্বরেণের সর্ব্বাধিকারী প্রাণঃ পুরুষেণ সৃজ্যতে। কথং? সঃ পুরুষ উক্ত- ‘প্রকারেণ ঈক্ষিত্বা ‘প্রাণং হিরণ্যগর্ভাখ্যং সর্ব্ব প্রাণিকরণাধারম্ অন্তরাত্মানম্ অসৃজত সৃষ্টবান্। ততঃ ‘প্রাণাৎ শ্রদ্ধাং সর্ব্বপ্রাণিনাং শুভকৰ্ম্মপ্রবৃত্তিহেতুভূতাম্; ততঃ কর্মফলোপভোগসাধনাধিষ্ঠানানি কারণভূতানি মহাভূতানি অসৃজত। খং শব্দ- গুণকং, বায়ুং স্বেন স্পর্শগুণেন শব্দগুণেন চ বিশিষ্টং দ্বিগুণম্। তথা জ্যোতিঃ স্বেন রূপেণ পূর্ব্বগুণাভ্যাঞ্চ বিশিষ্টং ত্রিগুণং শব্দস্পর্শাভ্যাম্। তথা আপো রসেন গুণেন অসাধারণেন পূর্ব্বগুণানুপ্রবেশেন চ চতুর্গুণাঃ। তথা গন্ধগুণেন পূর্ব্ব- গুণানুপ্রবেশেন চ পঞ্চগুণা পৃথিবী। তথা তৈরেব ভূতৈরারব্ধম্ ইন্দ্রিয়ং দ্বিপ্রকারং বুদ্ধ্যর্থং কৰ্ম্মার্থঞ্চ দশসঙ্খ্যাকম্। তস্য চেশ্বরমন্তস্থং সংশয়-সঙ্কল্প- লক্ষণং মনঃ। এবং প্রাণিনাং কার্য্যং করণঞ্চ সৃষ্ট্বা তৎস্থিত্যর্থং ব্রীহিযবাদি- লক্ষণমন্নম্; ততশ্চ অন্নাৎ অদ্যমানাদ বীর্য্যং সামর্থ্যং বলং সর্ব্বকৰ্ম্মপ্রবৃত্তিসাধনম্। তদ্বীর্য্যবতাঞ্চ প্রাণিনাং তপো বিশুদ্ধিসাধনং সঙ্কীর্য্যমাণানাম্; মন্ত্রাঃ তপো- বিশুদ্ধান্তর্ব্বহিঃকরণেভ্যঃ কৰ্ম্মসাধনভূতা ঋগ্যজুঃসামাথর্ব্বাঙ্গিরসঃ। ততঃ কৰ্ম্ম অগ্নিহোত্রাদিলক্ষণম্। ততো লোকাঃ কর্মণাং ফলম্। তেষু চ লোকেষু সৃষ্টানাং প্রাণিনাং নাম চ ‘দেবদত্তো যজ্ঞদত্তঃ’ ইত্যাদি। এবমেতাঃ কলাঃ প্রাণিনাম্ অবিদ্যাদিদোষ-বীজাপেক্ষয়া সৃষ্টিাঃ, তৈমিরিকদৃষ্টিসৃষ্টা ইব দ্বিচন্দ্র-মশক- মক্ষিকাদ্যাঃ, স্বপ্নদৃক্-সৃষ্টা ইব চ সর্ব্বপদার্থাঃ; পুনস্তস্মিন্নেব পুরুষে প্রলীয়ন্তে হিত্বা নামরূপাদিবিভাগম্ ॥ ৫৩॥৪॥

প্রশ্নোপনিষৎ। ১৩১

ভাষ্যানুবাদ।

রাজার ন্যায় পুরুষও স্বীয় সর্ব্বপ্রয়োজন-সাধক প্রাণ সৃষ্টি করি- লেন। কিরূপে?—সেই পুরুষ পূর্ব্বোক্তপ্রকারে ঈক্ষণ বা চিন্তা করিয়া, সমস্ত প্রাণিগণের ইন্দ্রিয়াধার ও অন্তরাত্মা হিরণ্যগর্ভ-সংজ্ঞক প্রাণ সৃষ্টি করিলেন; সেই প্রাণ হইতে সমস্ত প্রাণিগণের শুভ- কর্ম্মে প্রবৃত্তির হেতুভূত শ্রদ্ধা এবং তাহা হইতে কর্ম্মফলোপ- ভোগের সাধনাশ্রয়[জগতের] কারণস্বরূপ মহাভূতসমূহ সৃষ্টি করি- লেন। শব্দগুণবিশিষ্ট আকাশ, স্বীয় গুণ স্পর্শ ও কারণগুণ শব্দ, এই গুণদ্বয়বিশিষ্ট বায়ু, সেইরূপ স্বীয়(গুণ) রূপ ও পূর্ব্বোক্ত [কারণ গত] শব্দ ও স্পর্শ, এই গুণত্রয় বিশিষ্ট জ্যোতিঃ(তেজঃ), সেইরূপ, অসাধারণ গুণ(স্বীয় বিশেষ গুণ) রস এবং পূর্ব্ববর্ত্তী গুণত্রয়ের অনুপ্রবেশ বশতঃ গুণচতুষ্টয়-বিশিষ্ট জলসমূহ, সেইরূপ, (স্বীয়) গুণ গন্ধ ও পূর্ব্বোক্ত গুণসমূহের অনুপ্রবেশে পঞ্চগুণ- বিশিষ্ট পৃথিবী(১); সেইরূপ সেই ভূতসমূহের দ্বারাই সমুৎপাদিত, জ্ঞান-সম্পাদক ও কার্য্যসম্পাদক, দশসংখ্যক দ্বিবিধ ইন্দ্রিয়(জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্ম্মেন্দ্রিয়) এবং সে সমুদায়ের প্রভু বা পরিচালক, সংশয় ও সংকল্প-লক্ষণান্বিত দেহ মধ্যস্থ মনঃ; এইরূপে প্রাণিগণের কার্য্য (দেহ) ও করণ(ইন্দ্রিয়াদি) সৃষ্টি করিলেন, তাহার পর তদ্রক্ষার্থ ব্রীহি(ধান্যবিশেষ) যবাদিরূপ অন্ন, অনন্তর ভুক্ত অন্ন হইতে সর্বকার্য্যে প্রবৃত্তি-সাধন বীর্য্য অর্থাৎ সামর্থ্য বা বল, উক্ত বীর্য্য-

১৬২ প্রশ্নোপনিষৎ।

সম্পন্ন ও পাপসমন্বিত প্রাণিগণের শুদ্ধিসম্পাদক তপস্যা দ্বারা যাহা- দের বাহ্য ও অন্তঃকরণ বিশুদ্ধ হইয়াছে, তাহাদের জন্য কৰ্ম্মসাধনীভূত ঋক্, যজুঃ, সাম ও অথর্বাঙ্গিরস বেদরূপী মন্ত্রসমূহ; অনন্তর অগ্নিহোত্রাদি কৰ্ম্ম; তাহার পর কর্মফলস্বরূপ লোকসমূহ; সেই লোকমধ্যে সৃষ্ট প্রাণিগণের দেবদত্ত, যজ্ঞদত্তাদি নাম, তৈমিরিক- রোগাক্রান্ত দৃষ্টিতে যেরূপ দ্বিচন্দ্র ও মশক-মক্ষিকাদি সৃষ্ট হয়, স্বপ্ন দর্শনে যেরূপ বহু পদার্থ সৃষ্ট হয়,(২) সেইরূপ প্রাণির সৃষ্টি বীজভূত অবিদ্যা(ভ্রান্তি জ্ঞান) প্রভৃতি(কামনা ও তদনুযায়ী কৰ্ম্মাদি) কারণানুসারে উক্ত কলাসমূহ সৃষ্ট হইয়াছে, এবং নামরূপাদি বিভাগ পরিত্যাগপূর্ব্বক পুনর্বার সেই পুরুষেই বিলীন হইয়া থাকে ॥৫৩৷৪

স যথেমা নদ্যঃ স্যন্দমানাঃ সমুদ্রায়ণাঃ সমুদ্রং প্রাপ্যাস্তং গচ্ছন্তি, ভিদ্যেতে তাসাং নামরূপে, সমুদ্র ইত্যেবং প্রোচ্যতে। এবমেবাস্য পরিদ্রষ্টুরিমাঃ ষোড়শ কলাঃ পুরুষায়ণাঃ পুরুষং প্রাপ্যাস্তং গচ্ছন্তি, ভিদ্যেতে চাসাং নামরূপে, পুরুষ ইত্যেবং প্রোচ্যতে। স এযোহকলোহমৃতো ভবতি। তদেষ শ্লোকঃ ॥৫৪॥৫॥

[ইদানীং কলানাং স্বোপাদানভূতে পুরুষে বিলয়নমাহ]-যথেতি। সঃ(দৃষ্টান্তঃ) যথা-সমুদ্রায়ণাঃ(সমুদ্রঃ অয়নং আশ্রয়ঃ স্বভাবঃ যাসাং, তাঃ তথোক্তাঃ) স্যন্দ- মানাঃ(চলন্ত্যঃ) ইমাঃ(প্রত্যক্ষগম্যাঃ) নদ্যঃ সমুদ্রং(স্বকারণং সাগরং) প্রাপ্য অস্তং(অদর্শনং) গচ্ছন্তি(তদ্ভাবং প্রতিপদ্যন্তে);[তথা] তাসাং(নদীনাং) নাম-রূপে(নাম-গঙ্গাদি, রূপঞ্চ-আশ্রয়ানুরূপা আকৃতিঃ, তে) ভিদ্যেতে (নশ্যতঃ), ‘সমুদ্রঃ’ ইত্যেবং(জলময়মেব) প্রোচ্যতে(কথ্যতে)[জনৈরিতি

প্রশ্নোপনিষৎ! ১৩৩

শেষঃ]। এবং(দৃষ্টান্তানুরূপং) এব(নিশ্চয়ে) অন্য(প্রকৃতস্য) পরিদ্রষ্টু: (সর্ব্বতঃ দর্শনকর্ত্তুঃ) পুরুষস্য(আত্মনঃ) ইমাঃ(পূর্ব্বোক্তাঃ) পুরুষায়ণাঃ(পুরু- যাশ্রিতাঃ) ষোড়শ কলাঃ পুরুষং(স্বোৎপত্তিস্থানং) প্রাপ্য(পুরুষাত্মভাবম্ উপগম্য) অস্তং গচ্ছন্তি।[তদা] আসাং(কলানাং) নাম-রূপে(প্রাণাদ্যা সংজ্ঞা, স্বরূপঞ্চ) ভিদ্যেতে(বিলুপ্যেতে); ‘পুরুষঃ’ ইত্যেবং প্রোচ্যতে(কথ্যতে) [তত্ত্ববিদ্ভিঃ]।[তদানীং] সঃ(পূর্ব্বোক্তঃ) এষঃ(কলাবিৎ) অকলঃ(ত্যক্ত- কলাভিমানঃ) অমৃতঃ(মৃত্যুরহিতঃ)[চ] ভবতি। তৎ(তস্মিন্ বিষয়ে) এবঃ(বক্ষ্যমাণ প্রকারঃ) শ্লোকঃ(সংক্ষিপ্তার্থকঃ মন্ত্রঃ) ভবতি(অন্তীত্যর্থঃ) ॥ সেই দৃষ্টান্ত এইরূপ—চলস্বভাব ও সমুদ্রাত্মক নদীসমূহ যেরূপ সমুদ্রকে প্রাপ্ত হইয়া অস্তমিত হয়, তাহাদের নাম ও আকৃতি বিলুপ্ত হইয়া যায়,[তখন] ‘সমুদ্র’ বলিয়াই কথিত হইয়া থাকে; ঠিক সেইরূপ সর্ব্বতোভাবে দ্রষ্টস্বরূপ এই আত্মার পুরুষায়ত্ত এই যোলটি কলাও পুরুষকে প্রাপ্ত হইয়া অস্তমিত হয়, সে সকলের নাম ও রূপ বিনষ্ট হইয়া যায়;[তখন] কেবল ‘পুরুষ’ এইমাত্রই বলা হইয়া থাকে। সেই এই কলাবিৎ ব্যক্তি কলাভিমান ত্যাগ করেন, এবং মৃত্যুরহিত হন। এ বিষয়ে এইরূপ একটি শ্লোক বা মন্ত্র আছে ॥ ৫৪ ॥৫॥]

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কথং স দৃষ্টান্তঃ? যথা লোকে ইমা নদ্যঃ স্যন্দমানাঃ স্রবন্ত্যঃ সমুদ্রায়ণাঃ সমুদ্রঃ অয়নং গতিরাত্মভাবো যাসাং তাঃ, সমুদ্রায়ণাঃ সমুদ্রং প্রাপ্য উপগম্য অস্তং নামরূপ-তিরস্কারং গচ্ছন্তি। তাসাঞ্চ অস্তং গতানাং ভিদ্যেতে বিনশ্যেতে নাম- রূপে গঙ্গা-যমুনেত্যাদিলক্ষণে; তদভেদে সমুদ্র ইত্যেবং প্রোচ্যতে তদ্বস্ত উদক- লক্ষণম্, এবং যথায়ং দৃষ্টান্তঃ। উক্তলক্ষণস্য প্রকৃতস্য অন্য পুরুষস্য পরিদ্রষ্টু: পরি-সমস্তাদ দ্রষ্টুর্দর্শনস্য কর্ত্তুঃ স্বরূপভূতস্য, যথা অর্কঃ স্বাত্মপ্রকাশস্য কর্তা সর্বতঃ, তদ্বৎ ইমাঃ ষোড়শকলাঃ প্রাণাদ্যা উক্তাঃ কলাঃ পুরুষায়ণা নদীনামিব সমুদ্রঃ পুরুষোহয়নম্ আত্মভাবগমনং যাসাং কলানাং তাঃ, পুরুষায়ণাঃ পুরুষং প্রাপ্য পুরুষাত্মভাবমুপগম্য তথৈবাস্তং গচ্ছন্তি। ভিদ্যেতে চাসাং নাম-রূপে কলানাং প্রাণাদ্যাখ্যা রূপঞ্চ যথাস্বম্। ভেদে চ নাম-রূপয়োর্যদনষ্টং তত্ত্বং পুরুষ ইত্যেবং প্রোচ্যতে ব্রহ্মবিদ্ভিঃ। য এবং বিদ্বান্ গুরুণা প্রদর্শিতকলা-‘প্রলয়মার্গঃ, স এব

১৩৪ প্রশ্নোপনিষৎ।

বিদ্যয়া প্রবিলাপিতাসু অবিদ্যাকাম-কৰ্ম্মজনিতাসু প্রাণাদিকলাসু অকলঃ, অবিদ্যা- কৃতকলানিমিত্তো হি মৃত্যুঃ, তদপগমেহকলত্বাদেব অমৃতো ভবতি তদেতস্মিন্নর্থে এষঃ শ্লোকঃ ॥ ৫৪ ॥ ৫ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

সেই দৃষ্টান্ত কি প্রকার?—জগতে সমুদ্রায়ণ অর্থাৎ সমুদ্র যাহা- দের অয়ন—গতি অর্থাৎ আত্মস্বভাব, সেই সকল সমুদ্রায়ণ ও স্যন্দমান —প্রবহমাণ নদীসমূহ যেরূপ সমুদ্রকে প্রাপ্ত হইয়া—উপগত হইয়া নাম ও রূপের তিরোভাবময় অস্ত গমন করে, অস্তমিত সেই নদীসমূহের ‘গঙ্গা যমুনা’ ইত্যাদি প্রকার নাম ও রূপ বিনষ্ট হইয়া যায়;[তখন] তদুভয়ের অভেদকালে ‘সমুদ্র’ অর্থাৎ ‘উহা জলময় পদার্থ’ এইরূপই বলা হইয়া থাকে। এইপ্রকার, অর্থাৎ উক্ত দৃষ্টান্তটি যেরূপ,[তদ্রূপ] সূর্য্য যেমন নিজ প্রকাশের সর্ব্বময় কর্তা, তেমনি সর্ব্বতোভাবে দ্রষ্টা এবং পূর্বোক্ত লক্ষণান্বিত এই প্রস্তাবিত পুরুষেরও—স্বস্বরূপ আত্মারও—নদীসমূহের যেরূপ সমুদ্র, তদ্রূপ পুরুষই যে সমস্ত কলার ‘অয়ন’ আত্মভাব(অভেদ) প্রাপ্তিস্থান, সেই পুরুষায়ণ এই পূর্বোক্ত প্রাণাদি ষোড়শ কলা পুরুষকে প্রাপ্ত হইয়া, পুরুষে আত্মভাব লাভ করিয়া, অস্ত গমন করে। এই কলাসমূহের প্রাণাদি নাম ও যথা- যোগ্য রূপ বিলুপ্ত হইয়া যায়। নাম ও রূপ বিনষ্ট হইলে পর, যাহা অবিনষ্ট তত্ত্ব(বস্তু) থাকে, ব্রহ্মবিদ্গণ তাহাকে ‘পুরুষ’ এইরূপ বলিয়া থাকেন। যিনি এইরূপ বিদ্বান্ অর্থাৎ গুরুকর্তৃক যাহার নিকট কলাপ্রলয়ের পদ্ধতি প্রদর্শিত হইয়াছে, সেই এই বিদ্বান্ বিদ্যা দ্বারা(জ্ঞানবলে) অবিদ্যা, কাম ও কর্ম্মজনিত প্রাণাদি কলানিচয় পকৃষ্টরূপে, বিলাপিত হইলে পর, ‘অকল’(কলাতে অভিমানশূন্য) হন; কলাই মৃত্যুর কারণ, আবার কলার কারণ অবিদ্যা; অতএব অবিদ্যার অপগমে কলারাহিত্যনিবন্ধন ‘অমৃত’(মৃত্যুরহিত চিরজীবী) হন। এ বিষয়ে এই একটি শ্লোক আছে—॥ ৫৪॥৫ ॥

প্রশ্নোপনিষৎ। ১৩৫

অরা ইব রথনাভৌ কলা যস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতাঃ। তং বেদ্যং পুরুষং বেদ যথা মা বো মৃত্যুঃ পরিব্যথা ইতি ॥৫৬৷৷৬৷৷

[শ্লোকমাহ]—‘অরা’ইত্যাদিনা। রথনাভৌ(রথচক্রস্য নাভিরন্ধে) অরাঃ (শলাকাঃ) ইব কলাঃ(‘উক্তাঃ প্রাণাদ্যাঃ) যস্মিন্(পুরুষে) প্রতিষ্ঠিতাঃ (প্রকর্ষেণ জন্মস্থিতিলয়েঘপি স্থিতাঃ)। বেদ্যং(অবশ্যজ্ঞেয়ং) তং পুরুষং বেদ(বিজানীয়াৎ)[জিজ্ঞাসুরিতি শেষঃ]। ভো শিষ্যাঃ! যথা(যেন বেদনেন) মৃত্যুঃ বঃ(যুষ্মান্) মা পরিব্যথাঃ(ন পীড়য়েৎ) ইতি শব্দঃ শ্লোকসমাপ্তৌ ॥

রথের নাভিরন্ধে[সংস্থিত] অর(শলাকা) সমূহের ন্যায় উক্ত কলাসমূহ যে পুরুষে আশ্রিত রহিয়াছে, বেদনীয় সেই পুরুষকে অবশ্য জানিবে। হে শিষ্যগণ, যাহার ফলে মৃত্যু তোমাদিগকে[অপর প্রাণীর ন্যায়] ব্যথিত না করিতে পারে ॥ ৫৫ ॥ ৬ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

অরা রথচক্রপরিবারা ইব রথনাভৌ রথচক্রস্য নাভৌ যথা প্রবেশিতাঃ তদা- শ্রয়া ভবন্তি যথা, তথেত্যর্থঃ। কলাঃ প্রাণাদ্যা যস্মিন্ পুরুষে প্রতিষ্ঠিতা উৎপত্তি- স্থিতি-লয়কালেষু, তং পুরুষং কলানামাত্মভূতং বেদ্যং বেদনীয়ং পূর্ণত্বাৎ পুরুষং পুরিশয়নাদ্বা বেদ জানীয়াৎ। যথা হে শিষ্যা বো যুগ্মান্ মৃত্যুঃ মা পরিব্যথাঃ মা পরিব্যথয়তু। ন চেদ্ বিজ্ঞায়েত পুরুষঃ, মৃত্যুনিমিত্তাং ব্যথামাপন্না দুঃখিন এব যূয়ং স্থ। অতস্তন্মাভূদ যুগ্মাকমিত্যভিপ্রায়ঃ ॥৫৬৷৷৬৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

রথচক্রেরই অঙ্গীয় ‘অর’(শলাকা)-সমূহ যেরূপ রথনাভিতে রথ-চক্রের নাভিতে(চক্রমধ্যস্থ রন্ধ্রে) সন্নিবেশিত এবং তদাশ্রিত হইয়া থাকে; তদ্রূপ প্রাণাদি কলাসমূহও উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয় সময়ে যে পুরুষে প্রতিষ্ঠিত থাকে, কলাসমূহের আশ্রয়ীভূত সেই বেদনীয় পুরুষকে—পূর্ণত্ব হেতু কিংবা হৃৎপদ্ম-পুরে অবস্থান হেতু ‘পুরুষ’ পদবাচ্য জানিবে। হে শিষ্যগণ! যাহাতে মৃত্যু তোমা-

১৩৬ প্রশ্নোপনিষৎ।

দিগকে ব্যথিত করিতে না পারে, অর্থাৎ দুঃখিত না করে। আর যদি পুরুষকে জানা না হয়, তাহা হইলে, মৃত্যুজনিত ব্যথাপ্রাপ্ত হইয়া তোমরা নিশ্চয়ই দুঃখিত থাকিবে। অভিপ্রায় এই যে, অতএব তোমাদের তাহা না হউক ॥ ৫৫ ॥ ৬ ॥

তান্ হোবাচ—এতাবদেবাহমেতৎ পরং ব্রহ্ম বেদ। নাতঃ পরমস্তীতি ॥৫৬॥৭॥

[প্রক্রান্তাং বিদ্যামুপসংহরন্ আহ]—তানিত্যাদি।[সঃ পিপ্পলাদঃ] তান্ (শিষ্যান্) হ(ঐতিহ্যে) উবাচ—অহং এতাবৎ(এতৎপর্য্যন্তং) এব(নিশ্চিতং) এতৎ(পৃষ্টং) পরং ব্রহ্ম বেদ(বেদ্মি), অতঃ(অস্মাৎ) পরং(অধিকং—অব- শিষ্টং) ন অস্তি(নৈবাস্তীতি ভাবঃ) ইতি ॥

এখন প্রস্তাবিত ব্রহ্মবিদ্যার উপসংহার করিতেছেন—[পিপ্পলাদ ঋষি] তাঁহাদিগকে বলিলেন—আমি এই পর ব্রহ্ম এই পর্য্যন্তই জানি, ইহার অতিরিক্ত আর[ব্রহ্মতত্ত্ব] নাই ॥৫৩৷৭৷৷

শাঙ্কর-ভাষ্যম

তান্ এবমনুশিষ্য শিষ্যান্ তান্ হোবাচ পিপ্পলাদঃ কিল, এতাবদেব বেদ্যং পরং ব্রহ্ম বেদ বিজানাম্যহমেতৎ। নাতঃ অস্মাৎ পরম্ অস্তি প্রকৃষ্টতরং বেদিতব্যম্ ইত্যেবমুক্তবান্—শিষ্যাণাম্ অবিদিতশেষাস্তিত্বাশঙ্কানিবৃত্তয়ে কৃতার্থবুদ্ধিজননার্থঞ্চ ॥৫৬৷৭॥

ভাষ্যানুবাদ।

পিপ্পলাদ ঋষি তাহাদিগকে এই প্রকারে উপদেশ দিয়া তাহাদিগকে বলিয়াছিলেন—আমি এই পর্য্যন্তই এই জ্ঞাতব্য পর ব্রহ্ম জানি; ইহা অপেক্ষা প্রকৃষ্টতর জ্ঞাতব্য নাই; শিষ্যগণের অবিদিত অবশিষ্ট আরও আছে, এই শঙ্কা নিবৃত্তির জন্য এবং তাহাদের কৃতার্থতা-বুদ্ধি সমুৎ- পাদনের জন্যও এইরূপ বলিয়াছিলেন ॥ ৫৬৷৭৷৷

প্রশ্নোপনিষৎ। ১৩৭

তে তমর্চ্চয়ন্তত্ত্বং হি নঃ পিতা, যোহস্মাকমবিদ্যায়াঃ পরং পারং তারয়সীতি। নমঃ পরমঋষিভ্যো নমঃ পরমঋষিভ্যঃ ॥৫৭৷৮ ইত্যথর্ব্ববেদীয় প্রশ্নোপনিষদি ষষ্ঠঃ প্রশ্নঃ ॥ ৬॥

[তে(শিষ্যা ভারদ্বাজাদয়ঃ) তং(পিপ্পলাদং) অর্চ্চয়ন্তঃ(পূজয়ন্তঃ)[উবাচ] ত্বং হি(নিশ্চিতং) নঃ(অস্মাকং) পিতা(ব্রহ্মশরীরস্য জনকঃ); যঃ[ত্বং] অস্মাকং(অস্মান্) অবিদ্যায়াঃ(বিপরীতবুদ্ধিরূপাৎ অজ্ঞানাৎ) পরং(অতীতং) পারং(মোক্ষরূপং) তারয়সি(প্রাপয়সি) ইতি(অস্মাৎ হেতাঃ)। পরম ঋষিভ্যঃ(ব্রহ্মবিদ্যা-সম্প্রদায় প্রবর্ত্তকেভ্যঃ) নমঃ।[দ্বিরুক্তিঃ গ্রন্থসমাপ্ত্যর্থং, আদরাতিশয়ার্থং বা]

সেমমদোপেতা শ্রীশঙ্করমতানুগা।

প্রশ্নোপনিষদাং ব্যাখ্যা। সরলা স্যাৎ সতাং মুদে ॥ সেই শিষ্যগণ তাঁহাকে অর্চ্চনাপূর্ব্বক বলিয়াছিলেন—তুমিই আমাদের পিতা, যে তুমি আমাদিগকে অবিদ্যা হইতে পরপার(মোক্ষস্থান) প্রাপ্ত করাইতেছ। ব্রহ্মবিদ্যার সম্প্রদায় প্রবর্ত্তক পরমর্ষিগণের উদ্দেশে নমস্কার। গ্রন্থ সমাপ্তির জন্য দ্বিরুক্তি করা হইয়াছে ॥৫৭॥৮॥]

শাঙ্কর-ভ,ষ্যম্।

ততস্তে শিষ্যা গুরুণা অনুশিষ্টাঃ তং গুরুং কৃতার্থাঃ সন্তো বিদ্যানিষ্ক্রয়ম- পশ্যন্তঃ কিং কৃতবন্তঃ? ইত্যুচ্যতে-অর্চ্চয়ন্তঃ পূজয়ন্তঃ পাদয়োঃ পুষ্পা- ঞ্জলিপ্রকিরণেন প্রণিপাতেন চ শিরসা। কিমুচুরিত্যাহ-ত্বং হি নঃ অস্মাকং পিতা ব্রহ্মশরীরস্য বিদ্যয়া জনয়িতৃত্বাৎ নিত্যস্য অজরামরস্য অভয়স্য। যস্তমেব অস্মাকম্- অবিদ্যায়া বিপরীত-জ্ঞানাৎ জন্ম-জরা-মরণ-রোগ-দুঃখাদিগ্রাহাৎ অবিদ্যামহোদধে- বিদ্যাপ্লবেন পরম্ অপুনরাবৃত্তিলক্ষণং মোক্ষাখ্যং মহোদধেরিব পারং তারয়সি অস্মান্ ইত্যতঃ পিতৃত্বং তবাস্মান্ প্রত্যুপপন্নমিতরস্মাৎ। ইতরোহপি হি পিতা শরীরমাত্রং জনয়তি, তথাপি স প্রপূজ্যতমো লোকে, কিমু বক্তব্যম্?-আত্যন্তিকাভয়দাতু- রিত্যভিপ্রায়ঃ। নমঃ পরমঋষিভ্যো ব্রহ্মবিদ্যাসম্প্রদায়কর্তৃভ্যঃ। নমঃ পরমঋষিভ্য ইতি দ্বির্বচনমাদরার্থম্ ॥৫৭৷৮৷৷

প্রশ্নোপনিষদি ষষ্ঠ প্রশ্ন ভাষ্যম্। ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্য-শ্রীমদ্গোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদ- শিষ্য-শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতাবার্থবর্ণপ্রশ্নোপনিষ-

ভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

অনন্তর উপদেশপ্রাপ্ত সেই শিষ্যগণ কৃতার্থ হইয়া লব্ধ বিদ্যার নিষ্ক্রয়—প্রতিদান বা মূল্য কিছু না দেখিয়া কি করিয়াছিলেন? তাহা

১১৮

১৩৮ প্রশ্নোপনিষৎ।

বলা হইতেছে—সেই গুরুকে অর্চ্চনা করতঃ অর্থাৎ পাদদ্বয়ে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান ও অবনত শিরে প্রণিপাত দ্বারা পূজা করতঃ কি করিয়া- ছিলেন? তাহা বলিতেছেন যে, নিশ্চয়ই তুমি আমাদের পিতা; কারণ, বিদ্যার উপদেশ দ্বারা তুমি আমাদের জরামরণভয়রহিত ও অনশ্বর ব্রহ্মশরীরের উৎপাদক। যে তুমি আমাদিগকে বিপরীত জ্ঞানাত্মক অবিদ্যা হইতে—জন্ম, জরা, মরণ, রোগ ও দুঃখ সম্বন্ধরূপ অবিদ্যা- সাগর হইতে বিদ্যারূপ ভেলা দ্বারা মহাসমুদ্রের পারের ন্যায়—যাহা হইতে আর ফিরিয়া আসিতে হয় না, সেই অপুনরাবৃত্তিরূপ মোক্ষ- নামক পারে উত্তীর্ণ করাইতেছ। অতএব আমাদের সম্বন্ধে অপর অপেক্ষা তোমারই পিতৃত্ব সম্যক্ উপপন্ন বা সুসঙ্গত। অভিপ্রায় এই যে, অপর পিতা কেবল শরীরমাত্র সমুৎপাদন করেন, তথাপি তিনি জগতে পূজ্যতম, কিন্তু যিনি আত্যন্তিক অভয়প্রদাতা, তাঁহার পূজ্যতমত্ব সম্বন্ধে আর বক্তব্য কি? ব্রহ্মবিদ্যা-সম্প্রদায়-প্রবর্ত্তক পরম ঋষিগণ (পরমর্ষিগণ) উদ্দেশে নমস্কার। আদরার্থ নমস্কারের দ্বিরুক্তি করা হই- য়াছে ॥ ৫৭ ॥৮॥

ইতি প্রশ্নোপনিষদ্ ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥ ৬ ॥

ইত্যর্থর্ব্ববেদীয়া প্রশ্নোপনিষৎ সমাপ্তা॥

॥ * ॥ ওঁ তৎ সৎ ॥ হরিঃ ওঁ ॥ * ॥

শান্তি-পাঠঃ।

ওঁ ॥ ভদ্রং কর্ণেভিঃ শৃণুয়াম দেবাঃ, ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভি- র্যজত্রাঃ। স্থিরৈরঙ্গৈস্তুষ্টু বাৎসস্তনৃভিঃ। ব্যশেম দেবহিতং যদায়ুঃ ॥*

ওঁ শান্তিঃ ॥ ওঁ শান্তিঃ ॥ ওঁ শান্তিঃ ॥

ওঁ তৎসৎ ॥

শান্তি পাঠ।

হে দেবগণ! আমরা কর্ণে যেন শুভ(সংবাদ) শ্রবণ করি, চক্ষুতে যেন উত্তম(রূপ) দর্শন করি এবং যজ্ঞশীল ও স্তুতিপরায়ণ হইয়া সুস্থ অঙ্গে ও সুস্থশরীরে দেবহিতকর যে আয়ুঃ, তাহা যেন ভোগ করিতে পারি ॥ ০ ॥